ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সাবরাংয়ের সমুদ্রতটে পরিবর্তনের ঢেউ

সাবরাংয়ের সমুদ্রতটে পরিবর্তনের ঢেউ
×

সাবরাংয়ের জিরো পয়েন্টে যেতে চোখে পড়বে রাস্তার পাশে সাজিয়ে রাখা এমন বর্ণিল নৌকা সমকাল

আব্দুর রহমান, টেকনাফ (কক্সবাজার)

প্রকাশ: ৩০ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:৫১ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর ২০২৫ | ১৩:৫৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

সীমান্তঘেঁষা জনপদ টেকনাফের সাবরাং; যেখানে একসময় উন্নয়ন ছিল দূরের স্বপ্ন, সেখানে এখন বাস্তব রূপ পাচ্ছে দেশের সবচেয়ে বড় সমুদ্রভিত্তিক পর্যটন প্রকল্প ‘সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক’। স্থানীয়ভাবে ‘জিরো পয়েন্ট’ নামে পরিচিত মনোরম সাগরতটে নীল জলরাশির তীরে বিস্তৃত হচ্ছে বহুমুখী সম্ভাবনার এই উদ্যোগ। আন্তর্জাতিকমানের পর্যটন অবকাঠামো ও বিনোদন ব্যবস্থা নিয়ে বিশাল পরিকল্পনার প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পাল্টে যাবে সীমান্ত অঞ্চলের অর্থনৈতিক চিত্র।

প্রাণচঞ্চল সাগরতীর
টেকনাফ শহর থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের শেষপ্রান্ত সাগর-পাহাড়ের মিলনভূমি সাবরাং ইউনিয়ন। সেখানে ২ নম্বর ওয়ার্ডের খুরের মুখ এলাকায় ৯৬৫ একর জমিতে হচ্ছে প্রস্তাবিত সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক। 
সরেজমিনে দেখা যায়, মাটি ভরাটের কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। পার্কের ভেতরে দাঁড়িয়ে গেছে একটি তিনতলা আধুনিক প্রশাসনিক ভবন, যা পুরো প্রকল্পের কার্যক্রম পরিচালনার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে। অন্যদিকে সাগরতীরে পার্কের প্রবেশমুখে স্থাপন করা হয়েছে আইকনিক ফটো কর্নার, যা এখন পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ। প্রতিদিন কক্সবাজার, ঢাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ভ্রমণপিপাসুরা এখানে জড়ো হয়ে ছবি তুলছেন। উপভোগ করছেন ঢেউয়ের শব্দে মুখর শান্ত পরিবেশ।

স্থানীয়রা বলছেন, ট্যুরিজম পার্ক বাস্তবায়ন হওয়ার আগেই পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে সাবরাংয়ে। যে সমুদ্রতটে একসময় ঝোপ-জঙ্গলের নির্জনতা ছিল, সেখানে এখন মানুষের ভিড়। সাগরতীরের মনোমুগ্ধকর আলোছায়া, স্নিগ্ধ বাতাস আর সমুদ্রের জলরাশি যেন পর্যটকদের টেনে আনছে প্রতিদিন। এ ছাড়া মেরিন ড্রাইভ সড়কের পাশঘেঁষে সাজানো রয়েছে নান্দনিক সাজসজ্জার নৌকা। সেগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে পর্যটকরা ছবি তোলেন। 

পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে স্থানীয় অর্থনীতিতেও। পর্যটকের আগমন বাড়ায় কেউ সেখানে দোকান দিয়েছেন, কেউ খাবারের স্টল দিয়েছেন। স্থানীয়দের কেউ কেউ ট্যুর গাইড হিসেবে কাজের সুযোগ পাচ্ছেন। ‘সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক’ পুরোপুরি চালু হলে এই পরিবর্তন আরও বিস্তৃত হবে, সীমান্তের মানুষদের জীবনে এনে দেবে সমৃদ্ধি। 

স্থানীয়রা বলছেন, সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক শুধু একটি প্রকল্প নয়, এটি টেকনাফের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, পর্যটন ও জীবনমান পরিবর্তনের এক বিশাল সম্ভাবনার দ্বার। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে টেকনাফের ভবিষ্যৎ বদলে যাবে। 
সাবরাং ইকো পার্কে রংপুর থেকে ঘুরতে আসা সবুজ মিয়া বলেন, এক পাশে সবুজ পাহাড়সারি, অন্য পাশে নীল সাগর আর মাঝখান দিয়ে মেরিন ড্রাইভ সড়কের শেষ প্রান্ত সাবরাং পার্কের জিরো পয়েন্ট দেখতে বেশ আকর্ষণীয়। এমন নিরিবিলি পরিবেশ কক্সবাজারেও নেই। এদিকে (সাবরাং পার্কে) না এলে এমন সৌন্দর্য উপভোগ করা হতো না। 

