ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

কিশোরী রেহানার কাছে হার মেনেছে অভাব

কিশোরী রেহানার কাছে হার মেনেছে অভাব
×

সামিউল মনির, শ্যামনগর (সাতক্ষীরা)

প্রকাশ: ২৭ নভেম্বর ২০২৫ | ১২:৫২

সব বাধা ডিঙিয়ে স্বপ্নের পথে ছুটছে কিশোরী রেহানা খাতুন। এই খেলোয়াড়ের কাছে পরাস্ত হয়েছে পেটের ক্ষুধা। ইস্পাত কঠিন মনোবল নিয়ে এগিয়ে চলেছে ক্রীড়াঙ্গনে। দিন এনে দিন খাওয়া পরিবারে জন্ম নেওয়া এই কিশোরী স্বপ্ন দেখছে বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের জন্য সুনাম কুড়ানোর। একজন খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্ব হকি মঞ্চে প্রিয় মাতৃভূমির মুখ উজ্জ্বল করার সারথি হওয়ার আকাঙ্ক্ষা তার। অদম্য এই কিশোরীর বাড়ি সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকা শ্যামনগর উপজেলার হায়বাদপুর গ্রামে।
জানা গেছে, খেলার প্রতি প্রচণ্ড ভালোবাসা থাকা রেহানা একসময় স্থানীয় খেলোয়াড়দের বুট-বল টেনে বেড়াত। বাবার চায়ের দোকানের পাশে থাকা দুর্বার সংঘ নামের ক্লাবের দরজা-জানালা খোলা আর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব ছিল তার। অথচ নিজের অদম্য চেষ্টা আর কঠোর পরিশ্রমে জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশের বয়সভিত্তিক জাতীয় হকি দলে। ইতোমধ্যে দেশের হয়ে চীনে অনুষ্ঠিত এশিয়ান কাপে (অনূর্ধ্ব-১৮) নজরকাড়া পারফরম্যান্স দিয়ে দলকে তৃতীয় স্থানে তুলে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে রেহানা। জাপান ও চীনের মতো এশিয়ান হকির পরাশক্তির বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে লড়ে প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছে। শুরু থেকেই দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াইয়ে জিততে মরিয়া উপকূল এলাকার এই কিশোরী। 
শুরুটা যেভাবে
বিকেল হতেই দরিদ্র চা দোকানি বাবা শেখ আবু কওছারকে পাশের নকিপুর পাইলট হাই স্কুল মাঠে ফুটবল খেলতে দেখত। মাঝেমধ্যে বাবার খেলার সরঞ্জামসহ ফুটবল টেনে নিয়ে যেতে হতো মাঠে। এমনকি খেলোয়াড় সংকটের মুহূর্তে দুই বোন রেশমা-রেহানা শামিল হতো দলে। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় দৌড়ে প্রথম স্থান অধিকার করলে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয় রেহানার। শিশুতোষ মন পণ করে বসে ভবিষ্যতে খেলোয়াড় হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার।
খেলাধুলা
