প্রেরণা
ইতিহাস সাফল্যের হলেও ছিটকে পড়তে পারেন
জিয়ানলুইজি বুফন
আরমান খান
প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
জিয়ানলুইজি বুফন। ইতালির সর্বকালের অন্যতম গোলরক্ষক এবং ইতালি জাতীয় দলের হয়ে সর্বাধিক ম্যাচ খেলা ফুটবলার। আলোচিত এ ফুটবলারের সম্প্রতি ইতালির মিলান থেকে প্রকাশিত গাজেত্তা দেলো স্পোর্তকে দেওয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকার থেকে অনুপ্রেরণার কথা তুলে এনেছেন আরমান খান
আমি এখন আর ইতালির গোলপোস্টের নিচে দাঁড়াই না। অনেক দিন ধরেই আমি সাবেক। তবে আমি নানাভাবে জাতীয় দলের সঙ্গেই যুক্ত ছিলাম। আমি ইতালির ফুটবল-ভক্তদের আগেই সতর্কতার খবর দিয়েছিলাম। দশকের পর দশক ধরে চলে আসা আত্মতুষ্টি আর কর্তাদের অদূরদর্শী চিন্তাভাবনাই ইতালির ফুটবলকে খাদের কিনারে নিয়ে গেছে। চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ইতালি ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপের মতো ২০২৬ বিশ্বকাপেও জায়গা করে নিতে পারেনি। অথচ এবারের বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি দল নিয়ে চলছে। তবে ইতালির লজ্জা শুধু এখানেই শেষ না-ও হতে পারে। এভাবে চলতে থাকলে আরও তলানিতে যেতে পারে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দেশের ফুটবল।
২০১০ সালের সেই অমোঘ বাণী
২০১০ বিশ্বকাপ থেকে ব্যর্থ হয়ে ফেরার পর আমি বলেছিলাম, আমরা ভুল করেছি, সন্দেহ নেই। কিন্তু সাবধান! কয়েক বছর পর এমন দিন আসবে যখন বিশ্বকাপ জেতা তো দূরের কথা, বাছাইপর্ব পার হতে পারলেই আমরা উৎসবে মেতে উঠব। এখন নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন কর্তারা যে, ওটা কোনো জাদুকরি ভবিষ্যদ্বাণী ছিল না, ছিল নির্মম বাস্তবতাকে আগেভাগে চিনতে পারার ক্ষমতা। আমি বুঝতে পারছিলাম কী হতে যাচ্ছে। পরিবর্তনগুলো খুব দ্রুত ঘটছিল। আমি চেয়েছিলাম, আমরা যেন নিজেদের এমন কোনো রূপকথার গল্প না শোনাই, যার অস্তিত্ব বাস্তবে নেই।
অতীতের জাবর কাটা
অতীতের জাবর কাটা আর সেই অলস ‘ফড়িং’ ইউরোপের অন্য পরাশক্তিদের সঙ্গে ইতালির পার্থক্যটা কোথায়? আমি মনে করি, ইতালি এখনও ইতিহাসের বোঝা ঘাড়ে নিয়ে ঘুরছে, যেখানে অন্যরা বর্তমানে বাঁচে। সমস্যা হলো আমরা দুই নৌকায় পা দিয়ে চলছি। ফ্রান্স ৩০ বছর ধরে রাজত্ব করছে, স্পেন প্রায় ২০ বছর ধরে। ওরা বর্তমান নিয়ে ভাবে। আর আমরা? আমরা অহংকারী। আমরা ভাবি, ঐশ্বরিক কৃপায় সবকিছু আমাদের পাওনা। আমাদের তো বুফন আছে, ক্যানাভারো আছে, টট্টি আছে–আর কী লাগে? আমাদের উচিত ছিল তখনই কৌশল আর মডেলে পরিবর্তন আনা। আমরা তা না করে ওই গল্পের ফড়িংয়ের মতো হয়ে গিয়েছিলাম। যারা শুধু গান গেয়ে সময় কাটিয়েছে, ভবিষ্যতের রসদ জমায়নি।
