বন্যায় ঘরহারা মানুষ
পাঁচ মেয়েকে নিয়ে পরিত্যক্ত দোকানে ইসমত আরা
পরিত্যক্ত দোকানে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নিয়েছেন পেকুয়ার উত্তর মেহেরনামা গ্রামের ইসমত আরা সমকাল
হিরু আলম, পেকুয়া (কক্সবাজার)
প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:২১
| প্রিন্ট সংস্করণ
বন্যার পানি নেমেছে তিন সপ্তাহ আগে। কিন্তু পেকুয়ার হাজারো মানুষের জীবন থেকে এখনও যায়নি বন্যার দুর্ভোগ। কারও ঘরের চাল উড়ে গেছে, কারও দেয়াল ধসে পড়েছে, কোথাও পুরো বসতঘরই মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। কাদামাখা উঠান, ভাঙা ঘর আর নষ্ট হয়ে যাওয়া সংসারের সামগ্রী নিয়ে অনেকটা খোলা আকাশের নিচে দিন কাটছে বানভাসি মানুষের। কেউ আশ্রয় নিয়েছেন স্বজনের বাড়িতে, কেউ আবার পরিত্যক্ত দোকানঘরে।
শুক্রবার সকালে উত্তর মেহেরনামা ইউনিয়নের চৈয়রভাঙা কোনাপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, একটি পরিত্যক্ত দোকানের সামনে ইট জোড়া দিয়ে বানানো অস্থায়ী চুলায় রান্না করছেন গৃহবধূ ইসমত আরা (৩২)। ভেজা লাকড়িতে আগুন ধরছে না। বারবার ফুঁ দিয়ে আগুন জ্বালানোর চেষ্টা করছেন তিনি। পাশে বসে ক্ষুধার্ত চোখে তাকিয়ে আছে তাঁর চার কন্যা।
নিজের বাড়িতে কেন ফিরতে পারছেন না– এ প্রশ্ন শুনেই কান্নায় ভেঙে পড়েন ইসমত।
তিনি বলেন, ‘দুই বছর আগে একটি এনজিও থেকে ৫৫ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে লবণ মাঠের পলিথিন দিয়ে কোনো রকমে একটি ঘর বানিয়েছিলাম। স্বামী দিনমজুর। দুই মাস ধরে অসুস্থ। ধারদেনা করে সংসার চলছিল। বন্যার পানি উঠতেই ঘরের খুঁটি বেঁকে যায়। মেয়েদের নিয়ে অনেক চেষ্টা করেছি ঘরটা ধরে রাখতে। শেষ পর্যন্ত পুরো চাল ভেঙে আমার গায়ের ওপর পড়ে। আল্লাহ বাঁচিয়ে দিয়েছেন।’
ইসমত জানান, তাঁর পাঁচ মেয়ের মধ্যে তিনজন স্কুলে পড়ে। বন্যার পানিতে তাদের বই-খাতা, পোশাকসহ প্রয়োজনীয় সব জিনিস নষ্ট হয়ে গেছে। পানি নেমে যাওয়ার পরও ঘরটি আর টেকেনি। পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।
তিনি বলেন, ‘এখন পাশের এক চাচাতো ভাইয়ের পরিত্যক্ত দোকানে থাকছি। সেখানে থাকার মতো কোনো পরিবেশ নেই। কিন্তু যাওয়ার মতো আর কোনো জায়গাও নেই। ঘর মেরামতের সামর্থ্য আমাদের নেই।’ ইসমতের স্বামী মোহাম্মদ রুবেল বলেন, ‘দুই মাস ধরে অসুস্থ থাকায় কাজ করতে পারছি না। স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে একটি পরিত্যক্ত দোকানে পলিথিন বিছিয়ে রাত কাটাতে হচ্ছে। সরকারের কাছে শুধু একটা ঘর মেরামতের সহায়তা চাই।’
একই চিত্র বারবাকিয়া ইউনিয়নের নাথপাড়ায়। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, বন্যার ধাক্কায় হেলে পড়া ঘরে ঝুঁকি নিয়েই বসবাস করছেন দীপু কান্তি নাথ। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালিয়েই চলত তাঁর সংসার। কিন্তু বন্যার পানিতে সেটিও নষ্ট হয়ে গেছে।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে দীপু বলেন, ‘বন্যার সময় বাড়ির চাল পর্যন্ত পানি উঠেছিল। এক সপ্তাহ অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলাম। এখন বাড়িতে ফিরেছি, কিন্তু ঘরটি এমনভাবে হেলে আছে যে যে কোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে। অটোরিকশাও নষ্ট। আয় নেই, ঘরও নেই।’
ইসমত বা দীপু একা নন। পেকুয়ার শত শত পরিবার এখনও বন্যার ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পেকুয়া পৌরসভার গোঁয়াখালী, বাংলাপাড়া, বাইম্যাখালী, হরিণাফাঁড়ি, বটতলীয়াপাড়া, জালিয়াখালী, মেহেরনামার
নন্দীরপাগার, মোরারপাড়া, সৈকতপাড়া ও পূর্ব মেহেরনামা এলাকা। এছাড়া শিলখালী, বারবাকিয়া, টৈটং, উজানটিয়া, মগনামা ও রাজাখালী ইউনিয়নের বহু গ্রামেও শত শত পরিবার এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি।
স্থানীয়দের দাবি, চলতি জুলাইয়ের বন্যায় কক্সবাজার জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পেকুয়া উপজেলা। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার সাতটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার প্রায় ৮৫ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছিল। এতে প্রায় দুই হাজার বসতঘর আংশিক বা সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা কাউসার আহমেদ জানান, বন্যায় ২৫১টি আধাপাকা ঘর, ৫০০টি কাঁচাঘর সম্পূর্ণ এবং ১ হাজার ২৪৯টি কাঁচাঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা তৈরি করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। ইতোমধ্যে আলহাজ শামসুল হক ফাউন্ডেশন ২০টি পরিবারের জন্য নতুন ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে। পর্যায়ক্রমে তালিকাভুক্ত ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সরকারি সহায়তা দেওয়া হবে বলে আশ্বাস পাওয়া গেছে।’
- বিষয় :
- দোকান