গোয়ালনগরের অদম্য শিশুরা
গোয়ালনগরের প্রতিটি সকালই যেন এমন এক আয়োজন, যেখানে কাদাপানি হার মানে শিশুদের আগ্রহের কাছে সমকাল
মুরাদ মৃধা, নাসিরনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)
প্রকাশ: ৩০ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:৪৯ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর ২০২৫ | ১৪:০৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
সকাল সাড়ে ৮টা। দক্ষিণদিয়া গ্রামের ছোট্ট রায়হান হাতে জুতা, পিঠে কালো ব্যাগ ঝুলিয়ে হাঁটছে কাদা মাড়িয়ে। কাদায় পা ডোবে আবার টেনে তুলে এগিয়ে যায় সে। তবু তার চোখেমুখে কোনো অনীহা নেই–শুধু যেন এগিয়ে যাওয়ার তাড়া।
রায়হান উপজেলার গোয়ালনগর ইউনিয়নের দক্ষিণদিয়া গ্রামের নুর আলীর ছেলে। সে গোয়ালনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। রায়হানের মতো আরও অগণিত শিশু প্রতিদিন সকালে একই পথ ধরে ছুটে চলে গোয়ালনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দিকে।
এই দৃশ্য নতুন নয়, গোয়ালনগরের প্রতিটি সকালই যেন এমন এক আয়োজন, যেখানে কাদাপানি হার মানে শিশুদের আগ্রহের কাছে। চারপাশের প্রতিকূলতার মধ্যেও এখানে শেখা থেমে নেই, বরং চলমান সংগ্রামই শিক্ষার শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গোয়ালনগর ইউনিয়নের ১৪টি গ্রাম– দক্ষিণদিয়া, সিমেরকান্দি, পিয়ালপুর, ঝামারবালি থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত চরের জনপদ পর্যন্ত–সবখান থেকেই শিশুরা হাঁটতে হাঁটতে বিদ্যালয়ে পৌঁছায়। নাসিরনগর সদর থেকে নৌকা, পাকা-কাঁচা রাস্তা, আবার
খেয়া পার হয়ে এগোতে হয় গোয়ালনগর গ্রামের দিকে।
২৪ দশমিক ৩৫ বর্গকিলোমিটারের এই ইউনিয়নে বসবাস করেন প্রায় ২৫ হাজার মানুষ। ১১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে এই ইউনিয়নে। কোনোটিতেই নেই খেলার মাঠ। নেই শিশুবান্ধব ওয়াশব্লক। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থাও অনুপস্থিত। জরুরি প্রয়োজনে খোলা জমিই একমাত্র অবলম্বন। জাতীয় অনুষ্ঠানও হয় হাওরের শুকনো জমিতে। শহীদ মিনার না থাকায় শিশুদের শ্রদ্ধা জানাতে হয় কলাগাছ দিয়ে তৈরি প্রতীকী মিনারে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়, অবহেলার এই চিত্রের মধ্যেই পড়াশোনায় গোয়ালনগর নজির স্থাপন করেছে। গোয়ালনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী প্রায় ৪০০। এর ৭০ শতাংশই মেয়ে। সাতটি পদের বিপরীতে শিক্ষক আছেন পাঁচজন। এর পরও গত পাঁচ বছরে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা শূন্য। পঞ্চম শ্রেণির সবাই মাধ্যমিকে উত্তীর্ণ হয়েছে। প্রায় ৫০ জন স্কাউটস কার্যক্রমে জেলা-উপজেলায় কৃতিত্ব দেখিয়েছে। করোনাপূর্ব সময়ে বৃত্তি পেয়েছে ১২ জন। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. মনির মিয়া জেলার ‘শ্রেষ্ঠ শিক্ষক’ মনোনয়ন পেয়েছেন, যা এই অঞ্চলের শিক্ষা-সংগ্রামের সাফল্যের প্রতীক। ইউনিয়নের অন্য বিদ্যালয়গুলোতেও ঝরে পড়ার হার ২ থেকে ৫ শতাংশ।
হাওরের মতো শতভাগ ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য থাকলেও গোয়ালনগর ইউনিয়ন তথা নাসিরনগর উপজেলাটি সরকারি নথিতে ‘হাওর’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি। অথচ পাশের উপজেলা ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম হাওর হিসেবে নথিভুক্ত। আর নাসিরনগরের হওরাঞ্চলের সব উন্নয়ন প্রকল্প, সড়ক সংস্কার, দপ্তরগুলোয় জনবল বৃদ্ধি–সবকিছুই থমকে আছে।
ইউনিয়নের সবচেয়ে পুরোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভিটাডুবি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপিত হয় ১৮৭০ সালে। দেড়শ বছরের বেশি সময় পেরোলেও বিদ্যালয়ে কোনো মাঠ নেই, শিক্ষক নেই পর্যাপ্ত। অথচ একসময় এই বিদ্যালয়ই পুরো অঞ্চলে শিক্ষার আলোকচ্ছটা ছড়িয়েছে।
