ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

মায়ের ছায়ায়

মায়ের ছায়ায়
×

মায়ের সঙ্গে কাটানো ছোট ছোট মুহূর্তই তাঁর জন্য হয়ে ওঠে বিশেষ আনন্দের মডেল: দিলারা জামান ও নাজিবা বাশার; ছবি: বিশ্বরঙ

তাসলিমা তামান্না

প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬ | ০৭:০৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রতিবছর মে মাসের দ্বিতীয় রোববার মা দিবস উদযাপিত হয়ে আসছে। সে হিসেবে এ বছর মা দিবস উদযাপিত হবে ১০ মে। মা মানে স্নেহ ও আদরের অনুভূতি, নিরাপদ আশ্রয়। মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক, মা দিবসের ভাবনা, মায়ের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব এসব নিয়ে লিখেছেন তাসলিমা তামান্না

সম্প্রতি মায়ের কবরের পাশে বসে ১২ বছর বয়সী ছামিয়া আক্তার নামের এক শিশুর কান্নার ভিডিও ভাইরাল হয় সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে। তার বাড়ি কুমিল্লার লালমাই উপজেলার বাগমারায়। ২৫ সেকেন্ডের ওই  ভিডিওতে দেখা যায়, ছামিয়া তার মায়ের কবরের পাশে বসে অঝোরে কাঁদছে আর বিলাপ করতে করতে বলছে, ‘আমারে কেন আপনার সাথে নিয়ে গেলেন না। ও আম্মা গো। আপনি কোথায় চলে গেছেন। আমারে আপনার কাছে নিয়া যান।’ আবেগঘন এ ভিডিওটি নিয়ে নেটিজেনদের মধ্যে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। পরে জানা যায়, সৎ মায়ের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে শিশুটি এভাবেই মৃত মায়ের কাছে আশ্রয় খুঁজছিল।  

মা তো এমনই। যার কাছে পৃথিবীর সব সন্তান নিরাপদ আশ্রয় খোঁজে। শিশু ছামিয়ার মা মৃত হলেও সে তাই আশ্রয় চাইছিল মায়ের কাছেই। মায়ের জন্য সন্তানের এই আকুতি চিরন্তন। জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের ভাষায়, ‘হেরিলে মায়ের মুখ/দূরে যায় সব দুখ, মায়ের কোলেতে শুয়ে জুড়ায় পরান,/মায়ের শীতল কোলে/সকল যাতনা ভোলে/কত না সোহাগে মাতা বুকটি ভরান।’ 
এ বছর ২৫ মার্চ ঈদের ছুটি শেষে রাজবাড়ী থেকে বাসে চড়ে মায়ের সঙ্গে ঢাকা ফিরছিল শিশু আলিফ। বাসটি দৌলতদিয়া পৌঁছলে ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে যায়। ওই সময় আলিফের মা ছেলেকে বাসের জানালা দিয়ে বের করে দিতে পারলেও নিজে বেঁচে ফিরতে পারেননি। মা চেয়েছিলেন যেভাবেই হোক নিজের সন্তানকে বাঁচাতে।  
সম্প্রতি ভারতের মধ্যপ্রদেশে জবলপুরের বার্গি বাঁধে নৌকাডুবির একটি ছবি কাঁদিয়েছে নেটিজেনদের। জানা যায়, নৌকায় উঠে লাইফ জ্যাকেটে চার বছরের সন্তানকে আষ্টেপৃষ্ঠে রেখেছিলেন এক মা। নৌকা ডোবার মুহূর্তেও সন্তানকে আগলে রেখেছিলেন তিনি। যখন তাদের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়, লাইফ জ্যাকেটে একইভাবে বুকে সন্তানকে জড়িয়ে রাখতে দেখা যায় মাকে। নৌকাডুবিতে মা-সন্তান দুজন মারা গেলেও এতটুকু আলগা হয়নি মায়ের সেই মমতার হাত। 

সন্তানের জন্য এমন আত্মত্যাগ শুধু মায়েরাই করতে পারেন। মানুষের জীবনে সবচেয়ে গভীর, নির্ভেজাল আর নিঃস্বার্থ সম্পর্ক হলো মা ও সন্তানের। পৃথিবীর আলো দেখার আগেই এ সম্পর্কের সূচনা হয়। সন্তানের জন্মের পর প্রতিটি নিঃশ্বাসে, প্রতিটি স্পর্শে মায়ের সঙ্গে এ সম্পর্ক আরও গভীর হয়। মা শুধু একজন মানুষ নন; তিনি আশ্রয়, সাহস আর ভালোবাসার স্থান। 

জন্ম থেকে আজীবনের সম্পর্ক
প্রবাদে আছে, ‘ঈশ্বর সব জায়গায় থাকতে পারেন না–এ কারণে তিনি মাকে পাঠিয়েছেন।’ আসলেই তাই। একটা শিশু যখন পৃথিবীতে আসে, তার প্রথম ভাষা হয় কান্না। তার সেই ভাষা বুঝতে পারেন একমাত্র মা। কান্না দিয়ে সে বোঝায় তার ক্ষুধা, ব্যথা, ঘুমের কথা। শিশুর সেই নীরব ভাষা পড়তে পারেন মা। ছোটবেলায় মায়ের কোলে যে নিরাপত্তা, তা পৃথিবীর কোনো কিছুর সঙ্গে তুলনীয় নয়।
মায়ের দেওয়া স্নেহ, ভালোবাসা আর মনোযোগই শিশুর জীবনের মানসিক ভিত্তি গড়ে তোলে। 