বর্তমানে বিকেএসপির নবম শ্রেণিতে পড়ালেখা করছে রেহানা খাতুন। সে জানায়, পৈতৃক জমিজমা না থাকায় পাঁচ সদস্যের পরিবারটি চলে দরিদ্র বাবার চায়ের দোকানের উপার্জনে। বুঝতে শেখার পর থেকেই প্রতিদিন পালা করে সেখানে সময় দিতে হতো। একমাত্র ভাই ফয়সাল আলমকে ব্যস্ত থাকতে হয় রাজমিস্ত্রির সহকারীর কাজে। বাবা ক্রীড়ামোদী হওয়ায় শিশু বয়স থেকেই বড় বোন রেশমার মতো রেহানারও খেলাধুলার প্রতি প্রচণ্ড ঝোঁক ছিল। বাবা কওছার আলীর মতো তারা দুই বোন ফুটবলের গোলপোস্ট আগলানোর কাজে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করত। বিদ্যালয়ের ক্লাস শেষে প্রতিদিন বড় বোনের সঙ্গে চা দোকানে বাবাকে সহায়তা করত রেহানা। তবে বিকেল হতেই মায়ের কাঁধে ক্রেতা সামলানোর দায়িত্ব দিয়ে বাবার সঙ্গে মাঠে চলে যেত।
নিজেকে খুঁজে পাওয়া
রেহানা জানায়, হায়বাদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে গোলবারের নিচে দলের পক্ষে ভালো করলে তার মধ্যে আত্মবিশ্বাস দানা বাঁধে। এ সময় স্থানীয় প্রশিক্ষক আক্তার হোসেনের তত্ত্বাবধানে নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করে। একপর্যায়ে তাঁর হাত ধরে বিকেএসপির ‘হান্টিং প্রোগ্রামের’ ট্রায়ালে অংশ নিতে থাকে রেহানা। এভাবে টানা পাঁচবার ব্যর্থতার কষ্টে মুখ ঢেকে বাড়িতে ফিরতে হয়। তবে ষষ্ঠবারের চেষ্টায় ফুটবলের পাশাপাশি হকি ইভেন্টের ট্রায়ালে উত্তীর্ণ হলে স্বপ্নপূরণের দিকে এক ধাপ এগিয়ে যায় রেহানা।
প্রতিষ্ঠানের বেতন নিয়ে উদ্বেগ
রেহানার মা ফজিলা বেগমের ভাষ্য, বড় মেয়ে রেশমার বিয়ে হয়ে গেছে। ছোট মেয়ে রেহানা বিকেএসপিতে পড়ালেখা করলেও শিক্ষা বছরের শুরুতে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ গুনতে হয়। খেলার সরঞ্জামসহ পোশাক-পরিচ্ছদ কেনার বায়নাও থাকে। এসব বিবেচনায় বিকেএসপিতে ভর্তির পর নিজেদের অক্ষমতার কথা জানিয়ে অসংখ্যবার তাকে বাড়িতে ফিরতে বলা হয়েছে। কিন্তু আবদার অপূর্ণ থাকার কষ্টে নিরাশ হয়ে প্রতিবার কান্না করে বাড়ি ছাড়লেও কখনও হাল ছাড়েনি রেহানা। 
সমাজের ভ্রুকুটি সইতে হয় প্রতিনিয়ত
রেহানার বাবা শেখ আবু কওছার জানান, অজপাড়াগাঁয়ের মেয়ে হয়ে মাঠে-ঘাটে খেলা মানতে পারেন না অনেকে। কিছু মানুষ বাঁকা চোখে দেখে। তবে সমাজের ভ্রুকুটি কর্ণপাত করেন না তিনি। তাঁর ভাষ্য, রেহানা বয়সভিত্তিক জাতীয় দলে খেলার পর থেকে এলাকার শিশুদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
হার মেনেছে প্রতিকূলতা
রেহানার স্থানীয় প্রশিক্ষক আক্তার হোসেন জানান, দরিদ্র ঘরের মেয়ে রেহানা অসংখ্যবার দুপুরের খাবার না খেয়েই অনুশীলনে যেত। একাধিকবার মাঠে তাকে অভুক্ত কিংবা পাউরুটি-কলা খেয়ে নামতে দেখা গেছে। খেলোয়াড় হওয়ার প্রতি তীব্র ঝোঁকের কাছে যেন বারবার পরাস্ত হয়েছে তার পেটের ক্ষুধা।
শ্যামনগর উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সাবেক সাধারণ সম্পাদক শেখ জাবের হোসেনের ভাষ্য, সংসারে অভাবের কারণে বাধ্য হয়ে অনেক সময় দুপুরে না খেয়েও খেলতে হয়েছে রেহানাকে। মিথ্যা বলতে না পারায় ‘দেরি হয়ে যাওয়ায় খাওয়ার সুযোগ মেলেনি’ বলে দাবি করত সে। মেধার পাশাপাশি ‘ফাইটিং স্পিরিট’ থাকায় এতদূর এসেছে রেহানা। v

আরও পড়ুন

×