ব্যস্ত জীবনেও সম্পর্ক থাকুক সুন্দর
সাংসারিক কাজে পারস্পরিক সহযোগিতা সম্পর্কে হৃদয়তা বাড়ায়
রোজী আরেফিন
প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬ | ০৬:৫৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
সকালে অফিসে যাওয়ার তাড়া, সন্তানের স্কুল, বাজার, যানজট, কর্মক্ষেত্রের চাপ–সব মিলিয়ে দিন শেষে রাশেদ ও নীলার কথা বলার সময়ই যেন থাকে না। একই ছাদের নিচে থেকেও তারা ধীরে ধীরে একে অপরের কাছ থেকে অনেক দূরে সরে যাচ্ছিলেন। কোনো বড় ঝগড়া নয়, বরং ছোট ছোট অবহেলা, সময়ের অভাব আর সারাদিনের কাজের ক্লান্তিই তাদের সম্পর্কের উষ্ণতাটা যেন অনেক কমিয়ে দিচ্ছিল।
এভাবে চলতে চলতে অতঃপর তারা সচেতনভাবে প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় একসঙ্গে কাটানোর সিদ্ধান্ত নেন। সেই ছোট্ট পরিবর্তনই আবার সম্পর্ককে প্রাণবন্ত করে তোলে।
আধুনিক জীবনে এমন গল্প খুবই পরিচিত। ব্যস্ততা আজ জীবনের অপরিহার্য অংশ। কিন্তু ব্যস্ততা যদি সম্পর্কের জায়গা দখল করে নেয়, তখন দাম্পত্য জীবনে দূরত্ব তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তাই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে সচেতন থাকা প্রয়োজন।
দাম্পত্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো যোগাযোগ। প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলার প্রয়োজন নেই। তবে একে অপরের দিন কেমন গেল, কী নিয়ে ভাবছেন, কী নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন–এসব জানতে চাওয়া সম্পর্ককে জীবন্ত রাখে। অনেক সময় মানুষ সমস্যা সমাধানের চেয়ে বেশি চায় একজন মনোযোগী শ্রোতা। সম্পর্কের ভেতরে কথোপকথন কমে গেলে ভুল বোঝাবুঝি বাড়ে আর কথোপকথন বাড়লে দূরত্ব কমে।
বর্তমান সময়ে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের কর্মজীবী হওয়া সাধারণ বিষয়। দুজনেরই ক্যারিয়ার, লক্ষ্য ও দায়িত্ব থাকে। ফলে সংসারের কাজ ও পারিবারিক দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নেওয়া জরুরি। একজনের পেশাগত সাফল্য অন্যজনের জন্য হুমকি নয়; বরং তা পারিবারিক অগ্রগতির অংশ। পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগিতা এখানে বড় ভূমিকা রাখে। কর্মজীবনের চাপ, পদোন্নতির প্রতিযোগিতা কিংবা দীর্ঘ কর্মঘণ্টা যেন সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে, সে বিষয়ে সচেতন থাকা প্রয়োজন।
অর্থনৈতিক চাপও অনেক সময় সম্পর্কের টানাপোড়েনের কারণ হয়। সংসারের আয়-ব্যয়, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কিংবা সঞ্চয়ের বিষয়গুলো নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা প্রয়োজন। অর্থ নিয়ে গোপনীয়তা বা একতরফা সিদ্ধান্ত ভুল বোঝাবুঝি তৈরি করতে পারে। পরিবারে আর্থিক স্বচ্ছতা এবং যৌথ পরিকল্পনা দাম্পত্যকে আরও স্থিতিশীল করে। দাম্পত্যে পরিবারের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সমাজে অনেক ক্ষেত্রে মা-বাবা কিংবা আত্মীয়স্বজনের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ দাম্পত্যে অস্বস্তি তৈরি করে। আবার প্রয়োজনের সময় পরিবারের সমর্থন সম্পর্ককে শক্তিশালীও করতে পারে। তাই পারিবারিক সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি স্বামী-স্ত্রীর নিজস্ব ব্যক্তিগত পরিসরও সম্মান করা জরুরি।
মনোবিজ্ঞান ও সম্পর্কবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক দাম্পত্য জীবনের অন্যতম বড় সংকট হলো একসঙ্গে থেকেও মানসিকভাবে দূরে থাকা। কর্মব্যস্ততা, প্রযুক্তিনির্ভর জীবন এবং ক্রমবর্ধমান দায়িত্বের কারণে অনেক দম্পতি নিজেদের অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ হারিয়ে ফেলেন। গবেষণায় দেখা গেছে, সফল দাম্পত্যের ভিত্তি শুধু ভালোবাসা নয়; বরং বন্ধুত্ব, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিশ্বাস এবং নিয়মিত ইতিবাচক যোগাযোগ। ছোট ছোট বিষয় যেমন সঙ্গীর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা কিংবা তাঁর সাফল্যে আনন্দিত হওয়া ইত্যাদি সম্পর্ককে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করে।
আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে, একটানা একঘেয়ে রুটিন থেকেও অনেক সময় দূরত্ব তৈরি হয়। তাই মাঝেমধ্যে একসঙ্গে বাইরে ঘুরতে যাওয়া, ছোট কোনো ভ্রমণ কিংবা শুধু একটি বিকেল নিজেদের জন্য রাখা সম্পর্ককে নতুন করে সতেজ করতে পারে। এর জন্য বড় বাজেটের প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন আন্তরিক উপস্থিতি। অনেক সময় এক কাপ চা হাতে বারান্দায় বসে কিছুক্ষণ গল্প করাও সম্পর্কের জন্য মূল্যবান বিনিয়োগ হতে পারে।
দাম্পত্য সম্পর্ক ভালো রাখতে কিছু কার্যকর টিপস
প্রতিদিন অন্তত ১৫-২০ মিনিট শুধু একে অপরের জন্য রাখুন।
দিনের ব্যস্ততার মধ্যেও একটি খোঁজ নেওয়ার ফোন বা বার্তা দিন।
সঙ্গীর কাজ ও সাফল্যের প্রশংসা করতে কার্পণ্য করবেন না।
সংসারের দায়িত্ব ভাগাভাগি করুন।
অর্থনৈতিক পরিকল্পনা যৌথভাবে করুন।
মতবিরোধ হলে জেতার চেষ্টা নয়, বোঝার চেষ্টা করুন।
রাগের মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া এড়িয়ে চলুন।
মোবাইল ও সামাজিক মাধ্যমের বাইরে সম্পর্কের জন্য নির্দিষ্ট সময় রাখুন।
বছরে অন্তত এক বা দুবার একসঙ্গে কোথাও ঘুরতে যান।
একে অপরের ক্যারিয়ার, ব্যক্তিগত স্বপ্ন ও আগ্রহকে সম্মান করুন।
পরিবারে মা-বাবা, শ্বশুর-শাশুড়ির অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ এড়িয়ে চলুন।
তথ্যসূত্র: সাইকোলজি টুডে, জন গটম্যান
- বিষয় :
- সংসার
