ঢাকা রোববার, ০১ নভেম্বর ২০২৬

প্রকৃতি রক্ষার বিশ্বমঞ্চে আমাদের তারুণ্য

প্রকৃতি রক্ষার বিশ্বমঞ্চে আমাদের তারুণ্য
×
×

জাতিসংঘের জীববৈচিত্র্য সম্মেলন কপ১৭-এ সরকারের পাশাপাশি তরুণরাও উন্নত দেশগুলোর কাছে অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বাড়ানোর দাবি জানান... ছবি: লেখকের সৌজন্যে

সোহানুর রহমান

প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

২ হাজার ৮০০ বছরের পুরোনো শহর আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভান। ‘গোলাপি শহর’ নামে পরিচিত এই শহরে ১৮ অক্টোবর শুরু হয় জাতিসংঘের জীববৈচিত্র্য সম্মেলন কপ১৭। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে সম্মেলন চলে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত। কপ১৭-এর উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে জলবায়ু ও প্রকৃতি সুরক্ষায় বৈশ্বিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ। সম্মিলনে ইয়ুথনেট গ্লোবালের তরুণ প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিয়ে অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন সোহানুর রহমান

সম্মেলন কেন্দ্রের ভেতরে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ চোখ আটকে গেল বেশ কিছু হাতির ছবিতে। ওপরে লেখা, ‘ইটস টাইম টু ফেস দি এলিফ্যান্টস ইন দ্য রুম’। অর্থাৎ বড় সমস্যাগুলো সামনে থাকলেও আমরা এড়িয়ে যাই। এবার সেগুলোর মুখোমুখি হওয়ার সময়। ছবিটি দেখে মনে পড়ে বাংলাদেশের গারো পাহাড়ের হাতিগুলোর কথা। মেঘালয় সীমান্তে একসময় যে পথ দিয়ে তারা চলাচল করত, এখন সেখানে কাঁটাতারসহ নানা বাধা। খাবারের সন্ধানে হাতি ঢুকে পড়ছে লোকালয়ে। মানুষ আতঙ্কে থাকছে, হাতিও বিপদে পড়ছে। অথচ হাতি তো সীমান্ত বোঝে না! শেরপুর ও ময়মনসিংহের সীমান্তবর্তী এলাকায় আনুমানিক ১৩০ থেকে ১৩৫টি বন্যহাতির বিচরণ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তাই তরুণ পরিবেশকর্মীদের ‘এলিফ্যান্ট ইন দ্য রুম’ কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের কাছে হাতির নিরাপদ চলাচল এবং স্থানীয় মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবি জানালাম।

২ হাজার ৮০০ বছর বয়সী শহরে
যে শহরে দাঁড়িয়ে এসব কথা বলছি, তার ইতিহাসও বিস্ময়কর। ইয়েরেভানের বয়স ২ হাজার ৮০০ বছরের বেশি। খ্রিষ্টপূর্ব ৭৮২ সালে রাজা প্রথম আর্গিস্তি এখানে এরেবুনি দুর্গ গড়ে তোলেন। গোলাপি পাথরের ভবনের জন্য শহরটি ‘গোলাপি শহর’ নামে পরিচিত। অক্টোবরের মিষ্টি রোদ, সন্ধ্যার হিমেল হাওয়া আর দূরের আরারাত পর্বত তার সৌন্দর্য বাড়িয়েছে। এই শহরেই ১৮ অক্টোবর শুরু হয় জীববৈচিত্র্য সম্মেলন কপ১৭। ইয়ুথনেট গ্লোবালের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিয়েছিলাম বাংলাদেশ থেকে। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে সম্মেলন চলে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত। 

