শত কবিতার কবি বাচ্চু আলী
নিজ হাতে গড়া ভাস্কর্যের সামনে বই পড়ায় মগ্ন কবি বাচ্চু আলী - সমকাল
সেলিম সরদার, ঈশ্বরদী (পাবনা)
প্রকাশ: ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১৬:১৭ | আপডেট: ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১৬:২৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। আছে অদম্য অনুপ্রেরণা আর সৃজনশীলতার শক্তি। একে বুকে ধারণ করেই আলোকিত কবি বাচ্চু আলী। দারিদ্র্যের কঠিন বাস্তবতা, অভাবের ক্লান্ত দিন–কিছুই তাঁকে থামাতে পারেনি। বর্ণমালার সঙ্গেও পরিচয় নামমাত্র। তাঁর উচ্চারণে অক্ষর বাঁধেন অন্য কেউ। এভাবেই বাচ্চু হয়ে উঠেছেন শত শত কবিতার কবি। এ সাহিত্য সম্রাটের বেড়ে ওঠার গল্প যেন এক বিস্ময়!
কবি বাচ্চুর অর্জন
ঈশ্বরদীর পাকশী ইউনিয়নের দিয়াড় বাঘইল গ্রামের রেললাইনের ধারে গড়ে তুলেছেন ‘পাকশী বহুমুখী সাহিত্য-সংস্কৃতি পর্ষদ’। তাঁর ছয়টি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত। অপ্রকাশিত আছে আরও দুটি। রচনা করেছেন পাঁচ শতাধিক কবিতা। তাঁর গানের অ্যালবাম জাতীয় গ্রন্থাগারে তালিকাভুক্ত। সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন অরুণিমা সাহিত্য পদক, কিশোর হাট পদক, জেলা প্রশাসকের সম্মাননা পুরস্কারসহ বহু স্বীকৃতি। স্থানীয়ভাবে তাঁকে অনেকেই ‘এ যুগের নজরুল’ বলেও অভিহিত করেন।
‘কবি বাচ্চু’ হয়ে ওঠার গল্প
দিয়াড় বাঘইল গ্রামের হতদরিদ্র আব্দুল হামিদ প্রামাণিকের আট সন্তানের মধ্যে বাচ্চু আলী ষষ্ঠ। পরিবারে নুন আনতে পান্তা ফোরায় অবস্থা। স্কুলে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি। মাটির বুকে আঙুল দিয়ে আঁকিবুঁকির মধ্যেই তাঁর শিল্পীসত্তার জন্ম। সময়ের প্রবাহে তা রূপ নেয় কবিতার ভাষায়। একে একে পাঁচ শতাধিক কবিতা, অসংখ্য গান, ছোটগল্প আর উপন্যাস রচনা করে প্রমাণ করেছেন, শিক্ষাহীনতা নয়, মনই সৃষ্টির সবচেয়ে বড় বিদ্যালয়।
২০১২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ফুটলো প্রথম কলি’। এরপর ধারাবাহিকভাবে লিখেছেন ‘উদাস মন’, ‘ফুল ছড়ানো সুবাস’, গীতিকাব্য ‘মিশ্রগীতি সুর ভুবন’ ‘কষ্টের কুণ্ডু’, ‘মন কদমের ডালে’। তাঁর লেখা গানের অ্যালবাম ‘চাঁদের হাট’ ও ‘শুধু কি মেঘের ভেলা’ জাতীয় গ্রন্থাগারে তালিকাভুক্ত হয়েছে ২০১৬ সালে। ‘মিশ্রগীতি সুর ভুবন’ অ্যালবামটি নিয়ে চ্যানেল আই ও বাংলাভিশন আয়োজন করে প্রকাশনা উৎসব। এসব সৃজনশীল অর্জনের পর স্থানীয় মানুষ তাঁকে ভালোবেসে ডাকতে শুরু করে, ‘কবি বাচ্চু’।
সাহিত্য-সংস্কৃতিতে অবদান
