ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

জিআই স্বীকৃতির আশায় খয়েরশিল্প

জিআই স্বীকৃতির আশায় খয়েরশিল্প
×

ভাটায় মাটির পাতিলে খয়ের গাছের টুকরো জ্বাল দিয়ে নির্যাস সংগ্রহ করা হচ্ছে। রাজশাহীর চারঘাটের চন্দনশহর এলাকায় - সমকাল

 সনি আজাদ, চারঘাট (রাজশাহী)

প্রকাশ: ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১৬:২৩ | আপডেট: ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১৬:৫৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

চারঘাটের ‘খয়ের’ ছিল এক অনন্য নাম। ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও শিল্প মিলেমিশে গড়ে উঠেছিল এর নিজস্ব সাম্রাজ্য। কাঁচামাল সংকট ও কৃত্রিম খয়েরের দাপটে অস্তিত্ব সংকটে পড়ে শিল্পটি। বনায়ন আর অদম্য চেষ্টায় শত বছরের এ শিল্প খুঁজে পেয়েছে এক অনন্ত সম্ভাবনার পথ। চারঘাটের খয়ের এখন জিআই স্বীকৃতির পথে।

খয়েরশিল্পের ইতিহাস
শত বছর আগে চারঘাটে খয়েরশিল্পের যাত্রা শুরু। শলুয়া, নিমপাড়া, ভায়ালক্ষ্মীপুর, চন্দনশহর, গোপালপুর, বাবুপাড়া ও থানাপাড়া– সব গ্রাম যেন এ শিল্পের নীরব সাক্ষী। প্রতিটি বাড়ির চুলায় ধোঁয়া উঠত খয়েরের। নদীর তীরঘেঁষে সারি সারি ভাটা, কাঠবাহী নৌকার খইস আর কারিগরদের শ্রম-ঘাম মিলিয়ে খয়ের ছিল এখানকার মানুষের জীবনের অংশ। পঞ্চাশের দশকে ভারত ও পাকিস্তান থেকে আসা বিহারি কারিগররা এ অঞ্চলে এনেছিলেন নতুন প্রযুক্তি, আরও নিখুঁত হাতের ছোঁয়া। লাহোর, করাচি থেকে কলকাতা–সবখানে পৌঁছে যেত চারঘাটের খয়েরের সুবাস।

চন্দনশহর গ্রামের ৮০ বছরের আবদুল কাদেরের কণ্ঠে আজও শোনা যায় সেই সময়ের গল্প। তিনি বলেন, ষাট-সত্তর-আশি–কী ব্যস্ত সময়ই না ছিল! খয়ের ছিল আমাদের জীবিকার চাবিকাঠি। কিন্তু দিন বদলাল। বন কমলো, গাছ হারাল, কারখানায় আগুনের আঁচ প্রায় নিভে গেল।

খয়েরের বহুমুখী ব্যবহার 
পানের খিলিতে রাখা ছোট লালচে টুকরো দেখে অনেকেই ভাবেন, খয়ের যেন শুধু স্বাদের সঙ্গী। কিন্তু এর ব্যবহারের পরিধি এ ধারণাকে ছাড়িয়ে গেছে। খয়েরের ট্যানিন থেকে তৈরি হয় প্রাকৃতিক গাঢ় বাদামি রং, যা টেকসই এবং পরিবেশবান্ধব। গ্যাস্ট্রিক, আলসার, সংক্রমণ ও দাঁতের সমস্যায় ব্যবহার হয় এর নির্যাস। ফেসমাস্ক, স্ক্রাব, স্কিন টোনারসহ প্রাকৃতিক কসমেটিকসের অন্যতম উপাদান ট্যানিনসমৃদ্ধ খয়ের পাউডার। চামড়া ট্যানিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালও খয়ের। এ ছাড়া গাছটি মাটির জৈব উপাদান বাড়ায়; আইলে রোপণ করলে মাটির ক্ষয় রোধ হয়। ফলে খয়ের ক্রমে হয়ে উঠছে পরিবেশবান্ধব শিল্পের অপরিহার্য উপাদান। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানি বিভাগের অধ্যাপক ড. এ এইচ এম মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে কথা বলে খয়েরের বহুমুখী গুণের কথা জানা যায়। তাঁর কাছে খয়ের কেবল একটি পণ্যের নাম নয়; এটি মাটির ঘ্রাণ, ঐতিহ্যের স্পর্শ। 

কেন সংকটে পড়েছিল খয়েরশিল্প?
একেকটি মাঝারি কারখানায় দৈনিক খয়ের গাছের প্রয়োজন হতো ৮ থেকে ১০ টন। বন উজাড়, কৃষিজমির সম্প্রসারণ এবং নির্বিচারে গাছ কাটার ফলে এর কাঁচামাল কমে আসে ব্যাপকভাবে। এ সুযোগে ভারত, মিয়ানমার ও ইন্দোনেশিয়া থেকে নিম্নমানের কৃত্রিম খয়ের বাজার দখল করতে থাকে। দাম কম, শুল্কসুবিধা না থাকায় স্থানীয় এ শিল্প ধ্বংসের মুখে পড়ে। একসময় ১১৩টি কারখানার ধোঁয়া উঠলেও ২০০০ সালের পর তা নেমে আসে মাত্র ছয়টিতে।

