থামেলের দিনরাত্রি
ফাইল ছবি
সুমন্ত গুপ্ত
প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৪ | ২৩:২৭
ঘড়ির কাঁটায় বাংলাদেশ সময় দুপুর ১টা বেজে ১৫ মিনিট। নেপাল সময় দুপুর ১টা। আমরা আছি নেপালের কাঠমান্ডু ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। সকালে বাংলাদেশ বিমানে চেপে হিমালয়কন্যার কাছে এসেছি নেপাল-বাংলাদেশ ইয়ুথ কনক্লেভের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে।
এয়ারপোর্টে নেপালের ঐতিহ্যবাহী টুপি আর উত্তরীয় দিয়ে আমাদের বরণ করেন অনুষ্ঠানের প্রধান সমন্বয়ক অভিনব দাদা। আমাদের সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে অনেকেই উড়াল দিয়ে এসেছেন এ আয়োজনে অংশ নিতে। একে অন্যের সঙ্গে পরিচিত হলাম। আনুষঙ্গিক সব কাজ শেষ করে ছুটলাম গন্তব্যস্থলে। চলতি পথে আমাদের দেশের মতো রাস্তায় যানজটের দেখা পেলাম। তার পর থামেলে পৌঁছলাম। জায়গাটি পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার বা লক্ষ্মীবাজারের মতোই। তবে অনেক কালারফুল। পর্যটকে ঠাসা। ছোট ছোট দোকানঘর। হরেক রকম পসরা সাজানো। একদৃষ্টিতে গাড়ির বাইরে তাকিয়ে অনুভব করছিলাম, থামেল শহরের স্পন্দন। বেশির ভাগ হস্তশিল্পের জিনিস। পিতল, তামা, পাথর, মাটি, শোলা, কাঠসহ বিভিন্ন সহজলভ্য উপাদানে তৈরি সব পণ্য। হাতের নিখুঁত কারুকাজ, রঙের ছটা, তুলির আঁচড়, ঢালাইয়ের পেটা কাজ– বিভিন্নভাবে শিল্প সৃষ্টি হয়েছে। অভিনব দাদা ঘোষণা দিলেন– আমরা হোটেলের কাছে চলে এসেছি। এখন গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে যেতে হবে সামান্য একটু পথ।
আমরা অস্থায়ী ডেরায় প্রবেশ করলাম। বেশ ছিমছাম, গোছানো। দ্রুত রিফ্রেশ হয়ে বের হয়ে পড়লাম দুপুরের পেট পূজার জন্য। নেপাল সময় তখন বিকেল ৫টা। আমরা চলে এলাম নেপালি এক খাবার হোটেলে। নিলাম নেপালি ভেজ থালি। এক থালাতেই সব অল্প অল্প করে সাজানো। শাক, আলু ভর্তা, ডাল, বরবটি-আলু দিয়ে তরকারি, বাদামের তরকারি, আচার, দই। তার ওপর খাঁটি ঘি দিয়ে গেলেন খাবার পরিবেশনকারী। খাবার যেন নয়, অমৃত খাচ্ছি। নেপালিদের অথেনটিক খাবারের রেস্টুরেন্ট এটি। নেপালিরা ফ্রেশ রান্না করে, বাসি খাবার রাখে না, উচ্ছিষ্ট খায় না একদমই। বেঁচে যাওয়া খাবার ডিশে থেকে গেলে বা হাতের স্পর্শ ছাড়া বেড়ে নেওয়া হলে তাও উচ্ছিষ্ট বলে ধরে নেয়। এজন্য খাবার আসতে সবখানেই সময় লাগে একটু বেশি। এই অবকাশে একদল পরিকল্পনা করল নাগরকোট যাবে, কেউ যাবে আবার চন্দ্রাগিরি হিল। পেট পূজা শেষ করে আমরা বের হয়ে পড়লাম থামেলের পথে-প্রান্তরে। সূর্যদেব