গ্রাম পুলিশ বাচ্চু স্বল্প আয়ের মধ্যেও টাকা জমিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ‘পাকশী বহুমুখী সাহিত্য-সংস্কৃতি পর্ষদ’ এবং ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী, বীরশ্রেষ্ঠ, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি মঞ্চ’। রেললাইনের ধারে গড়ে ওঠা এই ব্যতিক্রমী সাহিত্যাঙ্গন মানুষের আকর্ষণের জায়গা। এখানে শোভা পাচ্ছে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, জসীম উদ্দীনসহ বিপুলসংখ্যক মনীষীর প্রতিকৃতি। রয়েছে শহীদ বুদ্ধিজীবী ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। ভাষা আন্দোলনের ম্যুরাল, শিশু-কিশোরদের জন্য পাঠাগার, মুক্তমঞ্চ।
এই ব্যতিক্রমী সাহিত্যাঙ্গনে নাট্যচর্চা, সাংস্কৃতিক আয়োজন, শিশু ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে বিজয় দিবস উৎসবের আয়োজনও হয়। এই সাংস্কৃতিক অঙ্গন ঈশ্বরদীর মানুষের কাছে এক স্বপ্নবাগান, স্মৃতিময় চেতনার আলোকিত চূড়া। এখানে সাহিত্যচর্চা, বইপড়া, নাটক, সাংস্কৃতিক আয়োজন–সবই হয় নিয়মিত। প্রতি বিজয় দিবসে আয়োজন করা হয় শিশু-প্রবীণ ও মুক্তিযোদ্ধা ভোজ।
ধ্বংসপ্রাপ্ত সৃষ্টিকর্ম পুনর্জাগরণের আশা
২০২৪ সালের ৬ আগস্ট রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে কিছু দুর্বৃত্ত এই সাহিত্যাঙ্গনের ম্যুরাল ও স্থাপনা বিকৃত করে ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। এরপর থেকেই স্থবির হয়ে পড়ে পর্ষদের কর্মযজ্ঞ। তবুও আশা হারাননি কবি বাচ্চু। এখনও প্রতিদিন জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন, নিজ হাতে পরিষ্কার করেন মঞ্চ ও ম্যুরালগুলো। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস–আবার জমবে মেলা, আবার ফিরবে ভাষা সংস্কৃতির উৎসব।
বাচ্চু আলী বলেন, ‘প্রতিদিনই এখানে সব বয়সী মানুষ আসেন। মনীষীদের মুখাবয়ব, ভাস্কর্য আর ম্যুরালগুলো দেখতে দেখতে দর্শনার্থীরা ইতিহাসকে নতুনভাবে চিনে নেন। ধর্মান্ধ কিছু মানুষ আদরে গড়া ভাস্কর্যগুলো নষ্ট করেছে। তবে আমি আশাবাদী। আবারও জমজমাট হবে এই সাহিত্য-সংস্কৃতি পর্ষদ ও স্মৃতিমঞ্চ। নবজাগরণ ঘটবে সাহিত্যের।’
পাকশীর প্রবীণ লেখক ও সংস্কৃতি চর্চাকারী অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম আজাদ বলেন, কবি বাচ্চু আলীর জীবন যেন এক প্রেরণার আলোকশিখা। দারিদ্র্য, অশিক্ষা বা ধর্মান্ধদের বাধা–কিছুই তাঁর সৃজনশক্তিকে থামাতে পারেনি। লেখালেখি আর সাংস্কৃতিক দায়িত্ববোধ বুকে ধারণ করে তিনি আজ হয়ে উঠেছেন ঈশ্বরদীর গর্ব, প্রান্তিক মানুষের অনুপ্রেরণা এবং এক জাগ্রত সৃষ্টিশীল মানুষের প্রতীক।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, সাহিত্যচর্চার এই ব্যতিক্রমী স্থান পাকশী বহুমুখী সাহিত্য-সংস্কৃতি পর্ষদ এবং শহীদ বুদ্ধিজীবী, বীরশ্রেষ্ঠ, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি মঞ্চ। এ মঞ্চের প্রাণ ফেরাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
- বিষয় :
- প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী
- কবিতা
