ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

হকির আকাশে নতুন তারা ডনুচিং

হকির আকাশে নতুন তারা ডনুচিং
×

মেয়েদের অনূর্ধ্ব-১৮ এশিয়ান কাপে বল দখলের লড়াইয়ে ডনুচিং মারমা সুইহ

প্রদীপ চৌধুরী

প্রকাশ: ০৪ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:১৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

ডনুচিং মারমা সুইহ। তাঁর স্টিকে চড়ে মেয়েদের অনূর্ধ্ব-১৮ এশিয়ান কাপে ব্রোঞ্জ জেতে বাংলাদেশ দল। অথচ পাহাড়ের এই অদম্য মেয়েটাই ২০২৩ সালে চট্টগ্রামে ফুটবল ট্রায়ালে ফেল করে খাগড়াছড়ির গুইমারা নতুনপাড়ায় কৃষক বাবার ঘরে ফিরে গিয়েছিলেন। নানান প্রতিকূলতা কাটিয়ে হকির ড্রিবলিং ও পাসের দক্ষতায় নজর কেড়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। দেশের হকির আকাশে উদিত নতুন এই তারাকে নিয়ে লিখেছেন প্রদীপ চৌধুরী

ফুটবলার হওয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে ডনুচিং ২০২৩ সালে ফুটবল ট্রায়ালে দাঁড়ান চট্টগ্রামে। সে যাত্রায় ব্যর্থ  হয়ে ফুটবল থেকে কিছুটা সরে এলেও মন থেকে খেলার নেশা কাটেনি ডনুচিংয়ের। কেবল সুযোগ খুঁজতে থাকেন। সেই সঙ্গে পরিশ্রমও করতে থাকেন। এরই মধ্যে একদিন ডনুচিংয়ের মামা বললেন, এক কাজ করো; ফুটবলে যেহেতু হয়নি, সামনে হকির ট্রায়াল আছে সেখানে নাম লেখাতে পারো। তাতে মন গলে না ডনুচিংয়ের। তিনি যে ফুটবল স্বপ্নেই বুঁদ। উথাল-পাতাল দিন কাটছে তাঁর। এরই মধ্যে ডনুচিংয়ের এক প্রশিক্ষক হাতে হকির স্টিক আর বল তুলে দেন। অনেকটা ঘোরের মধ্যেই ট্রায়াল দেন। ভালোও করেন তাতে। এরপর ঢাকার পথ ধরেন। চার দিনের ক্যাম্পে যোগ দেন। ক্যাম্প শেষে ভর্তি হন বিকেএসপিতে। ডনুচিংয়ের জীবনে এই নাটকীয়তা ঘটে যায় ২০২৩ সালে। এর ঠিক এক বছর পর মেয়েদের অনূর্ধ্ব-১৮ হকি জাতীয় দলে সুযোগ পেয়ে যান। ২০২৫ সালে বয়সভিত্তিক এশিয়ান কাপ প্রতিযোগিতায় ব্রোঞ্জ জিতে তাক লাগিয়ে দেন পাহাড়িকন্যা ডনুচিং। 

ডনুচিংয়ের চোখে নদী
খাগড়াছড়ির গুইমারা নতুনপাড়া থেকে উঠে আসা ডনুচিং মারমা সুইহ-এর পরিবার কৃষি কাজের সঙ্গে জড়িত। খেলাধুলার পাশাপাশি বাবার সঙ্গে কৃষিকাজ করতেন ডনুচিংও। কৃষক বাবা-মাও চিনতেন না হকি খেলা! অথচ এখন মেয়ের সাফল্যে অভিভূত হয়ে তারাই বলেন, ‘বাসায় এসে সময় নষ্ট করার কী দরকার। ভালোই তো খেলতাছো। আর বাড়ি থেকেও নিশ্চয়ই সেখানে ভালো আছো। বাসায় এসে কী করবে?’
এসব কথা জানাতে জানাতে ডনুচিংয়ের চোখে নেমে আসে নদী। গড়িয়ে পড়া পানিতে ঝাপসা হয়ে আসে দৃষ্টি। বোঝা যায়, এই চোখের পানিতে ভর করেই অনেক দূর এগিয়ে যেতে চান ডনুচিং মারমা সুইহ।

