ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

একটি বিজ্ঞাপন বদলে দিল রশিদের ভাগ্য

একটি বিজ্ঞাপন বদলে দিল রশিদের ভাগ্য
×

পুকুর থেকে জাল টেনে তোলা হচ্ছে বিক্রির জন্য প্রস্তুত রেণুপোনা সমকাল

জালাল উদ্দিন, সাঁথিয়া (পাবনা)

প্রকাশ: ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৮:৩০

| প্রিন্ট সংস্করণ

পাবনার বেড়া উপজেলার হাটুরিয়া-নাকালিয়া ইউনিয়নের জগন্নাথপুর পূর্বপাড়ার বাসিন্দা আব্দুর রশিদ। একসময় দারিদ্র্য আর সংগ্রামের দিনলিপি বোনা ছিল তাঁর জীবনে। বিয়ের এক বছরের মাথায় সন্তান এলেও সংসারে দুধ কেনার মতো টাকাও ছিল না। আশ্রয় বলতে ছিল কেবল একটি ছাপড়া টিনের ঘর। প্রায় বিশ বছর আগে এমনই অভাব-অনটনে কাটত প্রতিটি দিন। কখনও অন্যের জমিতে বর্গা নিয়ে কৃষিকাজ, আবার কখনও ফেরি করে মাছ বা ভাঙারি বিক্রি–এভাবেই চলত জীবনযুদ্ধ।

এক বিজ্ঞাপনে জীবনের মোড় ঘোরা
ছোট একটি রেডিও ছিল তাঁর। তাতে মাঝেমধ্যে মাছ চাষের খবর শুনতেন আব্দুর রশিদ। পঞ্চম শ্রেণির বেশি পড়াশোনা হয়নি, বাবার সম্পদও ছিল না বললেই চলে। সে কারণে চাকরির সুযোগ ছিল না; কিন্তু স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরার শক্তিটুকু তাঁর হারায়নি কখনও। একদিন এলাকায় হাটুরিয়া দুগ্ধ সমিতিতে বসেছিলেন। এমন সময় টেলিভিশনে দেখা গেল একটি বিজ্ঞাপন–রেণু পোনা চাষের আহ্বান। বিজ্ঞাপনটি যেন তাঁর জীবনে আলোর প্রথম ঝলক। মনে জন্ম নিল নতুন স্বপ্নের বীজ। সঙ্গে সঙ্গে যোগাযোগ করলেন বিজ্ঞাপনে দেওয়া ঠিকানা অনুযায়ী। এরপর আর থেমে থাকতে হয়নি রশিদকে।
আব্দুর রশিদ জানান, ২০০৭ সালে গরু বিক্রি আর ধারদেনা করে মাত্র ৭ হাজার টাকা হাতে নিয়ে শুরু করলেন রেণুপোনা উৎপাদন। প্রথমে ৮ শতক জমির একটি ছোট পুকুর লিজ নেন দেড় হাজার টাকায়। সেই পুকুরেই ডিমপোনা ছাড়লেন। মাত্র পাঁচ মাসে ২০ হাজার টাকা লাভ! এই ছোট লাভই তাঁর আত্মবিশ্বাসের বড় ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।

ছোট পুকুর থেকে বিশাল খামার
ছোট পুকুর থেকে সফলতার সিঁড়িতে ধাপে ধাপে এগিয়ে যেতে থাকল রশিদ। প্রথম বছরের লাভেই নিলেন আরও তিনটি পুকুর। পোনা চাষ বাড়তে থাকল। অর্ধবছরে লাভ হলো ৫৫ হাজার টাকা। পিপিডি (প্রোগ্রামস ফর পিপলস ডেভেলপমেন্ট)-এর দিকনির্দেশনা ও প্রশিক্ষণ তাঁর পথকে আরও মজবুত করে। দুই চোখ ভরে উঠল নতুন স্বপ্নে। মাছের পোনা তাঁর ভাগ্য বদলাতে শুরু করল। আজ তাঁর নিজস্ব তিনটি পুকুর, লিজ নেওয়া আরও ২২টি–মোট ২৫টি পুকুরে পোনা চাষ হয়। বছরে পাঁচ-সাত ধাপে ছাড়েন ৪০০ থেকে ৪৫০ কেজি ডিমপোনা। এক মাসেই পোনা বড় হয় বিক্রির মতো।
পাবনা-সিরাজগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকার খামারিরা সারা বছর তাঁর কাছ থেকে পোনা কিনে নেন। এক বছরে তাঁর পোনা বিক্রি হয় ৫০ লাখ টাকা। সব খরচ বাদ দিয়ে লাভ থাকে ২৫ লাখ টাকার মতো। এ লাভের টাকায় প্রতি বছর জমি কিনতে কিনতে তাঁর মোট সম্পদ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ কোটি টাকা। নিজের পরিশ্রমে গড়েছেন টিনশেড পাকাঘর, দাঁড় করিয়েছেন সচ্ছল সংসার। সুখের হাসি ফুটেছে পরিবারের মুখে। 

ছেলে নাজমুল ও সেলিম বলেন, ‘আগে আমাদের অবস্থা খুবই কষ্টের ছিল। এখন বাবার সঙ্গে আমরা সবাই খামারের কাজে থাকি। পোনা চাষই আমাদের ভাগ্য বদলে দিয়েছে। বাবার কাজ দেখে পড়শিরাও গর্ব করেন। তাঁকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে অনেকেই নেমেছেন পোনা চাষে।’
আব্দুর রশিদকে দেখে অনুপ্রাণিত হন চাকলা গ্রামের ফিরোজ হোসেন। ৫টি পুকুর থেকে খরচ বাদে বছরে ১০ লাখ টাকা আয় হয় তাঁর। জগন্নাথপুর গ্রামের বাবু সরকারের ৩টি পুকুর আছে। খরচ বাদে তিনিও বছরে প্রায় ৫ লাখ টাকা আয় করেন। 

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন বলেন, আব্দুর রশিদ মৎস্য অধিদপ্তর থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তিনি জাতীয় মৎস্য সপ্তাহে পদকও পেয়েছেন। তাঁর সফলতায় অনুপ্রাণিত হয়ে অনেকেই এ পেশায় স্বাবলম্বী হয়েছেন।
পিপিডি বেড়া শাখার মৎস্য কর্মকর্তা সেকেন্দার আলী বলেন, একটি ক্ষুদ্র পুকুর দিয়ে শুরু করেছিলেন যে মানুষ, আজ তিনি ২৫টি পুকুরের মালিক। তাঁর সাফল্য অন্যদেরও পথ দেখাচ্ছে। অভাব থেকে উঠে দাঁড়ানো এই মানুষটির গল্প কেবল ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটি অধ্যবসায়, স্বপ্ন আর শ্রমের এক অনন্য কাব্য।

আব্দুর রশিদ বলেন, ‘খালি হাতে শুরু করেছিলাম। আল্লাহ আমার পরিশ্রমকে বৃথা যেতে দেননি। এখন অনেকেই পরামর্শ নিতে আমার কাছে আসেন। কাজ শিখে স্বাবলম্বী হচ্ছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘আজকের সফলতার পেছনে আছে অনেক কষ্ট, অনেক ঘাম, অনেক আশা; যা পথ দেখিয়েছে আমাকে।’ 

 

আরও পড়ুন

×