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, মা ও শিশুর মধ্যে শৈশবে গড়ে ওঠা এই বন্ধন শিশুর বিকাশে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাব ফেলে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, মাতৃস্নেহ ব্যক্তির শারীরিক, জ্ঞানীয়, সামাজিক এবং আবেগিক বিকাশকে প্রভাবিত করে। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, যেসব শিশু মায়ের সঙ্গে দৃঢ় বন্ধনে বেড়ে ওঠে তাদের আত্মসম্মানবোধ বেশি থাকে। তাদের মানসিক চাপ সামলানোর দক্ষতা উন্নত হয় এবং জীবনের অন্য সম্পর্কগুলোও অনেক দৃঢ় হয়।
মায়ের স্পর্শেই সন্তান ধীরে ধীরে পূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠে। পৃথিবীর সব ধর্মেই মায়ের মর্যাদাকে উচ্চাসীন করেছে। বিভিন্ন ভাষাভাষীর সন্তানের কাছে ‘মা’ ডাক শব্দটি কতই যে আপন তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। প্রথম দিন থেকে জীবনের শেষ পর্যন্ত সন্তানের প্রতি মায়ের ভালোবাসার কোনো পরিবর্তন হয় না।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সন্তান বড় হয়, নিজের মতো করে পৃথিবীকে চিনতে শেখে। মায়ের কাছে সে চিরকালই সেই ছোট্ট শিশুই থেকে যায়।

সময়ের পালাবদল, সম্পর্কের নতুন রূপ
জীবনের ব্যস্ততায় অনেক সময় মা-সন্তানের দূরত্ব বেড়ে যায়। পড়াশোনা, চাকরি বা জীবনের নানা টানাপোড়েনে সন্তান মায়ের থেকে দূরে চলে যায়। সন্তানের প্রতি মায়ের ভালোবাসা কখনও কমে না। মা অপেক্ষায় থাকেন সন্তানের। 
ঠিক এ সময়েই প্রয়োজন একটু সচেতনতা। শত ব্যস্ততার মধ্যে মায়ের জন্য একটু সময় বের করা, তাঁর একটু খোঁজ নেওয়া খুবই জরুরি। দূরে থাকলে আপনার একটি ফোন কল কিংবা বাড়িতে ফিরে মায়ের পাশে বসে কিছুক্ষণ গল্প–এসব ছোট ছোট বিষয়ই মায়ের কাছে হয়ে ওঠে অমূল্য।

বার্ধক্যে মায়ের যত্ন
জার্মান-আমেরিকান সমাজ মনোবিজ্ঞানী এরিখ ফ্রম বলেছেন, ‘মায়ের ভালোবাসাতেই শান্তি। এটি অর্জন করতে হয় না। এটির জন্য যোগ্যও হতে হয় না।’ তাই তো মায়ের একাধিক সন্তান থাকলেও তাঁর ভালোবাসায় কোনো ঘাটতি হয় না সন্তানের জন্য। যে মা একসময় তাঁর সন্তানদের প্রতিটি প্রয়োজনের খেয়াল রাখেন, বার্ধক্যে এসে তিনিই হয়ে ওঠেন কিছুটা নির্ভরশীল। শারীরিক দুর্বলতা, একাকিত্ব কিংবা মানসিক পরিবর্তন– সবকিছু মিলিয়ে এ সময়টা মায়েদের জন্য সবচেয়ে সংবেদনশীল।
এই সময় সন্তানের দায়িত্ব শুধু চিকিৎসা বা আর্থিক সহায়তা নয়; বরং দরকার মানসিক সঙ্গ দেওয়া। মা দূরে থাকলে ফোনে, ভিডিও কলে নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া জরুরি। কাছাকাছি থাকলে তাদের সঙ্গে সময় কাটানো, তাদের কথা মন দিয়ে শোনা, ছোট ছোট আনন্দের ব্যবস্থা করা মায়ের বার্ধক্যকে সুখময় করে তুলতে পারে।

ভালোবাসা প্রকাশের উপলক্ষ ‘মা দিবস’
বিশ্বের অনেক দেশে প্রতিবছর মে মাসের দ্বিতীয় রোববার মা দিবস উদযাপিত হয়ে আসছে। মা-কে ভালোবাসতে বিশেষ কোনো দিনের প্রয়োজন হয় না। প্রতিদিনই মাকে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা জানানো যায়। তারপরও বিশেষ এ দিবসটির সত্যিকারের উদ্দেশ্য হলো, মা এবং মাতৃত্বের সর্বজনীন রূপটির প্রতি সবার শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা জাগিয়ে তোলা। এদিন মায়ের জন্য করতে পারেন বিশেষ কিছু আয়োজন। দিনটি উপলক্ষে মাকে নিয়ে কোথাও বেড়াতে পারেন, মায়ের প্রিয় কোনো খাবার নিজের হাতে তৈরি করতে পারেন, চাইলে অনলাইনে কিনতে পারেন মায়ের জন্য শাড়ি, বই, প্রিয় সুগন্ধি, বিশেষ মেসেজ লেখা চায়ের মগ। 
তবে উপহারের চেয়ে তাঁর কাছে বড় উপহার হলো সময় আর যত্ন। ব্যস্ততার মধ্যেও কিছুটা সময় শুধু মায়ের জন্য রাখাই হতে পারে তাঁর জন্য সবচেয়ে মূল্যবান উপহার।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মা-সন্তানের সম্পর্ক বদলায়, কিন্তু তাঁর গভীরতা কখনও কমে না। মায়ের ভালোবাসা নিঃশর্ত, অমলিন আর চিরন্তন। পৃথিবীর সব মা থাকুক সন্তানদের ভালোবাসায় আর প্রার্থনায়। কারণ মা আছেন বলেই পৃথিবীটা এতটা আপন। 

আরও পড়ুন

×