বিকেএসপির দিন...
বিকেএসপির দিনগুলো কেমন কাটে? এমন প্রশ্নের উত্তরে ডনুচিং বলেন, ‘এখানে আমরা আমাদের মতো থাকি। বিকেএসপিতে যখন ভর্তি হই, তখন 
অনেক কিছুই মিলত না, বিশেষ করে ভাষাগত সমস্যায় বেশি পড়েছি। ২০২৩ সালের কথা বলছি। তখন বিকেএসপি ভালো লাগত না। বাসায় ফোন দিয়ে কান্নাকাটি করতাম। একবার তো বাড়ি গিয়ে আর আসিনি। পরে আমার মামাকে স্যার বুঝিয়ে মামার মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে। তবে থাকতে থাকতে এখন অনেকটা অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। বলতে পারেন এটিই আমার দ্বিতীয় ঘর-বাড়ি। বাসায় এখন তেমন যেতেও মন চায় না।’

স্থানীয়দের মধ্যে প্রভাব
পাহাড়ের মেয়েরা ফুটবলের পাশাপাশি এখন হকিতে আসছে? এমন প্রশ্ন করতেই ডনুচিং 
বলেন, ‘আগেই বলেছি, মনিকা-ঋতুপর্ণা চাকমাদের মতো এতদিন পাহাড়ের মেয়েদের স্বপ্ন ছিল ফুটবলকে ঘিরে। এখন তারা তাদের স্বপ্ন বদলেছে। কেবল ফুটবলের জন্য নয়; এখন তারা হকির জন্যও পরিশ্রম করে। হকি খেলোয়াড় হতে চায় পাহাড়ের অনেক মেয়েই। তবে তাদের নানা প্রতিকূলতার মুখেও পড়তে হয়। প্রথমত পাহাড়ে হকি খেলার মাঠ নেই। যে মাঠে মেয়েরা অনুশীলন করে সে মাঠ ঘাসের। টার্ফ ছাড়া হকি রপ্ত করা খুবই কষ্টের। তার ওপর স্টিক এবং বলের সমস্যা তো রয়েছেই। এতো প্রতিকূলতার 
ভেতরও তারা স্বপ্ন দেখে হকির স্টিক-বলে পৃথিবী জয়ের। আমিও বিশ্বাস করি, পাহাড়ের মেয়েরা যে পরিশ্রম করছে এখন হকির জন্য আগামীতে তারাই নেতৃত্ব দেবে লাল-
সবুজের হকির!’

আগামীর স্বপ্ন
আগামীর স্বপ্নের কথা জানতে চাইলে ডনুচিং মারমা সুইহ বলেন, ‘এতদিন স্বপ্ন ছিল ফুটবলার হওয়ার। এখন স্বপ্ন বদলেছে। হকিতে থাকতে চাই; যতদিন সম্ভব। আর এখনকার স্বপ্ন একটাই–সেটি হচ্ছে হকির বিশ্বকাপ খেলার। এটি অস্বাভাবিক মনে হলেও হতে পারে অনেকের কাছে। আমি এখন এই স্বপ্নটাই দেখি।’ 
মনিকা-ঋতুপর্ণা চাকমারা ফুটবলে যেমন স্বপ্ন দেখাচ্ছেন দেশকে, তেমনি হকির ডনুচিং মারমা সুইহও দেশের হকিকে নিয়ে যাবেন অনন্য উচ্চতায়; এমন স্বপ্ন আমরাও 
দেখতে পারি! 

আরও পড়ুন

×