অল্পতেই হাঁপিয়ে উঠি
বলতে দ্বিধা নেই, আমরা অল্পতেই হাঁপিয়ে উঠি। অথচ ২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে নিজের লক্ষ্য তৈরি করে নিয়েছি আমি; কথা দিচ্ছি, সুরক্ষা দেব, খেয়াল রাখব। যে কোনো শত্রুর বিপক্ষেই হয়ে উঠব বাধার প্রাচীর। নিজের চেয়েও অন্যের কল্যাণ, অন্যের সুরক্ষাই আমার কাছে অগ্রগণ্য। ১২ বছর বয়সে যে আমি ঘুরে দাঁড়িয়েছিলাম, যতদিন পায়ে আছে শক্তি, যতদিন অন্তর আমার সচল– চলবেই পথচলা; এই কথা মিথ্যে ছিল না। আমি পথ চলেছি। যখন পারিনি তখন সরে দাঁড়িয়েছি।
বয়স তখন ১২
একটু পেছনে ফিরে যাই। আমার তখন সবে ১২ বছর বয়স। আচমকাই ঘুরে দাঁড়ালাম। আর বাতিল করে দিলাম কোনো নিশ্চিত ভবিষ্যতের সম্ভাবনা। কেননা, নিজ অন্তরের ডাক শুনেছিলাম আমি। সহজাত প্রবৃত্তি আমাকে দেখিয়েছিল পথ। তবে বলে দিচ্ছি, যেদিন আমি ঘুরে দাঁড়িয়েছিলাম, সেদিন আসলে ভালোবেসে নিয়েছি জীবনকে। সেদিন আসলে নিজের নিরাপত্তার বিষয়টি জাগ্রত করে নিয়েছি অন্তঃস্থলে। শিখে গিয়েছি প্রথম ও শেষ কথা হলো, রক্ষা করতে হবে আমাদের।
কথা দিয়েছিলাম নিজেকে
নিজেকে কথা দিয়েছিলাম আমি, আর কোনো দিনই ফিরব না পুরোনো পথে; কিংবা বলা ভালো, যতদূর সম্ভব না ফেরার চেষ্টা করব। জীবনে এমনটা যতবার করেছি আমি ততবারই ভুগেছি নিদারুণ যাতনায়। পেয়েছি টের; যারা তাকিয়ে আছেন আমার দিকে; প্রচলিত পথে হাঁটিনি বলে আমার ভবিষ্যতের প্রশ্নে যারা উদ্বিগ্ন, কী অসহনীয় বেদনাই না তাদের দিয়েছি আমি!
হাঁটুন; নিজের লক্ষ্যের পথে...
তারপর আবারও করেছি এমনটা; বারবার! চন্দ্র ও সূর্যের মতোই, আমরাও, আমরা প্রত্যেকেই একে অপরের আজন্ম বিপরীত অথচ পরিপূরক। পরস্পরকে ছুঁতে না পেরেই, একজনকে আরেকজনের পর্যায়ক্রমে জায়গা ছেড়ে দিতে দিতে এই বেঁচে থাকা আমাদের। এ এমনই এক জীবন, যেখানে প্রতিপক্ষের সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দেওয়াই গর্বের! আসলেই কি তাই, নাকি ওই যে বললাম, পঁচিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে নিজের লক্ষ্যকে তৈরির পথে হেঁটেছি। আপনিও হাঁটুন; নিজের লক্ষ্যের পথে! ইতালির ফুটবলের মতো আপনিও পথ থেকে ছিটকে পড়তে পারেন। তবে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। ইতিহাস ঘাড়ে নিয়ে নয়; নিজের পরিশ্রম আর আত্মবিশ্বাসে ভর করে।
- বিষয় :
- প্রেরণার কথা