গত ১৬ নভেম্বর সকালে সরেজমিন দেখা গেল, গোয়ালনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নিচতলার ফ্লাড সেন্টারে গাদাগাদি দাঁড়িয়ে শিশুরা জাতীয় সংগীত গাইছে। মাঠ না থাকায় এটাই বিদ্যালয়ের দৈনন্দিন চিত্র। ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের শিশুদের কাদা মাড়িয়ে বিদ্যালয়ে আসা এবং ছুটির পর বাড়িতে ফিরে মাঠে গিয়ে কৃষিকাজে সহায়তা করার দৃশ্যও চোখে পড়ে।
ওই স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির রূপালী বেগম বলে, স্কুলে যাওয়ার আগে জমিত কাজ করি, ফেরার পরও করি। তবু পড়ালেখা ছাড়ি না। তার মা শরিফা বেগম বলেন, ‘দুই বছর আগে উজানের ঢলে ফসল নষ্ট হয়েছে। এবার খাল ভরাট হওয়ায় জমিতে ধান রোপণই সম্ভব হয়নি। অভাব আছে, ভয় আছে, তবু মেয়েটারে স্কুলে পাঠাই। মানুষ হওয়া লাগবে।’
আরেক শিক্ষার্থীর অভিভাবক হরিধন দাস বলেন, ‘পরিবারে ঠিকমতো তিন বেলা খাবার জোটে না। তার পরও মেয়েডারে ইস্কুলে পাঠাই। এবার আমার মেয়েডার রোল নম্বর ১ হইছে।’
গোয়ালনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘বিদ্যালয়ে চারটি গ্রাম থেকে ছাত্রছাত্রীরা আসে। সবাই কৃষিনির্ভর পরিবারের সন্তান। কষ্ট থাকা সত্ত্বেও অভিভাবকরা সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠান। আমি প্রতিটি শিক্ষার্থীর বাড়িতে মাসে দুইবার করে যাই। অসুস্থ হলে নিজে গিয়ে দেখে আসি। তবে বর্ষায় শিক্ষার্থীর উপস্থিতি কমে যায়। পানিতে ডুবে যাওয়ার ভয়েই অনেক অভিভাবক শিশুদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে চান না।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন সায়েন্সেস অ্যান্ড ফিশারিজ অনুষদের সাবেক ডিন ড. মো. শফিকুল ইসলাম এই গোয়ালনগরের সন্তান। তিনি সমকালকে বলেন, ‘আমি এই ইউনিয়নের একজন গর্বিত সন্তান। এ গ্রামের শিশুদের শিক্ষাসংগ্রাম শুধু একটি গ্রামের গল্প নয়–এটি হাওর ও উপকূলের বিস্তৃত বাস্তবতা। হাওরবেষ্টিত এলাকা হয়েও স্বীকৃতি না থাকায় উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এলাকার মানুষ।’ তিনি বলেন, শিক্ষা বাড়লে কৃষি উৎপাদন, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য সচেতনতা–সবই উন্নত হয়। গোয়ালনগরের শিশু ও তাদের বাবা-মায়ের যে উদ্যম, তা প্রমাণ করে পরিবর্তনের শক্তি তাদের মধ্যে আছে। প্রয়োজন শুধু সঠিক পরিকল্পনা ও সরকারি সহায়তা।
গোয়ালনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজহারুল হক বলেন, ‘আমরা উপজেলা সদর থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপ। শত বছরেও আমাদের সড়ক যোগাযোগ স্থাপন হয়নি। হাওরের স্বীকৃতি মিললেই যোগাযোগ ব্যবস্থা বদলে যাবে। বিদ্যালয়গুলোরও উন্নয়ন হবে। শিশুদের কষ্ট দূর হবে। বহুবার দাবি জানিয়েছি, সিদ্ধান্ত হয়নি এখনও।’
নাসিরনগর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. ইছাক মিয়া বলেন, ‘এই এলাকাটি হাওরবেষ্টিত হওয়ায় শিক্ষক থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীরাও বঞ্চনার শিকার। এর পরও আমাদের শিক্ষকরা শতভাগ চেষ্টা করে যাচ্ছেন শিক্ষার আলো ছড়াতে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীনা নাসরিন জানান, সব প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে এখানকার শিক্ষার্থীরা দেশের বিভিন্ন স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছে। যদি সুযোগ-সুবিধা পায় তাহলে এই শিক্ষার্থীরা আরও ভালো ফল করবে। তিনি বলেন, যেখানে যোগাযোগ ব্যবস্থা যত ভালো, সেখানে উন্নয়ন তত বেশি। তাই হাওর মহাপরিকল্পনায় নাসিরনগর যুক্ত হলে আশা করা যায় যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ সব ক্ষেত্রেই নাসিরনগর এগিয়ে যাবে। তখন শিক্ষার ক্ষেত্রেও শিশুদের দুর্ভোগ লাঘব হবে।
- বিষয় :
- শিশু
- নাসিরনগর
- প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী
