ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আন্তর্জাতিক নৃত্য দিবস

নৃত্যের তালে ঐক্যের ডাক

নৃত্যের তালে ঐক্যের ডাক
×

বিশ্ব নৃত্য দিবস উপলক্ষে শিল্পীদের পরিবেশনা। গতকাল শিল্পকলা একাডেমিতে সমকাল

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:২৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

সংস্কৃতির গভীরতম প্রকাশগুলোর একটি নৃত্য। যেখানে ভাষার সীমা ভেঙে দেহের ভঙ্গিমায় ফুটে ওঠে মানুষের আনন্দ-বেদনা, সংগ্রাম ও স্বপ্ন। সেই চিরন্তন শিল্পমাধ্যম ঘিরেই আন্তর্জাতিক নৃত্য দিবস উপলক্ষে সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে শুরু হয়েছে দুই দিনব্যাপী এক বর্ণিল আয়োজন, যা শুধু নৃত্যশিল্পীদের মিলনমেলাই নয়, বরং সাংস্কৃতিক ঐক্যের এক প্রাণবন্ত উদযাপন।

একাডেমি প্রাঙ্গণে জমকালো শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে প্রথম দিনের আয়োজন শুরু হয়। ঢাক-ঢোলের তালে, রঙিন পোশাকে সজ্জিত প্রবীণ ও নবীন নৃত্যশিল্পীদের অংশগ্রহণে এ শোভাযাত্রা যেন নগরজীবনে অন্যরকম প্রাণের সঞ্চার করে। এরপর জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। সভাপতিত্ব করেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলা। মুখ্য আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন একুশে পদকপ্রাপ্ত নৃত্য গবেষক ও নৃত্য পরিচালক আমানুল হক।

স্বাগত বক্তব্যে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক রেজাউদ্দিন স্টালিন নৃত্যের ঐতিহাসিক ও মানবিক তাৎপর্য তুলে ধরে বলেন, মানব সভ্যতার প্রারম্ভ থেকেই নৃত্য ছিল মানুষের সাহস ও অভয়ের প্রতীক। তিনি বলেন, বর্তমান সাংস্কৃতিক নীতির আলোকে সাধারণ মানুষের কাছে সংস্কৃতিকে পৌঁছে দিতে একাডেমি নিরলসভাবে কাজ করছে।

মুখ্য আলোচনায় আমানুল হক আন্তর্জাতিক নৃত্য দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশে দিবসটি বড় পরিসরে উদযাপিত না হলেও এ আয়োজন ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তুলেছে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. জাহেদ উর রহমান জোর দেন স্বকীয় সংস্কৃতিচর্চার ওপর। তিনি বলেন, অন্যের প্রভাবে নয়, নিজস্ব ঐতিহ্য লালন করেই এগিয়ে যেতে হবে। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর সাংস্কৃতিক চর্চায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কথাও তিনি তুলে ধরেন।

সভাপতির বক্তব্যে কানিজ মওলা অভিভাবকদের উদ্দেশে বলেন, সন্তানদের শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে অন্তত একটি পারফর্মিং আর্টে যুক্ত করতে হবে। তিনি মনে করেন, সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া সাংস্কৃতিক অগ্রগতি সম্ভব নয়।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর শুরু হয় মনোমুগ্ধকর নৃত্য পরিবেশনা। সমবেত নৃত্য ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর’ দিয়ে সূচনা হয় মূল আয়োজনের। এরপর একে একে বিভিন্ন নৃত্য দল পরিবেশন করে দেশীয়, শাস্ত্রীয় ও সমসাময়িক ধারার নৃত্য। ‘একি অপরূপ রূপে মা তোমায়’, ‘মোরা ঝঞ্ঝার মতো’, ‘মাস্তকালান্দার’, ‘তোমায় আমি পাইতে পারি’– প্রতিটি পরিবেশনাই দর্শকদের মুগ্ধ করে। 
পাশাপাশি সমসাময়িক নৃত্য ‘চেইজিং ড্রিসম’ এবং ‘মেলবন্ধন’ ছিল ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচনকারী। লোকজ ঐতিহ্য, শাস্ত্রীয় কৌশল এবং আধুনিক অভিব্যক্তির এক অনন্য সমন্বয় দেখা যায় ‘জাপানি ও রাশিয়ান লোকনৃত্য’, ‘বিজু উৎসবের নৃত্য’ ও ‘কত্থক-তারানা’ পরিবেশনায়। 

অনুষ্ঠানের শেষভাগে ‘নদী ভরা ঢেউ’, ‘এসো শ্যামল সুন্দর’ এবং ‘মেঘের পালক’– এই সমবেত নৃত্যগুলো যেন পুরো আয়োজনকে এক আবেগঘন সমাপ্তির দিকে নিয়ে যায়। নৃত্যানুষ্ঠান উপভোগ করেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম এমপি।
আজ উৎসবের দ্বিতীয় ও শেষ দিনে বিকেল থেকে শুরু হবে আয়োজন। এতে অংশ নেবে আরও ২৩টি নৃত্যদল। প্রধান অতিথি থাকবেন সংস্কৃতি-বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। এ আয়োজন সবার জন্য উন্মুক্ত।

নৃত্যের একটি বৈশ্বিক উদযাপন এই আন্তর্জাতিক নৃত্য দিবস। ইউনেস্কোর পারফর্মিং আর্টসের প্রধান অংশীদার ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউট (আইটিআই) এ আয়োজনে উৎসাহিত করে। প্রতিবছর ২৯ এপ্রিল সারাবিশ্বে অনুষ্ঠান ও উৎসবে নৃত্য পরিবেশনের মাধ্যমে দিবসটি উদযাপন করা হয়। ইউনেস্কো আনুষ্ঠানিকভাবে আইটিআইকে অনুষ্ঠানের নির্মাতা ও সংগঠক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। নৃত্য বা নাচ মানুষের শরীর ও মনে যে পরিবর্তনের আবহ নিয়ে আসে, সে বিষয়ে আরও সচেতন ও প্রচার করতেই নৃত্য দিবস পালন করা হয়। আইটিআই ও ইন্টারন্যাশনাল ড্যান্স কমিটি ১৯৮২ সালে প্রথমবার আন্তর্জাতিক নৃত্য দিবস পালন শুরু করে।

আরও পড়ুন

×