ব্রিটিশ আমল থেকে ভাড়া ভবনে পটিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিস
পটিয়া উপজেলা পরিষদের সামনে একটি ভবনের দুই ফ্লোর ভাড়া নিয়ে চলছে সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের কার্যক্রম সমকাল
আহমদ উল্লাহ, পটিয়া (চট্টগ্রাম)
প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:১০
| প্রিন্ট সংস্করণ
দক্ষিণ চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক জনপদ পটিয়া। একসময় এটি ছিল মহকুমা সদর। অথচ ভূমি নিবন্ধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সেবা প্রদানকারী পটিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের এখনও নিজস্ব ভবন নেই। ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু হওয়া এ দপ্তরের কার্যক্রম আজও চলছে ভাড়া করা একটি ভবনে। ভবনের দুরবস্থার কারণে কোটি টাকা রাজস্ব আদায়কারী এ দপ্তরে প্রতিদিন সেবা নিতে এসে বৃদ্ধ, অসুস্থ, নারী ও প্রতিবন্ধীসহ শত শত মানুষ চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন।
সরেজমিন দেখা যায়, উপজেলা পরিষদের সামনে একটি দুই তলা ভাড়া ভবনের নিচতলায় সাব-রেজিস্ট্রি অফিস এবং ওপরতলায় দলিল লেখকদের বসার ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে একটি দলিল নিবন্ধনের জন্য সেবাগ্রহীতাদের বারবার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে-নিচে যাতায়াত করতে হয়। ভবনে লিফট কিংবা প্রতিবন্ধীবান্ধব র্যাম্প না থাকায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন বয়স্ক, অসুস্থ ও নারী সেবাগ্রহীতারা।
স্থানীয় প্রবীণ দলিল লেখক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ব্রিটিশ শাসনামল থেকে পটিয়া ভূমি অফিসের একটি কক্ষে সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয় পরিচালিত হতো। ভূমি অফিসের বারান্দায় বসেই দলিল লেখকেরা দলিল প্রস্তুতের কাজ করতেন। দীর্ঘ সময় এভাবেই সরকারি কার্যক্রম চললেও অফিসটির জন্য কখনও আলাদা সরকারি ভবন নির্মাণ করা হয়নি।
২০০৩ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকারের আমলে পটিয়ার জঙ্গলখাইন ইউনিয়নের উনাইনপুরা গ্রামের প্রয়াত প্রভাস রঞ্জন বড়ুয়ার মালিকানাধীন বর্তমান ভবনটি ভাড়া নেওয়া হয়। এরপর থেকে ভবনটির নিচতলায় সাব-রেজিস্ট্রি অফিস এবং দ্বিতীয় তলায় দলিল লেখকদের বসার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ ২৩ বছর পেরিয়ে গেলেও নিজস্ব ভবন নির্মাণের উদ্যোগ বাস্তবায়ন হয়নি।
ইতিহাস অনুযায়ী, ১৮৪৫ সালে ব্রিটিশ সরকার পটিয়ায় থানা প্রতিষ্ঠা করে। ১৯১০ সালে দক্ষিণ চট্টগ্রামের পাঁচ থানার বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এখানে মহকুমা মুন্সেফ আদালত স্থাপন করা হয়। ১৯৫৮ সালে পটিয়া মহকুমার মর্যাদা লাভ করে। পরে দেশের অন্যান্য মহকুমা জেলা হিসেবে উন্নীত হলেও ১৯৮৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি পটিয়া
