ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আমিরের উদ্ভাবিত যন্ত্রে সাশ্রয় কোটি টাকা

আমিরের উদ্ভাবিত যন্ত্রে সাশ্রয় কোটি টাকা
×

নিজের নকশায় তৈরি কৃষিযন্ত্রের পাশে উদ্ভাবক আমির হোসেন -সমকাল

  লিমন বাসার, উত্তরাঞ্চল 

প্রকাশ: ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১৬:২১ | আপডেট: ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১৬:৩৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

বগুড়ার কাটনারপাড়ার একটি ছোট্ট ওয়ার্কশপ। চারদিকে লোহা ও যন্ত্রের টুংটাং শব্দ। এখানেই জন্ম নিচ্ছে আধুনিক কৃষিযন্ত্রের দেশীয় রূপকথা। তার নায়ক গ্রামীণ উদ্ভাবক আমির হোসেন। অভিজাত গবেষণাগার নেই; নেই আধুনিক সরঞ্জাম। নিজের নকশায় তৈরি করেছেন ৫০টির বেশি কৃষিযন্ত্র। কৃষকের সমস্যাকে নিজের সমস্যা মনে করে ঠিক করেছেন যন্ত্রের গতি, ব্লেডের উচ্চতা, গিয়ারের অনুপাত। তাঁর এই অবদানে বদলে গেছে উত্তরাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতি। সাশ্রয় হচ্ছে বছরে শতকোটি টাকা।

বাড়ির পাশের গ্যারেজেই ছিল প্রথম স্কুল 
কিশোর বয়সে মোটরসাইকেল আর সেচপাম্প মেরামতের কাজ করতেন আমির হোসেন। তখনই আবিষ্কার করেন বিদেশি যন্ত্র মাঠের মাটি বোঝে না, বোঝে কাগজের নকশা। এই উপলব্ধি তাঁকে পথ দেখায়। মাঠে নষ্ট হওয়া যন্ত্র ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়ে উদ্ভাবনের পথচলা। এখন কাটনারপাড়া ও মাটিডালির দুই ওয়ার্কশপে প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে কৃষির নতুন গল্প।

আমির যন্ত্র বানান মাঠের কথায়, অভিজ্ঞতার খাতায়। ছোট জমি, ভারী কাদা, দুর্বল ইঞ্জিন– এসব বিবেচনায় রেখে তৈরি করেছেন মিনি হার্ভেস্টার, ধান ঝাড়াই মেশিন, আলু ডিগার, মালটিকাল্টিভেটর, রোটারি ঘাসকাটা মেশিন, সিডড্রিল, কর্ন শেলার, রোটাভেটর, চাটাই মেশিন, ড্রাই মিক্সার–এমন ৫০টিরও বেশি উদ্ভাবন।

সোনাতলার আবুল কালাম অভিযোগ করেছিলেন, বিদেশি মিনি হার্ভেস্টারের ব্লেড বেশি উঁচু। কাদামাটিতে কাজ হয় না। তাঁর কথায় আমির ব্লেড নিচু করলেন, চকার গ্রিপ বদলালেন, গিয়ার অনুপাত ঠিক করলেন। কম শক্তির ইঞ্জিনেও মেশিন ছুটতে শুরু করল। গাইবান্ধার মনসুর আলীর নরম ঘাসে জড়িয়ে যাওয়া মেশিনের সমস্যাও এক সপ্তাহের মধ্যে সমাধান করেন। ব্লেডের কোনা বদলে শ্যাফটে শিল্ড যোগ করলেন; গিয়ারবক্সে সাপোর্ট দিলেন। পরিষ্কার হলো যন্ত্র।

তাঁর কর্মী মনির বলেন, যেখানে কৃষকের যন্ত্র আটকে যায়, সেখানেই আমির ভাইয়ের উদ্ভাবন। তাঁর যন্ত্র সস্তা এবং দ্রুত মেরামত করা যায়। কম জ্বালানিতে কৃষক খরচ নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকেন।
কৃষি বিভাগের মাঠ কর্মকর্তা আমিরুল ইসলাম বলেন, আমিরের যন্ত্র বদলে দিচ্ছে মাঠের হিসাব; বাঁচাচ্ছে কৃষকের খরচ।

