ঢাকা বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬

ইতালিতে ২ লাখ বাংলাদেশির বন্দি জীবন, ব্যয় নির্বাহে অনিশ্চয়তা

ইতালিতে ২ লাখ বাংলাদেশির বন্দি জীবন, ব্যয় নির্বাহে অনিশ্চয়তা
×

অনুষ্ঠানে অতিথিরা- সমকাল

ইউসুফ আলী, ইতালী (রোম) থেকে

প্রকাশ: ২৩ মার্চ ২০২০ | ০৫:১৭ | আপডেট: ২২ আগস্ট ২০২১ | ০৫:৩১

প্রাণঘাতী করোনায় বিধ্বস্ত ইতালির প্রায় দুই লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি ভালো নেই । কর্মহীন গৃহবন্দি ইতালির প্রায় সাড়ে ৬ কোটি জনগণ, সেইসঙ্গে প্রবাসীরাও। বাইরে বেরুলেই জেল, জরিমানার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। অবরুদ্ধ প্রবাসীরা থাকা-খাওয়ার ব্যয় নির্বাহ নিয়েও রয়েছেন অনিশ্চয়তার মধ্যে। পরিস্থিতি দিনদিন আরও শোচনীয় হচ্ছে। লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। সহসাই এ পরিস্থিতির উন্নতির সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। এর সঙ্গে করোনায় একজন বাংলাদেশি মারা যাওয়ায় কমিউনিটির মাঝে উদ্বেগ, আতঙ্ক নতুন করে বেড়েছে। 

এদিকে ইউরোপের অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তিশালী দেশ ইতালি এখন যেন মৃত্যুপুরী। পর্যটকশূন্য পুরো দেশ। কোথাও নেই কোলাহল। বন্ধ  রাখা হয়েছে ফার্মেসি ও সুপার মার্কেট ছাড়া সব ধরনের প্রতিষ্ঠান। পুরো দেশ রেড জোনের আওতাভুক্ত দু’সপ্তাহেরও বেশি। শনিবার সরকারের আরেক ঘোষণায় সবকিছু বন্ধের সময়সীমা ৩ এপ্রিল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে দেশের পুরো কাঠামো যেন ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থমকে গেছে। এক অনিশ্চিত সংকটের দিকে এগুচ্ছে ইতালির ভবিষ্যত। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও এ রকম সংকট দেখেননি ইতালিবাসী। আধুনিক এ সময়ে ইউরোপের দেশ ইতালির নাগরিকরা স্বাধীন জীবন-যাপন করে আসছেন। প্রবাসী বাংলাদেশিরাও অনেকটা ইতালির সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে আছে। আশির দশক থেকে ইতালিতে বাংলাদেশি প্রবাসীদের পদচারণা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংখ্যায় যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে ইতালির বিভিন্ন সংস্কৃতির সঙ্গে সখ্যতা। প্রবাসীরা ইতালিকে ‘সেকেন্ড হোম’ হিসেবেই বিবেচনা করে থাকেন। রেমিট্যান্স প্রেরণের মাধ্যমে দেশ যেমন লাভবান হয়, তেমনি একজন প্রবাসীর উপার্জনের মাধ্যমে নিজ পরিবার, আত্মীয়-স্বজনসহ অনেকেই উপকৃত হয়ে থাকেন। ইতালিতে এপ্রিল মাস থেকে সাধারণত গ্রীষ্মকাল শুরু হয়ে থাকে। ব্যবসা-বাণিজ্য পুরোদমে শুরু হওয়ার কথা। বাড়ার কথা অনেক কর্মসংস্থান। কিন্তু এমন একটি সময় করোনার সংক্রমণ বাড়ছে, যা প্রবাসীদের হতাশ করার পাশাপাশি আতঙ্কিত করে তুলছে। করোনার হানা সবকিছু ওলট-পালট করে দিচ্ছে। কর্মজীবীরা সাধারণত মাসের প্রথম দিকেই নিজের ব্যয় মিটিয়ে বাকী অর্থ দেশে প্রেরণ করে থাকেন। চলতি মাসেও একই অবস্থা ছিল অধিকাংশ প্রবাসীর। দেশব্যাপী রেড জোন ঘোষণা করা এবং সব প্রতিষ্ঠান বন্ধ করায় কর্মহীন শতভাগ প্রবাসী। সবাই এখন গৃহবন্দি।  

আর ব্যবসায়ীরা পড়েছেন আরো বেশি সমস্যায়। প্রতিষ্ঠান বন্ধ কিন্তু সব ব্যয় নির্বাহ করতেই হবে। প্রতিষ্ঠান ভাড়া, পারিবারিক ব্যয়, পরিবার-পরিজনের জন্য অর্থ প্রেরণ, ব্যক্তিগত অন্যান্য খরচ- সবমিলিয়ে প্রবাসীদের দুশ্চিন্তা বেড়েই চলছে। কখন ভাইরাসের প্রকোপ কমবে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না

ইতালিতে প্রায় দুই লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী রয়েছেন, যার মধ্যে ৮ জন করোনায় আক্রান্তের খবর এ পর্যন্ত পাওয়া গেছে। শুক্রবার মিলান শহরে এক বাংলাদেশির মৃত্যু হয়। এ মৃত্যুর খবরে প্রবাসী কমিউনিটির মাঝে নেসে এসেছে শোকের ছায়া। 

রোমের কর্মজীবী আরেফিন সিদ্দিক সমকালকে বলেন, তিনি সারাদিন বাসায় সময় কাটাচ্ছেন। শুধু জরুরি কেনাকাটার জন্য বাইরে বের হন। কর্মস্থল বন্ধ প্রায় দু’সপ্তাহ। পর্যটক নির্ভর রোম এখন পর্যটকশূন্য। পরিবার নিয়ে ভাড়া বাসায় টিকে থাকাই জীবনের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

রোমের আরেক বিশিষ্ট ব্যবসায়ী একাধিক প্রতিষ্ঠানের মালিক নজরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, '৩০ বছর ইতালিতে বসবাস করছি। নজিরবিহীন এ রকম সংকটের মুখোমুখী কখনো হইনি। সবকিছু থমকে গেছে। ভেবেছিলাম দুই সপ্তাহের মধ্যে সবকিছু ঠিক হয়ে আসবে। কিন্তু পরিস্থিতির আরও অবনতি দেখছি। ব্যবসায়ীকভাবে বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছি।'

তবে প্রবাসীদের যেকোনো প্রয়োজনে পাশে থাকার দৃড় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন ইতালি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাসান ইকবাল। কেমন আছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি সমকালকে বলেন, মানসিকভাবে ভালো নেই। সবাই আতঙ্কিত। তিনি প্রবাসীদের সাহস রেখে সাবধানে থাকার পরামর্শ্ দেন। তিনি বলেন, আমরা প্রত্যেক শহরের নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিয়েছি প্রবাসীদের পাশে থাকার। নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি যাতে কোনো প্রবাসী সমস্যায় পড়লে তাৎক্ষনিক ব্যবস্থা নেওয়া যায়। তিনি সব প্রবাসীকে ইতালি সরকার ঘোষিত নিয়ম-কানুন সঠিকভাবে মেনে চলা এবং সার্বক্ষণিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার আহ্ববান জানান।

আরও পড়ুন

×