খয়ের ব্যবসায়ী মাইনুল হক বলেন, ইন্দোনেশিয়া, ভারত কিংবা মিয়ানমারে কৃত্রিমভাবে খয়ের তৈরি করা হয়। এ কারণে এর দাম কম। 

থমকে যাওয়া শিল্পে প্রাণ 
গাছের অভাব যখন শিল্পকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছিল, তখন ২০১৪ সাল থেকে শুরু হলো এক সবুজ বিপ্লব। কৃষি বিভাগ, বন বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসন হাতে নিল বড় উদ্যোগ। কৃষি বিভাগ ২২ হাজার ২০০টি, বন বিভাগ ৩৫ হাজার ৫৫০টি ও উপজেলা প্রশাসন বিভিন্ন স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসায় ৪০ হাজার খয়ের গাছ রোপণ করে। পাঁচ-দশ বছরের মধ্যে চারা পরিণত হয় গাছে। বন কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমানের ভাষ্য, গাছ রোপণ অব্যাহত থাকলে কয়েক বছরের মধ্যেই কাঁচামালের সংকট কেটে যাবে; ফিরে আসবে খয়েরের সুদিন। 

এখন চারঘাটে আবার জমে উঠেছে খয়েরের হাট। কুড়ালের টুংটাং শব্দ, গাছ কাটা, বড় ভাটায় জ্বাল দেওয়া, ঘন করা নির্যাসের লালচে ধোঁয়া–সবকিছু যেন পুরোনো দিনের ফিরে আসা। একসময় বন্ধ হয়ে যাওয়া অনেক ভাটা আবার আগুনে দাউ দাউ করছে।

বছর পাঁচেক আগে ছয়টি কারখানা থাকলেও বর্তমানে চারঘাটে ১২টি কারখানা খয়ের উৎপাদন করছে। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে সপ্তাহে সাত দিনই বসে গাছ বিক্রির হাট। ব্যাপারীরা দূরদূরান্ত থেকে আসেন গাছ সংগ্রহ করতে। দাম-দর করে নিয়ে যান। নব্বইয়ের দশকে সপ্তাহে অন্তত ১০ টন খয়ের বেচাকেনা হতো। ২০১০ সালের পর উৎপাদন কমে যায়। কাঁচামালের পর্যাপ্ততায় বর্তমানে মাসে অন্তত দুই টন খয়ের বেচাকেনা হচ্ছে। এক মণ লালি খয়ের ৩২-৩৫ হাজার ও গুটি খয়েরের ৪৫-৪৭ হাজার টাকায় বিক্রি হয়।

ব্যবসায়ী আকবর হোসেন বলেন, বছর তিনেক আগেও চারঘাটে খয়ের তৈরির উপযোগী গাছ চোখে পড়ত না। নওগাঁ, নাটোর ও পাবনা থেকে সংগ্রহ করতে হতো। এখন পরিমাণে কম হলেও চারঘাটে পাওয়া যাচ্ছে। কয়েক বছরের মধ্যে কাঁচামাল সংকট থাকবে না বলে মনে হচ্ছে। 

খয়ের সমিতির সদস্য এনামুল হক বলেন, কাঁচামালের সংকট অনেকটা দূর হয়েছে। কারখানাগুলোতে মাসে তিন-চার লাখ টাকার খয়ের বিক্রি হচ্ছে। সরকারিভাবে আরও গাছ লাগানোর পাশাপাশি সহজ শর্তে ঋণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও বিদেশের কৃত্রিম খয়েরের ওপরে শুল্ক আরোপ করা গেলে সুদিন ফিরবে। 
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আল মামুন হাসান জানান, এ বছর পাঁচ হাজার খয়ের গাছ জমির আইল ও বাড়ির আঙিনায় রোপণ করা হয়েছে। 

এবার জিআই স্বীকৃতির অপেক্ষা
খয়ের ঘিরে ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে জিআই–জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন (ভৌগোলিক নির্দেশক) স্বীকৃতির স্বপ্ন। চারঘাটের খয়ের যদি পায় নিজস্ব পরিচয়ের সনদ, তবে আন্তর্জাতিক বাজারেও মাথা তুলে দাঁড়াবে। পাবে নতুন দাম, নতুন মান, নতুন সম্ভাবনা। এ লক্ষ্য সামনে রেখে গত বছর শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা পেটেন্ট, ডিজাইন এবং ট্রেড মার্কস অধিদপ্তরে (ডিপিডিটি) জিআই স্বীকৃতির জন্য আবেদন করা হয়। সেখান থেকে উত্তর না আসায় শর্তগুলো আবারও যাচাই-বাছাই করে আবেদন প্রক্রিয়া চলমান।
ৎইউএনও (ভারপ্রাপ্ত) মো. রাহাতুল করিম মিজান বলেন, বিশেষ গুণসম্পন্ন পণ্যটি রাজশাহীর ভৌগোলিক উৎপত্তিস্থলের সঙ্গে জড়িত। এর জিআই স্বীকৃতির সম্ভাবনা রয়েছে। 

আরও পড়ুন

×