তখন অস্তাচলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। পাহাড়ি উপত্যকার শহর। রাত নামে দ্রুত, শহর ঘুমিয়ে পড়ে আগে আগে, তখন জেগে ওঠে অন্যরকম আরেকটি শহর। আমরা হেঁটে এগিয়ে চলছি। থামেলের পথে-প্রান্তরে বিভিন্ন ধরনের দোকানের দেখা পাওয়া যায়। কেউ শীতের কাপড় বিক্রি করছেন, কেউবা পিতলের সামগ্রী, কেউ আবার হিমালয়ে ট্র্যাক করার সমগ্রী আবার কেউ কেউ বিভিন্ন ধরনের চা। পর্যটক আকর্ষণে যা কিছু প্রয়োজন সবই পাবেন এই থামেলে। আমরা একটি দোকানে প্রবেশ করলাম। দোকানটিতে বড় আকৃতির গৃহসজ্জাসামগ্রী বিক্রি হয়, সবই পিতলের। কিছু নিকেল করা। অসাধারণ কারুকাজ। দেখলেই কিনতে মনে চায়। পরের দোকানের দিকে এগোলাম। এবার একটি মেডিটেশন বোল দেখে চোখ আটকে গেল। মেডিটেশন বোলের শব্দ আপনাকে নিয়ে যাবে এক অনন্য ভুবনে। দামাদামি করে কিনে নিলাম।
চলতি পথে দেখা হলো আমাদের সঙ্গে আসা নাফিস ভাইয়ের। তিনি পাশের দোকান থেকে খুরপি কিনছেন। খুরপি হলো এক প্রকার ছুরি, শেরপারা পাহাড়ে ওঠার সময় বাধা হওয়া গাছের ডালপালা ছাঁটতে হাতে রাখেন। বিক্রেতা জানালেন, এটি নেপালের ঐতিহ্যবাহী জিনিস। নেপালের স্মৃতি হিসেবে কিনে ফেললাম। আমরা এক দোকান থেকে আরেক দোকানের দিকে এগিয়ে চলছি। রাতের গভীরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দিনের থামেলের চিত্র পরিবর্তন হতে লাগল। এ এক অন্য থামেল। বিদেশিদের আনাগোনা বাড়ছে। পাব ও নাইটক্লাব খুলে গেছে। ক্লাবগুলোর বাইরে মানুষের ভিড়। থামেল শহরের পুরোনো অংশ। ঘরবাড়ি অধিকাংশই পুরোনো। আমাদের জমিদার বাড়িগুলোর মতো। ভবনগুলোর প্রধান দরজা কাঠের, নকশা করা। মনে হয় একেকটি রাজবাড়ির প্রবেশদ্বার।
হাঁটতে হাঁটতে ছবি বিক্রির দোকানের সামনে গিয়ে আমরা দাঁড়ালাম। বেশির ভাগ ছবিই হিমালয়, হিমালয়ের পাদদেশে জনজীবন, বুদ্ধদেব ও বুদ্ধচক্রের। হিমালয়ে সূর্যোদয়, পাহাড়ে চমরি গাইয়ের দল, পাহাড়ি পরিশ্রমী মানুষের ঋজু চেহারা, তাদের জীবিকার সুকঠিন সংগ্রামের ছবি ...। ছবিগুলোর দাম একটু বেশিই মনে হলো। দাম দিয়ে কিনলেও আপনি ঠকবেন না। কারণ, একটি চিত্রকর্মের সঙ্গে অন্যটির তফাত দৃশ্যমান। আমরা একটি বুদ্ধচক্র কিনলাম। কাপড়ের ওপর অঙ্কিত।
