রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে কাটছে তাদের জীবন
বন্যায় ভেঙে তছনছ হয়ে গেছে ঢেমশা ইউনিয়নের নাছির উদ্দিনের বসতঘর সমকাল
সুকান্ত বিকাশ ধর, সাতকানিয়া (চট্টগ্রাম)
প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:১২
| প্রিন্ট সংস্করণ
‘ঘর ভেঙে যাওয়ার পর সবাই বলেছিল, সরকার নতুন ঘর করে দেবে। ইউএনও সাহেবও এসে দেখে গেছেন। কিন্তু এক মাস হতে চলল, এখনও অন্যের ঘরেই দিন কাটছে। আর কতদিন অন্যের দয়ার ওপর বাঁচব?’
কথাগুলো বলছিলেন সাতকানিয়া উপজেলার পশ্চিম ঢেমশা ইউনিয়নের মনেয়ারপাড়ার বাসিন্দা নাছির উদ্দিন। একসময় তিনি মাদ্রাসার শিক্ষক ছিলেন। পরে সংসারের প্রয়োজনে চাকরি ছেড়ে টমটম চালানো শুরু করেন। পাশাপাশি এলাকার একটি মসজিদে ইমামতি করেন। চার মেয়ে ও দুই ছেলেকে নিয়ে ছোট্ট একটি সংসার। কিন্তু গত ৯ জুলাইয়ের ভয়াবহ বন্যায় ডলু খালের তীব্র স্রোতে তাঁর একমাত্র বসতঘরটি মাটির সঙ্গে মিশে যায়।
বন্যার প্রায় এক মাস পেরিয়ে গেলেও নিজের ভিটায় ফিরতে পারেননি নাছির। স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে এখন আশ্রয় নিয়েছেন এক প্রতিবেশীর বাড়িতে। সরকারি ত্রাণ হিসেবে কয়েকটি শুকনো খাবারের প্যাকেট ও এক বান টিন পেয়েছেন। কিন্তু মাথা গোঁজার নতুন কোনো ব্যবস্থা হয়নি।
শুধু নাছির নন, চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার শত শত পরিবার এখন একই বাস্তবতার মুখোমুখি। বন্যার পানি নেমে গেছে, কিন্তু ঘরে ফেরেনি স্বাভাবিক জীবন। ভাঙা ঘর, ধসে পড়া মেঝে, বিলীন হয়ে যাওয়া বসতভিটা আর অনিশ্চিত পুনর্বাসনের অপেক্ষায় দিন কাটছে তাদের।
সাম্প্রতিক পাহাড়ি ঢল ও টানা বর্ষণে সৃষ্ট বন্যায় উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। সরকারি হিসাবে অর্ধশতাধিক বসতঘর সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে এবং কয়েক হাজার ঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, বাস্তবে ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি।
‘এভাবে আর কতদিন?’
সরেজমিন উপজেলার বিভিন্ন বন্যাকবলিত এলাকায় দেখা গেছে, কোথাও নদীর স্রোতে ঘর ভেসে গেছে, কোথাও ভিত্তি দেবে যাওয়ায় ঘরে ফেরা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অনেক পরিবার এখনও আত্মীয়-স্বজন বা প্রতিবেশীর বাড়িতে আশ্রিত। নাছির উদ্দিন বলেন, ‘বন্যার রাতে পরিবারের সবাইকে নিয়ে প্রাণে বাঁচলেও ঘরটা আর বাঁচাতে পারিনি। সরকারি লোকজন এসে খোঁজ নিয়েছেন, ঘর করে দেওয়ার আশ্বাসও দিয়েছেন। কিন্তু এখনও কোনো ব্যবস্থা হয়নি। অন্যের ঘরে আর কতদিন থাকব?’
