ঢাকা রোববার, ০১ নভেম্বর ২০২৬

ক্যারিয়ার

গুরুত্ব দেবেন যে ৫ কথায়

গুরুত্ব দেবেন যে ৫ কথায়
×
×

ক্যারিয়ার গঠনের প্রস্তুতি নিতে হবে এখনই... মডেল: সাজিদ সুহান, মেহের নিগার ও সাকির; ছবি: সাহস

এম এম মাহবুব হাসান

প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশ এখন জনমিতিক লভ্যাংশের এক বিরল সময় পার করছে। আমাদের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের বেশি তরুণ। কর্মক্ষম মানুষের এই আধিক্য যেকোনো দেশের জন্য উন্নয়নের সবচেয়ে বড় সুযোগ। কিন্তু সুযোগটি চিরস্থায়ী নয়। সময়মতো এই তরুণদের দক্ষ ও উৎপাদনশীল করে তোলা না গেলে লভ্যাংশ বোঝায় পরিণত হতে খুব বেশি সময় লাগে না।

পাঁচজন বেকারের চারজনই তরুণ!
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, দেশে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ২৪ হাজার। এর মধ্যে ২০ লাখ ৩২ হাজারই ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী; অর্থাৎ প্রতি পাঁচজন বেকারের প্রায় চারজনই তরুণ! আরও উদ্বেগের বিষয়, বেকারদের প্রায় ৯ লাখই স্নাতক ডিগ্রিধারী, যা শিক্ষাস্তরভিত্তিক হিসাবে সর্বোচ্চ। উচ্চশিক্ষিত চাকরিপ্রার্থীদের ১৭ শতাংশের বেশি দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে কাজ খুঁজছেন। অথচ প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১৩ লাখ ৬০ হাজার মানুষ নতুন করে শ্রমবাজারে ঢুকছেন। সানেমের এক গবেষণা বলছে, প্রায় ৮৬ লাখ তরুণ পড়াশোনা, চাকরি বা প্রশিক্ষণ-কোনোটির সঙ্গেই যুক্ত নন। সংখ্যার আড়ালে আছে আরও গভীর উদ্বেগ।

প্রতিযোগিতা এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গেও
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সাময়িকীর সেপ্টেম্বর ২০২৬ সংখ্যার তথ্য অনুযায়ী, এশিয়াজুড়ে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব সবচেয়ে বেশি, আর বাংলাদেশে শিক্ষিত তরুণদের ৩৬ শতাংশ বেকার। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ফিউচার অব জবস রিপোর্ট ২০২৫ বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে কর্মীদের মূল দক্ষতার ৩৯ শতাংশ বদলে যাবে, কর্মক্ষেত্রে মোট কাজের ৩৭ শতাংশই পুরোপুরি অটোমেটেড হয়ে যাবে এবং প্রতি ১০০ জন কর্মীর ৫৯ জনকে নতুন করে প্রশিক্ষণ নিতে হবে। অর্থাৎ আমাদের তরুণদের প্রতিযোগিতা এখন দেশের ভেতরে নয়; ভিয়েতনাম, ভারত বা ফিলিপাইনের সমবয়সীদের সঙ্গে; এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গেও।