উপজেলায় রূপান্তরিত হয়। বর্তমানে ৩১০ দশমিক ২৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ উপজেলায় একটি পৌরসভা, ১৭টি ইউনিয়ন, ১২৭টি মৌজা ও ১২৪টি গ্রাম রয়েছে। দক্ষিণ চট্টগ্রামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হওয়ায় এখানে ভূমি নিবন্ধনের চাপও তুলনামূলক বেশি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আগে সপ্তাহে তিন দিন—রোববার, সোমবার ও মঙ্গলবার দলিল নিবন্ধনের কাজ হতো। বর্তমানে তা কমিয়ে সপ্তাহে মাত্র দুই দিন, রোববার ও সোমবার করা হয়। মঙ্গলবার ও বুধবার পার্শ্ববর্তী কর্ণফুলী উপজেলার দলিল নিবন্ধনের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ফলে পটিয়ার একটি পৌরসভা ও ১৭টি ইউনিয়নের বিপুলসংখ্যক মানুষকে মাত্র দুই দিনেই সেবা নিতে হয়। প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০টি দলিল নিবন্ধন হয়। এসব দলিল থেকে সরকার স্ট্যাম্প শুল্ক, নিবন্ধন ফি, ভ্যাটসহ বিভিন্ন খাতে বছরে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করলেও অবকাঠামোগত উন্নয়নে তার প্রতিফলন নেই।
পটিয়া পৌরসভার বাসিন্দা ৭২ বছর বয়সী আবদুল গফুর বলেন, ‘বয়সের কারণে হাঁটাচলা করতেই কষ্ট হয়। দলিলের কাজ করতে এসে কয়েকবার দ্বিতীয় তলায় উঠতে হয়েছে। সরকারি অফিসে যদি নিজস্ব ভবন ও আধুনিক ব্যবস্থা থাকত, তাহলে এত ভোগান্তি পোহাতে হতো না।’ হাইদগাঁও ইউনিয়নের বাসিন্দা রাবেয়া বেগম বলেন, ‘নারীদের জন্যও কোনো আলাদা সুবিধা নেই। ছোট শিশু বা অসুস্থ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে এলে আরও বেশি কষ্ট হয়। একটি সরকারি ভবন হলে মানুষ অনেক স্বস্তিতে সেবা নিতে পারত।’
প্রবীণ দলিল লেখক মনোরঞ্জন দাশ বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন ধরে এই পেশার সঙ্গে জড়িত। ব্রিটিশ আমল থেকে অফিসটি কীভাবে পরিচালিত হয়েছে, তা আমার জানা। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি সরকারি অফিস এখনো ভাড়া ভবনে পরিচালিত হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। নিজস্ব ভবন হলে যেমন সেবার মান বাড়বে, তেমনি সাধারণ মানুষের দুর্ভোগও কমবে।’ পটিয়া দলিল লেখক সমিতির সভাপতি সামশুদ্দোহা বলেন, ‘প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ দলিল নিবন্ধনের জন্য এখানে আসেন। জায়গার সংকট, দ্বিতীয় তলায় ওঠানামার কষ্ট এবং সীমিত কর্মদিবসের কারণে সেবাগ্রহীতারা দুর্ভোগে পড়ছেন। আমরা দীর্ঘদিন ধরে একটি আধুনিক সরকারি সাব-রেজিস্ট্রি ভবনের দাবি জানিয়ে আসছি।’
টিআইবি পটিয়া উপজেলার আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট কবি শেখের নাথ পিন্টু বলেন, ‘পটিয়া গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্র হওয়া সত্ত্বেও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের নিজস্ব ভবন নেই, এটি হতাশাজনক। সরকার দ্রুত একটি আধুনিক বহুতল ভবন নির্মাণ করলে জনগণ উপকৃত হবে।’ পটিয়ার ইতিহাস ও ঐতিহ্যবিষয়ক গ্রন্থের লেখক এস এম এ কে জাহাঙ্গীর বলেন, ‘সরকার যখন এই অফিস থেকে বছরে কোটি টাকা রাজস্ব পাচ্ছে, তখন একটি সরকারি ভবন নির্মাণে আর বিলম্বের কোনো যৌক্তিকতা নেই। এটি শুধু জনসেবার বিষয় নয়, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথিপত্রের নিরাপদ সংরক্ষণের বিষয়ও।’
এ বিষয়ে পটিয়ার সাব-রেজিস্ট্রার মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘দলিল নিবন্ধনের কার্যক্রম সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী পরিচালিত হয়। নিজস্ব ভবন নির্মাণের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও বরাদ্দ পাওয়া গেলে আধুনিক ভবনে অফিস স্থানান্তর করা সম্ভব হবে।’
- বিষয় :
- ভবন