বাজালিয়া ইউনিয়নের নতুনপাড়ার কৃষক কবির আহমদ পেঠানের বাড়িতেও একই চিত্র। বন্যার রাতে সাঙ্গু নদীর পানি হু হু করে উঠানে ঢুকে পড়ে। প্রতিবেশীদের সহায়তায় পরিবারের সদস্যদের নিরাপদে সরিয়ে নিলেও প্রবল স্রোতে বাড়ির একটি অংশ ধসে যায়। তিনি বলেন, ‘ভাঙা ঘরের একটি কক্ষ খুঁটি দিয়ে কোনো রকমে দাঁড় করিয়ে আবার থাকছি। কিন্তু বাকি অংশ সংস্কার করার সামর্থ্য নেই। কিছু ত্রাণ পেয়েছি, এনজিও থেকেও সামান্য সহায়তা মিলেছে। কিন্তু সরকারিভাবে এখনও ঘর নির্মাণের কোনো সহায়তা পাইনি।’
একই বাড়ির আরেক ভুক্তভোগী জমির আহমদ। পান বিক্রি করে সংসার চালান। তাঁর ভাষায়, ‘বাড়ির ভিটে নদীতে চলে গেছে। উঠান এখন ছোট খালের মতো। পরিবার নিয়ে আত্মীয়ের বাড়িতে থাকছি। সরকার সহযোগিতা না করলে নতুন করে ঘর তোলা সম্ভব নয়।’
আশ্রয় থেকে ফিরেও আতঙ্ক
নলুয়া ইউনিয়নের কৃষক মোরশেদ আলম কয়েকদিন অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নেওয়ার পর নিজের ভাঙা ঘরে ফিরেছেন। তবে সেটিকে ঘর বলার উপায় নেই। তিনি বলেন, ‘ঘরের এক কোণে সামিয়ানা টানিয়ে থাকছি। রাতে সাপের ভয়, বৃষ্টি হলে আরও ভয় লাগে। ফসলও নষ্ট হয়েছে। ঘরও নেই। কয়েক কেজি চাল আর শুকনো খাবার ছাড়া আর কিছু পাইনি। শুনছি সরকার ঘর করে দেবে–সেই আশাতেই আছি।’
নলুয়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের গ্রাম পুলিশ আলী আকবর জানান, তাঁর ওয়ার্ডেই সবচেয়ে বেশি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক পরিবার এখনও নিজের ঘরে ফিরতে পারেনি। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা উপজেলা প্রশাসনের কাছে পাঠানো হয়েছে।
প্রতিশ্রুতি মিলেছে, বাস্তবায়ন হয়নি
ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, বন্যার সময় সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা এলাকা পরিদর্শন করে পুনর্বাসনের আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু সময় গড়ালেও সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রতিফলন তারা দেখছেন না।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ত্রাণ বিতরণ জরুরি ছিল, কিন্তু এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নিরাপদ বাসস্থান। কারণ দীর্ঘদিন অন্যের বাড়িতে আশ্রিত জীবন শুধু কষ্টই নয়, সামাজিক ও মানসিক সংকটও তৈরি করছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতি কয়েকটি ইউনিয়নে
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নলুয়া, পশ্চিম ঢেমশা, ঢেমশা, আমিলাইষ, কাঞ্চনা, ছদাহা ও সাতকানিয়া সদর ইউনিয়নে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বহু পরিবার এখনও বসতভিটায় ফিরতে পারেনি। অনেকেই ভাঙা ঘরের পাশে অস্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। পশ্চিম ঢেমশা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সরওয়ার কামাল বলেন, ‘সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা প্রস্তুত করে উপজেলা প্রশাসনের কাছে পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ এলেই পুনর্বাসনের কাজ শুরু হবে।’
উত্তর ঢেমশার বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘সব হারিয়ে এখন শুধু অপেক্ষা করছি– কবে নিজের ঘরে ফিরতে পারব।’
ক্ষতির পরিমাণ শতকোটি
সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘সাম্প্রতিক বন্যায় কৃষি, মৎস্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সড়ক ও বসতঘর মিলিয়ে প্রাথমিকভাবে ১০৭ কোটিরও বেশি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের জন্য তালিকা প্রস্তুতের কাজ প্রায় শেষ। বিষয়টি নিয়ে সরকার ও সংশ্লিষ্ট দপ্তর কাজ করছে। আশা করছি, পর্যায়ক্রমে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো প্রয়োজনীয় সহায়তা পাবে।’
- বিষয় :
- বন্যা