এগিয়ে যেতে...
এই বাস্তবতায় হতাশ না হয়ে কীভাবে এগিয়ে যাওয়া যায় চলুন, দেখি–
ভালো ফলাফল:  অনেকে বলেন, ফলাফল নয়, দক্ষতাই আসল। কথাটি অর্ধসত্য। বাস্তবে বহু প্রতিষ্ঠান প্রথম ধাপে একটি ন্যূনতম সিজিপিএ বেঁধে দিয়ে হাজারো আবেদন ছেঁকে ফেলে। ফলে মেধাবী অনেক তরুণ শুধু সামান্য কম নম্বরের কারণে পছন্দের পেশায় আবেদন করতে পারেন না। দক্ষতা দেখানোর সুযোগ আসার আগে দরজা বন্ধ হয়ে যায়। তাই ভালো ফলকে লক্ষ্য না ভেবে ভিত্তি হিসেবে দেখতে হবে–এটি ভবিষ্যতের বিকল্পগুলো খোলা রাখার বীমা। 
বিকল্প পোর্টফোলিও তৈরি: চাকরিই নিরাপত্তা–এই ধারণা আমাদের সমাজে গভীরভাবে প্রোথিত। ৪৭তম বিসিএসে ৩ হাজার ৬৮৮টি পদের বিপরীতে আবেদন করেছিলেন ৩ লাখ ৭৪ হাজার ৭৪৭ জন; অর্থাৎ প্রতি পদের জন্য প্রায় ১০২ জন। গণিতটা স্পষ্ট–অধিকাংশ প্রার্থীকে অন্য পথে যেতে হবে। সমস্যা বিসিএসের স্বপ্নে নয়, সমস্যা ‘একমাত্র স্বপ্ন’ হিসেবে দেখায়। বছরের পর বছর প্রস্তুতিতে কেটে গেলে বয়স, আত্মবিশ্বাস ও সৃজনশীলতা–তিনটিই ক্ষয় হয়। তাই প্রস্তুতির জন্য একটি সময়সীমা ঠিক করা জরুরি, আর সমান্তরালে উদ্যোক্তা হওয়া, ফ্রিল্যান্সিং, গবেষণা বা বেসরকারি খাতের কোনো একটি পথ জীবন্ত রাখা দরকার। নিরাপত্তা আসে একক চাকরি থেকে নয়, একাধিক সক্ষমতা ও নিজের তৈরি বিকল্প পোর্টফোলিও থেকে।
‘টি-আকৃতির’ দক্ষতা গড়ে তোলা : ইংরেজি ‌‘টি’ অক্ষরটি কল্পনা করুন। খাড়া দাগটি নিজের মূল বিষয়ে গভীর জ্ঞান; আড়াআড়ি দাগটি তার বাইরের নানা দক্ষতা। ইতিহাসের শিক্ষার্থী যদি ডেটা ভিজ্যুয়ালাইজেশন শেখেন, কিংবা বাণিজ্যের শিক্ষার্থী যদি ভিডিও সম্পাদনা বা এআই টুল ব্যবহারে পারদর্শী হন, তাহলে তিনি সহপাঠীদের ভিড় থেকে আলাদা হয়ে যান। অধিকাংশ তরুণ মনে করেন, প্রয়োজন হলে কোনো প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে ঢুকে পড়বেন। দক্ষতা প্রয়োজনের মুহূর্তে কেনা যায় না; একে ধীরে ধীরে চর্চায় গড়তে হয়। 
আর্থিক শিক্ষা: অনেক তরুণ ভাবেন, চাকরি পেলে টাকা সামলানো এমনিতেই শিখে যাবেন। বাস্তবতা ভিন্ন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর এক গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ৯ দশমিক ৭৪ শতাংশের পর্যাপ্ত আর্থিক জ্ঞান রয়েছে। আর্থিক শিক্ষা সময়ের সঙ্গে চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ে, ঠিক সঞ্চয়ের মতো। বাজেট করা, সঞ্চয়, ঝুঁকি বোঝা, প্রতারণামূলক ‘দ্রুত বড়লোক হওয়ার’ ফাঁদ চেনা–এসব না জানলে ব্যবসায় বিনিয়োগ তো দূরের কথা, প্রথম বেতনটিও হাতছাড়া হতে পারে। 
নেটওয়ার্কিং ও দৃশ্যমানতা: প্রতিভা থাকা আর প্রতিভা দৃশ্যমান হওয়া এক কথা নয়। অনেক তরুণ চমৎকার প্রকল্প করেন, প্রতিযোগিতায় জেতেন, স্বেচ্ছাসেবায় নেতৃত্ব দেন; কিন্তু তাদের নিজের বৃত্তের বাইরে কেউ তা জানে না। অথচ নিয়োগকর্তারা এখন প্রার্থী খোঁজেন লিংকডইনের মতো পেশাজীবী প্ল্যাটফর্মে। সেখানে একটি হালনাগাদ প্রোফাইল এবং নিয়মিত নিজের চিন্তা, শেখা ও অর্জন নিয়ে লেখা একজন শিক্ষার্থীকে সাধারণ আবেদনকারী থেকে পরিচিত মুখে পরিণত করে। পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন খাতের পেশাজীবীদের সঙ্গে প্রফেশনাল সম্পর্ক গড়ে তুলুন, সেমিনার ও শিল্প-একাডেমিয়া কর্মসূচিতে অংশ নিন। 

বসে থাকার সময় নেই
তরুণদের কর্মসংস্থানে রাষ্ট্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্প খাতের দায় অনেক বড়। পাঠ্যক্রমকে বাজারের সঙ্গে মেলানো, নিয়মিত শ্রমবাজারের তথ্য প্রকাশ এবং উদ্যোক্তাবান্ধব অর্থায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। তবে নীতির অপেক্ষায় বা কারও হাতের তুরুপের তাস হিসেবে বসে থাকার সময় তরুণদের হাতে নেই! 
লেখক: ব্যাংকার ও উন্নয়ন গবেষক

আরও পড়ুন

×