আমিরের কৃষিযন্ত্র অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্য। বিদেশি মিনি হার্ভেস্টারের দাম আড়াই-তিন লাখ টাকা হলেও তাঁর তৈরি হার্ভেস্টার পাওয়া যায় মাত্র ৬০-৭০ হাজার টাকায়। দেড় লাখ টাকার বিদেশি আলু ডিগার তিনি বানাচ্ছেন ৩৫-৪০ হাজার টাকায়। বিদেশি মালটিকাল্টিভেটরের দাম প্রায় ১ লাখ টাকা; দেশি সংস্করণ ৩০-৩৫ হাজার। ধান ঝাড়াই মেশিনেও একই চিত্র। বিদেশি ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ, দেশি ২০-২৫ হাজার টাকা। গত ১০ বছরে উত্তরাঞ্চলে তাঁর তৈরি ২০ হাজারের বেশি যন্ত্র ব্যবহার হয়েছে। প্রতিটি যন্ত্রে গড়ে ২০-৩০ হাজার টাকা সাশ্রয় ধরা হলে কৃষকের মোট সাশ্রয় দাঁড়ায় ৬০ কোটি টাকার বেশি। স্থানীয়ভাবে স্পেয়ার পার্টস তৈরি হওয়ায় বছরে আরও ৩০-৪০ কোটি টাকার আমদানি ব্যয় কমছে।

গাইবান্ধার কৃষক আবদুল লতিফ জানালেন, বিদেশি মালটিকাল্টিভেটরের দাম এক লাখ টাকার ওপরে। কিনতে গেলে ঋণ নিতে হতো। নিজের জমানো ৩০ হাজার টাকায় আমিরের মেশিন কিনেছেন। নষ্ট হলে পাশের বাজারেই সারিয়ে নেন। এটিই তাদের আসল লাভ।

কৃষি বিভাগের মাঠকর্মীরা বলছেন, এই যন্ত্রগুলোর বড় সুবিধা হলো গ্রামের বাস্তব পরিবেশে খাপ খায়। বিদেশি যন্ত্রগুলো সমতল জমি বা নির্দিষ্ট মাটির ধরনে ভালো কাজ করলেও উত্তরাঞ্চলের কাদামাটি, অসমান জমি আর ছোট খামারের ক্ষেত্রফলে তা অনেক সময় ব্যর্থ হয়। দেশীয়ভাবে বানানো যন্ত্রে এসব জায়গায় কাস্টমাইজ করা সম্ভব হওয়ায় গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে। 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বগুড়ার কর্মকর্তা আবু সাইদ বলেন, দেশীয় বানানো যন্ত্র না থাকলে বিপুল সংখ্যায় আমদানি করতে হতো। এসবের দামও প্রান্তিক কৃষকের নাগালের বাইরে। 

আমির হোসেনের স্বীকৃতি কম নয়। ২০০৮ ও ২০১১ সালে জাতীয় পুরস্কার ও স্থানীয় প্রশাসনের অসংখ্য সম্মাননা পেয়েছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর তাঁর যন্ত্র মাঠে পরীক্ষা করেও বলেছে, কর্মক্ষমতা অত্যন্ত ভালো। তবুও তাঁর পথ বন্ধুর। কারণ ছোট ওয়ার্কশপ, হাতে বানানো যন্ত্রাংশ, সীমিত শ্রমিক। উৎপাদন ক্ষমতা মাসে মাত্র ৮-১০টি যন্ত্র। বহু নকশা পেটেন্ট হয়নি। শিল্পায়নের ক্ষেত্রে এটিও বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। তাই চাহিদা আকাশ ছুঁলেও উৎপাদন বাড়ে না। 

আমির হোসেন বলেন, ‘আমি যা বানাই, কৃষক ব্যবহার করে। এটিই সবচেয়ে বড় পাওয়া। কিন্তু বড়ভাবে করতে পারলে যন্ত্রের দাম অর্ধেকে নামত। দেশের সাশ্রয় হতো আরও বহু কোটি টাকা। সরকারি সহযোগিতা ছাড়া সেটি সম্ভব নয়।’ 
 

আরও পড়ুন

×