মেলায় যাই রে...
স্মৃতি চক্রবর্তী
প্রকাশ: ০৮ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:২৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
পহেলা বৈশাখ বাঙালির সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক উৎসব। নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে ঢাকার নানা প্রান্তে বৈশাখী মেলা বসে। এই মেলাগুলো শুধু কেনাকাটার জায়গা নয়, এগুলো বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার একটি বড় মাধ্যম। ছোট-বড় সবাই এ মেলায় অংশ নেয় এবং আনন্দে মেতে ওঠে।
বৈশাখী মেলার ইতিহাস অনেক পুরোনো। মোগল আমলে সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রচলন করেন এবং সেই সময় থেকেই পহেলা বৈশাখে মেলার আয়োজন শুরু হয়। তখন জমিদাররা প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা আদায়ের পর মিষ্টি বিতরণ এবং আনন্দ অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন। সেই ঐতিহ্য থেকেই ধীরে ধীরে বৈশাখী মেলার সূচনা হয়। বর্তমানে এই মেলা শুধু একটি উৎসব নয়, এটি বাঙালি পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
বৈশাখী মেলা সাধারণত পহেলা বৈশাখ থেকে শুরু হয়ে কয়েক দিন পর্যন্ত চলে। মেলায় লোকসংগীত, বাউল গান, যাত্রাপালা, পুতুল নাচ ও নানা ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থাকে। শিশুদের জন্য নাগরদোলা, সার্কাস ও রঙিন খেলনার বিশাল আয়োজন থাকে। সব বয়সী মানুষের জন্য আলাদা আলাদা আকর্ষণ থাকে বলে মেলা সবার কাছে সমান জনপ্রিয়।
রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের পর মেলা শুরু হয়, যা ঢাকার বৈশাখ উদযাপনের প্রধান কেন্দ্র। পার্কজুড়ে বসে মেলা-পিঠা, ফুচকা, খেলনা আর নানারকম লোকজ সামগ্রীর দোকান। পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার জনপ্রিয় স্থান এটি।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে থাকে বৈশাখী মেলার বড় আয়োজন। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে এখানে বসে বৈশাখী লোকমেলা। একই সঙ্গে চলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কনসার্ট, নাট্য পরিবেশনা। শহুরে জীবনে গ্রামীণ সংস্কৃতির ছোঁয়া এনে দেয় এই মেলা। শাহবাগ, দোয়েল চত্বর এবং টিএসসি এলাকায় থাকে বৈশাখী মেলার আমেজ। এ ছাড়া বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বিসিক ও বাংলা একাডেমির যৌথ উদ্যোগে সপ্তাহব্যাপী মেলা হয়, যেখানে শতাধিক স্টলে দেশীয় পণ্য ও হস্তশিল্পের জিনিস পাওয়া যায়। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতেও বড় পরিসরে মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়।
পুরান ঢাকার বংশাল, লক্ষ্মীবাজার, সূত্রাপুরের ধূপখোলা মাঠ এবং ওয়ারীর টিপু সুলতান রোডে প্রতিবছর ঐতিহ্যবাহী মেলা বসে। দক্ষিণ ও পূর্ব ঢাকার রায়েরবাগ, পোস্তগোলা, ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া এবং দনিয়া এলাকার মেলায় গ্রামীণ ঐতিহ্যের ছোঁয়া বেশি থাকে। নাগরদোলা, পুতুল নাচ এবং লোকসংগীতের আসর এ মেলাগুলোকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। এ ছাড়া শহরের কোলাহল থেকে দূরে আশুলিয়ার নদী তীরবর্তী এলাকাগুলোতেও বসে বৈশাখী মেলা।
এবার ঢাকায় বৈশাখকে কেন্দ্র করে কিছু আধুনিক ইভেন্টভিত্তিক আয়োজনও দেখা যাবে। আলোকি প্রাঙ্গণে ‘আর্কা বৈশাখ’ শিরোনামে দুদিনের মেলা আয়োজিত হবে; যেখানে থাকবে লাইভ মিউজিক, বিভিন্ন খাবার-দাবার, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা।
বৈশাখী মেলা ঢাকার মানুষের কাছে নববর্ষের সবচেয়ে আনন্দময় অনুষ্ঠানগুলোর একটি। এই মেলা বাঙালির শিকড়ের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আমাদের সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখে। শহরের ব্যস্ত জীবনে এই একটি দিন ছোট-বড়, সব ধর্মের মানুষ একসঙ্গে উৎসবে মেতে ওঠে।
- বিষয় :
- মেলা