প্রকৃতি রক্ষায় টাকার হিসাব
সম্মেলন কক্ষে ঢুকতেই শোনা যায় অর্থায়নের আলোচনা। প্রকৃতি রক্ষায় টাকা দেবে কারা? সেই টাকা পৌঁছাবে কোথায়? বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্য কাঠামো তহবিলে প্রায় ছয় কোটি ডলারের নতুন প্রতিশ্রুতি এলো। জার্মানি একাই দেওয়ার কথা বললো পাঁচ কোটি ইউরো। অথচ ২০৩০ সালের মধ্যে সব উৎস থেকে বছরে অন্তত ২০ হাজার কোটি ডলার সংগ্রহের লক্ষ্য রয়েছে। এই তহবিল সেই বৃহত্তর অর্থায়নব্যবস্থার একটি অংশ। আরেকটি হিসাব শুনে থমকে গেলাম। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির প্রতিবেদন বলছে, প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানে প্রতি এক ডলার বিনিয়োগের বিপরীতে প্রকৃতির ক্ষতি করে এমন কর্মকাণ্ডে ৩০ ডলারের বেশি অর্থ প্রবাহিত হচ্ছে। প্রকৃতি বাঁচানোর জন্য এত আলোচনা, অথচ তার ক্ষতি করে এমন খাতেই যাচ্ছে বহুগুণ অর্থ!
শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ আলোচনার পর দেশগুলো ‘ইয়েরেভান পথনকশা’সহ কয়েকটি সিদ্ধান্তে একমত হলো। জাতীয় পরিকল্পনা, অগ্রগতি পর্যালোচনা ও অর্থায়নে গুরুত্ব দেওয়া হলো। ক্ষতিকর ভর্তুকি কমাতে এলো স্বেচ্ছামূলক উদ্যোগ। কিন্তু পর্যাপ্ত অর্থের নিশ্চয়তা মিলল না। 

জলবায়ু ও প্রকৃতি সুরক্ষায় বাংলাদেশের আহ্বান
কপ১৭-এর উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে জলবায়ু ও প্রকৃতি সুরক্ষায় বৈশ্বিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ। প্রতিনিধি দলের প্রধান পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানম জীববৈচিত্র্য সনদের ২০ ও ২১ অনুচ্ছেদের আলোকে উন্নত দেশগুলোর কাছে সহজলভ্য অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বাড়ানোর দাবি জানান। তিনি বলেন, কুনমিং-মন্ট্রিয়ল কাঠামো অনুযায়ী ২৩টি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং ২০৩১ সালের মধ্যে ২৫ কোটি গাছ লাগানো হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এ কে এম সোহেল সহজ শর্তে ঋণ ও কম সুদে পুনঃঅর্থায়ন চান। তাঁর মতে, ৪২০ কোটি ডলারের জলবায়ু বাজেটের বিপরীতে অভিযোজনে বছরে প্রয়োজন প্রায় ৮৫০ কোটি ডলার। পরিবেশ সচিব ফাহমিদা মনে করেন, কপে বাংলাদেশ এককভাবে কিছু অর্জন না করলেও সম্মিলিত অর্জন হয়েছে। 

কোটি ডলারের আলোচনা, মনে বরিশালের মান্তা
এসব আলোচনার মাঝেই বারবার মনে পড়ছিল বরিশালের লাহারহাটের কথা। সেখানে মান্তা জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, নদীই তাঁদের ঘর, নদীই জীবিকার ভরসা। ইয়েরেভানে কোটি কোটি ডলারের হিসাব শুনতে শুনতে ভাবছিলাম, সেই অর্থের সামান্য অংশও কি এসব মানুষের কাছে পৌঁছাবে? 

ঔষধি গাছের জিনগত তথ্যে লাভ কার?
সম্মেলনে আরেকটি আলোচনায় উঠে এলো জীবের জিনগত তথ্যের ডিজিটাল ব্যবহার। একে বলা হয় ডিজিটাল সিকুয়েন্স ইনফরমেশন বা ডিএসআই। ধরা যাক, বাংলাদেশের কোনো ঔষধি গাছের জিনগত তথ্য ব্যবহার করে একটি কোম্পানি নতুন পণ্য তৈরি করল। সেই ব্যবসার লাভ থেকে প্রকৃতি রক্ষায় কতটা অর্থ আসবে? প্রকৃতি থেকে সুবিধা নেওয়ার পাশাপাশি তাকে রক্ষার দায়ও নিতে হবে ব্যবসায়ীদের। এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বছর দুই আগে তৈরি হলো ‘ক্যালি তহবিল’। জিনগত তথ্যের বাণিজ্যিক ব্যবহার থেকে আর্থিক অবদান সংগ্রহের বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা এটি। তবে নির্দিষ্ট কোনো গাছের উৎস জনগোষ্ঠীকে সরাসরি মুনাফা দেওয়ার ব্যবস্থা নয়। 