ঢাকা থেকে আসা শিক্ষার্থী নাফিজুল ইসলাম বলেন, এ রকম আকর্ষণীয় পরিবেশ আর কোথাও দেখিনি। সাগরতীরে সারি সারি রঙিন নৌকা চোখ জুড়ায়। নৌকার মধ্যে আলোকসজ্জাও করা আছে। বেশ দারুণ লাগছে, অনেক আনন্দ উপভোগ করছি। 
সাবরাং পার্কের পাশে দোকান দিয়েছেন স্থানীয় শহীদ উল্লাহ। তিনি বলেন, ‘এক সময় এখানে কোনো মানুষের আনাগোনা ছিল না। শুধু আমার একটা দোকান ছিল। এখন ১০-১৫টির বেশি দোকান হয়েছে। ফলে অনেকের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে। এখন দৈনিক ৩০-৪০ হাজার টাকা বিক্রি হচ্ছে। দিন দিন পর্যটকের ভিড় বাড়ছে।’
সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ছিদ্দিক আহমেদ বলেন, সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক দেশের পর্যটন খাতকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। পাশাপাশি হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে; যার ফলে স্থানীয়দের জীবনমান বদলে যাবে।

কী থাকবে সাবরাং পার্কে 
দেশের সর্বদক্ষিণে সাগরতীরে ৯৬৫ একর জমিতে গড়ে উঠছে দেশের প্রথম বিশেষ পর্যটন অঞ্চল ‘সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক’। ঢাকা থেকে প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার এবং কক্সবাজার শহর থেকে ৮২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই পার্কটি আগ্রহী বিনিয়োগকারীদের কাছে দ্রুতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
বেজা সূত্রে জানা যায়, ইতোমধ্যে ২৩টি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ ৩৭২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। 
পরিকল্পনা অনুযায়ী পার্কে থাকবে বিভিন্ন ক্যাটেগরির তারকামানের হোটেল ও রিসোর্ট, গলফ কোর্স, শপিং সেন্টার, ঐতিহ্য ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, অ্যাম্ফিথিয়েটার, কনভেনশন সেন্টার, অ্যামিউজমেন্ট পার্ক, হাসপাতাল, ফায়ার স্টেশন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র। থাকবে পয়ঃবর্জ্য পরিশোধন প্লান্ট, কঠিন বর্জ্য ও ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্লান্ট, বৈদ্যুতিক সাব-স্টেশন, পানি পরিশোধন ও সংরক্ষণাগার, সোলার প্যানেল ও বায়োগ্যাস প্লান্ট। পর্যটকদের নিরাপদ ও সহজ যাতায়াত নিশ্চিতে গড়ে তোলা হবে বাস ডিপো, ট্রান্সপোর্ট হাব, হেলিপ্যাড ও জেটি স্টেশন। পাশাপাশি সমুদ্রসৈকত ঘেঁষা ঝাউবন, লেক, গ্রিন পার্ক, হাঁটার পথ ও বাইসাইকেল লেন রাখা হয়েছে পর্যটকদের বিনোদন বাড়াতে। 

এদিকে সাবরাং ট্যুরিজম পার্কসংলগ্ন এলাকা থেকে নেটং হিল হয়ে নাফ ট্যুরিজম পার্ক পর্যন্ত সাড়ে ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ কেবল কার স্থাপনের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শেষ হয়েছে বলে বেজা সূত্রে জানা গেছে। তবে ২০২০ সালে টেকনাফ উপজেলায় নাফ ট্যুরিজম পার্ক (এনএএফ) এবং সাবরাং ট্যুরিজম পার্কের যাত্রা শুরু হলেও মিয়ানমারের আপত্তির কারণে নাফ ট্যুরিজম পার্কের কাজ আপাতত বন্ধ রয়েছে। 

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ এহসান উদ্দিন বলেন, সাবরাং পার্ক একটি অসাধারণ পর্যটন অঞ্চল। এটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে দেশি-বিদেশি পর্যটকের কাছে পর্যটনের নতুন দুয়ার উন্মোচন হবে; যার ফলে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনমান পাল্টে যাবে। তবে আপাতত নাফ নদের মাঝে নাফ ট্যুরিজম পার্কের কাজ বন্ধ রয়েছে। 

সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক জোনের পরিচালক আবু লাহেল বলেন, দেশি-বিদেশি পর্যটককে আকৃষ্ট করতেই সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক গড়ে তোলা হচ্ছে। ইতোমধ্যে পার্কের প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ হয়েছে। ভূমি উন্নয়ন ও বাঁধ নির্মাণকাজ চলছে। এ পর্যন্ত দুটি বিদেশিসহ মোট ২৩টি প্রতিষ্ঠানকে ১১৯ একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তারা এখানে থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার আদলে পাঁচতারকা হোটেল, মেরিন অ্যাকুয়ারিয়াম, সি-ক্রুজ সার্ভিস ও বিদেশি পর্যটকদের জন্য বিশেষ সংরক্ষিত অঞ্চল নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে। 

আরও পড়ুন

×