একটু এগিয়ে অ্যারোমার দোকানে ঢুঁ মারলাম। হাতে তৈরি অনেক ধরনের সাবানের দেখা পেলাম। গন্ধও খুব ভালো। তবে দাম একটু বেশি মনে হলো। একটা গোট মিল্কের সাবান কিনলাম। পাশের দোকান থেকে সানন্দা তার বন্ধুদের জন্য হাতির দাঁতের তৈরি চাবির রিং কিনতে লাগল। দামে সস্তা দেখে বেশ কয়েকটি চাবির রিং কিনল সানন্দা। অনেক সময় ধরে পথে পথে আছি, তাই এবার পেটে কিছু দেওয়ার প্রয়োজন। ঢুকে পড়লাম একটি কফিশপে। বাংলাদেশের টাকার চেয়ে নেপালি রুপির বিনিময় মূল্য কিছুটা কম। তাই অনেক কিছু কেনাকাটায় খুব কষ্ট মনে হয় না। নেপালি কফি রেগুলারভাবে তৈরি করা। নেসক্যাফের মতো এত মিহি না, তলানিতেও থেকে যায়, সম্পূর্ণ দ্রবীভূত হয় না। এবার আমরা একটি চায়ের দোকানে প্রবেশ করলাম। দোকানদার আমাদের বিভিন্ন ধরনের চা দেখালেন। লেমন টি, জিঞ্জির টি, গ্রিন টি, ইয়োগি টি, হোয়াইট টি, রেগুলার টি– কী দারুণ ফ্লেভার! আমরা বেশ কয়েক প্যাকেট কিনে নিলাম।
এবার আমরা ঘুরতে ঘুরতে আরেক দিকে চলে এলাম। এখানে পাব, ডান্সবার, নাইটক্লাবের ছড়াছড়ি। সাহেব-
মেমদের আনাগোনা বেশি। জার্মান, সুইডিশ, নরওয়েজিয়ান ভাষাভাষী অনেক বেশি। এলাকাটি অনেক বেশি আলোকোজ্জ্বল, গানের জোর আওয়াজ ভেসে আসে বাইরেও। নেই কোনো বিশৃঙ্খলা। যে যার মতো আনন্দ-ফুর্তিতে মেতে আছে। দারিদ্র্য এবং অবকাঠামোগতভাবে আমাদের চেয়ে পিছিয়ে পড়া একটি দেশ হলেও নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিতে আমাদের চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে তারা। এ শহরে পর্যটকের অভাব নেই। বিশেষ করে থামেলে তো বিদেশিই বেশি। পোশাকও তাদের বিচিত্র। আমি শুধু ভাবছিলাম প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় ক্ষতবিক্ষত একটি দেশ অথচ সেই দেশের রাজধানীতে নারীরা কত স্বাধীন, কর্মচঞ্চল। রাতের গভীরতা বাড়ছে আর প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পাচ্ছে থামেল। পরের দিন নতুন গন্তব্যে যেতে হবে, তাই দেরি না করে আমরা ফিরে গেলাম হোটেলে।
কীভাবে যাবেন
বাংলাদেশ থেকে নেপালে বিমানে যাওয়া যায়। খরচ যাওয়া-আসার টিকিট নিয়ে ১৮ হাজার থেকে ২২ হাজার টাকার মতো পড়বে। আগেভাগে টিকিট কাটতে পারলে ১৭ হাজার টাকার মতো পড়ার কথা। বাই রোডে নেপাল যেতে হলে খরচ কমে যাবে অনেকটা। সে ক্ষেত্রে ভারতের ট্রানজিট ভিসা নিতে হবে, যেখানে পোর্টের নাম দিতে হবে চ্যাংরাবান্ধা বা রানীগঞ্জ। এখানে বা বিমানে কোনোটাতেই নেপালের ইমিগ্রেশনে কোনো ভিসা ফির দরকার নেই, যদি না আপনি একই বছরে দু’বার ভ্রমণ করতে চান।
কোথায় থাকবেন
পুরো থামেলের গলি ঘুপচিতে অসংখ্য হোটেল বা ব্যাকপ্যাকার হোস্টেল রয়েছে। ১ হাজার থেকে ১৮০০ রুপির মধ্যে ভালো ডাবল রুমের বাজেট হোটেল এখানে পাওয়া সম্ভব। ৪০০ রুপিতে সিঙ্গেল রুমের হোটেলও এখানে আছে। বাজেট আরেকটু বেশি যেমন ৩ হাজার রুপি বা তার বেশি হলে ডিলাক্স রুমের খাবারসহ অনেক ভালো হোটেল পাওয়া যায়। v
- বিষয় :
- দিনরাত্রি