জীবপ্রযুক্তি ও কৃষকের ভবিষ্যৎ
জীবপ্রযুক্তির নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনাও মন দিয়ে শুনেছি। আধুনিক জীবপ্রযুক্তিতে জিনগত উপাদানের নতুন সমন্বয় তৈরি হওয়া জীবন্ত জীবকে বলা হয় এলএমও। এসব জীবের সম্ভাব্য পরিবেশগত ঝুঁকি যাচাইয়ে কার্টাহেনা প্রটোকলের ভূমিকা রয়েছে। আলোচনায় এসেছে বাস্তুসংস্থানভিত্তিক চাষাবাদ বা অ্যাগ্রোইকোলজির কথাও। এতে মাটির স্বাস্থ্য, দেশীয় বীজ, ফসলের বৈচিত্র্য ও কৃষকের জ্ঞান গুরুত্ব পায়।
বাংলাদেশের কৃষকদের কথা মনে হয়েছে। শুধু বেশি ফসল ফলালেই চলবে না; মাটি, পানি ও জীববৈচিত্র্যও বাঁচাতে হবে। নতুন প্রযুক্তির সুবিধা নিতে হবে সম্ভাব্য ঝুঁকি যাচাই করে। 

নারীর নেতৃত্ব ও তরুণদের বন্ধুত্ব
২০ অক্টোবর নারীর নেতৃত্ব নিয়ে এক আলোচনায় বাংলাদেশের ইকোমেন উদ্যোগ এবং মেনএনগেজ অ্যালায়েন্সের পরিবেশ ও জলবায়ু ন্যায়বিচারবিষয়ক কর্মদলের অভিজ্ঞতা তুলে ধরলাম। প্রশ্ন করেছিলাম, ঘরে রান্না করেন কে? সন্তান কিংবা অসুস্থ মানুষের যত্ন নেন কে? নারীদের নেতৃত্বে দেখতে চাই আমরা। অথচ ঘরের বেশির ভাগ কাজ তাদের ওপরই চাপিয়ে রাখি। সংসার সামলে সভায় যাওয়ার সময় পাবেন কখন তাঁরা? শুধু সভায় আসন রাখলে হবে না, সেখানে পৌঁছানোর সুযোগও তৈরি করতে হবে। এদিকে সম্মেলনে তরুণেরা আওয়াজ তুলেছেন প্রকৃতি রক্ষায় ‘সুবিচারের ঘাটতি’ পূরণের। প্রকৃতির ক্ষতির দায় কার, আর তার বোঝা বইছেন কারা? তরুণ, আদিবাসী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে ন্যায্য অংশ নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে। তবে আমার সবচেয়ে আনন্দের অভিজ্ঞতা ছিল বন্ধুত্ব। দক্ষিণ এশিয়াসহ নানা দেশের তরুণদের সঙ্গে পরিচয় হলো। ভাষা, সংস্কৃতি আলাদা, অথচ ভাবনায় কত মিল! সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক আলোচনার বাইরে আড্ডা আর অভিজ্ঞতা বিনিময়ে তৈরি হলো আপন সম্পর্ক। ভবিষ্যতে একসঙ্গে কাজ করার স্বপ্নও দেখলাম। ২৮ অক্টোবর দূষণ ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনায় বাংলাদেশের সিসা দূষণবিরোধী উদ্যোগের কথাও বলেছি।

ইয়েরেভানে ‘বাংলাদেশ’ এবং নতুন প্রত্যাশা
ইয়েরেভানে এসে শুনলাম, শহরের মালাতিয়া-সেবাস্তিয়া এলাকার একটি অংশকে স্থানীয়ভাবে ‘বাংলাদেশ’ বলা হয়। অবাক হলাম। মনে পড়ল পুরান ঢাকার আরমানিটোলার কথা। একসময় সেখানে আর্মেনীয় বণিকদের বসতি ছিল। ১৭৮১ সালে নির্মিত আর্মেনীয় গির্জা আজও সেই ইতিহাসের সাক্ষী। সম্মেলন কক্ষে প্রকৃতি রক্ষায় অর্থ আর নীতিমালা নিয়ে কত কথা শুনেছি। পরবর্তী জীববৈচিত্র্য সম্মেলন কপ১৮ হবে ২০২৮ সালে ইকুয়েডরের কিতোতে। দেশে ফিরে গারো পাহাড়ের হাতি, বরিশালের নদী, সুন্দরবন, হাওর আর প্রকৃতিনির্ভর মানুষের জন্য কাজ করার সময় পাথরটির কথা মনে পড়বে। ইয়েরেভানে প্রকৃতি রক্ষার যে কথাগুলো বলেছি, নিজের কাজেও সেগুলো সত্যি করে তুলতে চাই। 

আরও পড়ুন

×