ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সাজ্জাদ শেখের নতুন নির্মাণ-দর্শন

সাজ্জাদ শেখের নতুন নির্মাণ-দর্শন
×

নিজের পরিবেশবান্ধব ব্লক কারখানায় সাজ্জাদ শেখ সমকাল

সৌরভ হাবিব, রাজশাহী

প্রকাশ: ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৮:২৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

যখন চারদিকে চলছে অবাধে বৃক্ষনিধন, ইটভাটার কালো ধোঁয়ায় ভারী আকাশ–ঠিক সেই সময়েই সবুজের দূত হয়ে আবির্ভূত হলেন উদ্যোক্তা সাজ্জাদ শেখ। মাটির পরিবর্তে পাথরকুচি, বালু আর প্রযুক্তিকে সঙ্গী করে গড়ে তুললেন পরিবেশবান্ধব কংক্রিট ব্লকের কারখানা; যেখানে নেই আগুন-ধোঁয়া, মাটির ক্ষয়–আছে কেবল টেকসই ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি।

রাজশাহীর আলুপট্টির প্রয়াত শেখ সোবরাতীর ছেলে সাজ্জাদ শেখ। সাত ভাইবোনের মধ্যে তিনি পঞ্চম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ শেষ করলেও চাকরি কখনও টানেনি তাঁকে। ছোটবেলা থেকেই চেয়েছেন উদ্যোক্তা হতে। শিক্ষাজীবনেই আলুপট্টি মোড়ে ফোন, ফ্যাক্স, ফটোকপির দোকান দেন। পড়াশোনা শেষে শুরু করেন ঠিকাদারি ব্যবসা। কাজে নেমে দেখলেন প্রতিটি নির্মাণকাজই নির্ভরশীল মাটির পোড়ানো ইটের ওপর, যার পরিণামে নষ্ট হচ্ছে কৃষিজমির উর্বর টপ সয়েল, উজাড় হচ্ছে বন, দূষিত হচ্ছে বাতাস। এই দুঃসহ বাস্তবতা থেকে জন্ম নেয় তাঁর নতুন চিন্তা, যা ইটের বিকল্প, কিন্তু পরিবেশের বন্ধু।
২০১৮ সালে সরকার যখন কংক্রিট ব্লক ব্যবহারে গেজেট প্রকাশ করে, তিনি সুযোগটি লুফে নেন। ১১০ শতক জমি লিজ নিয়ে স্থাপন করেন ‘এসএফটি হলো ব্রিকস’–রাজশাহী বিভাগের প্রথম বাণিজ্যিক ব্লক ইট কারখানা। প্রথমে চীন থেকে মেশিন আনেন। পরে জার্মানির আধুনিক স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার। ধাপে ধাপে সাজ্জাদের কারখানা রূপ নেয় সবুজ প্রযুক্তি নির্ভরতায়; যেখানে এক টুকরো মাটিও লাগে না, শুকাতে দরকার হয় না আগুনের তাপ; হাইড্রোলিক চাপে স্বয়ংক্রিয় মেশিন গড়িয়ে বের হয় শক্ত, টেকসই, পরিবেশবান্ধব ব্লক। এভাবে প্রতিদিন তৈরি হয় প্রায় ৪০ হাজার ব্লক ইট। ৭০ শ্রমিকের জীবন চলে এই সবুজ উদ্যোগের ওপর ভর করে। 

প্রতিটি ব্লক তৈরির পর ১৪ দিন পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়, আরও ১৪ দিন রোদে শুকানো হয়– এভাবেই প্রকৃতির ছোঁয়ায় সাজ্জাদের কারখানায় তৈরি হয় ৩২ ধরনের ব্লক আর ২২ ধরনের টাইলস। কারখানার নিজস্ব পরিবহনেই ব্লক পৌঁছে যায় ক্রেতার কাছে; যা বহুতল ভবন, ফুটপাত, সরকারি রাস্তা, ড্রেনেজ–এমনকি ধর্মীয় স্থাপনার সৌন্দর্যেও ব্যবহার হচ্ছে।

সাজ্জাদ শেখ শুধু উদ্যোক্তা নন, তিনি পরিবেশের এক সচেতন যোদ্ধা। বছরের পর বছর দপ্তর থেকে দপ্তরে ঘুরে মানুষকে বুঝিয়েছেন–ব্লক ইট শুধু পরিবেশবান্ধবই নয়, খরচেও কম এবং টেকসই। তবুও পথটা মসৃণ ছিল না। সরকার ২০২৫ সালের মধ্যে মাটির ইট বন্ধের ঘোষণা দিলেও এখনও অনেক দপ্তর প্রচলিত পোড়ানো ইটেই অভ্যস্ত। ইটভাটা মালিকদের সিন্ডিকেট, কিছু কর্মকর্তার অনীহা–সব মিলিয়েই পরিবেশবান্ধব ইটের পথে প্রতিবন্ধকতা রয়েই গেছে। 
এরপরও থেমে নেই সাজ্জাদ শেখের পথচলা। তিনি বিশ্বাস করেন, নির্মল বাতাসের বাংলাদেশ গড়তে ব্লক ইটই ভবিষ্যতের ভরসা। তাঁর উদ্যোগ দেখে রাজশাহীতে আরও চারটি পরিবেশবান্ধব ব্লক কারখানা গড়ে উঠেছে। তিনি হয়ে উঠেছেন এক সবুজ আন্দোলনের দূত। ধোঁয়াহীন, মাটিহীন, গাছপালা রক্ষা করা এই ব্লক ইট এখন শুধু একটি পণ্য নয়–এটি এক নতুন নির্মাণ-দর্শন, একটি টেকসই বাংলাদেশ গড়ার পথরেখা।

সাজ্জাদ শেখ বলেন, সরকার পোড়ানো ইট বন্ধের ঘোষণা দিলেও অনেক দপ্তর তা মানছে না। ইটভাটা মালিকদের সিন্ডিকেটের কারণেও দরপত্রে কংক্রিট ব্লককে বাদ দেওয়ার চেষ্টা চলে। কারণ, ব্লকে দুর্নীতির সুযোগ কম, নিম্নমান ব্যবহার করা যায় না। অথচ পরিবেশ রক্ষায় ব্লক ইটের কোনো বিকল্প নেই। নির্মল বাতাসের বাংলাদেশ চাইলে এর ব্যবহার বাড়াতেই হবে। 
পরিবেশ অধিদপ্তরের বিভাগীয় পরিচালক নিলুফা ইয়াছমিন বলেন, লাইসেন্সবিহীন ইটভাটা বন্ধে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সভা হয়েছে। মালিকদের চিঠি দেওয়া হয়েছে। শিগগিরই যৌথ অভিযান চালিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সবুর আলী বলেন, বিষয়টি নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের গত সভায় আলোচনা হয়েছে। অধিদপ্তর এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে, প্রশাসন সহযোগিতা করবে। 

 

আরও পড়ুন

×