ঢাকা রোববার, ২৮ জুন ২০২৬

টাঙ্গুয়ার হাওরে

টাঙ্গুয়ার হাওরে
×

সুরাইয়া হেনা

প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬ | ০৭:০১

| প্রিন্ট সংস্করণ

বর্ষার দিনে কখনও টাঙ্গুয়ার হাওরে ঘুরতে গেছেন? যারা গেছেন তারা জানেন বর্ষায় এক অন্য রূপ ধারণ করে স্থানটি। টাঙ্গুয়ার হাওরের বুক চিরে এগিয়ে চলা হাউসবোটের ছাদে বসে যখন চারপাশে শুধু জল আর জল দেখা যায়, তখন মনে হয় পৃথিবীর সব ব্যস্ততা যেন অনেক দূরে ফেলে আসা হয়েছে। আকাশ আর জলরাশির মাঝখানে ভেসে থাকার সেই অনুভূতি বলে বোঝানো যায় না। আয়নার মতো স্বচ্ছ জলে নীল-সাদা আকাশের প্রতিচ্ছবি মিলে তৈরি করে এক অপার্থিব সৌন্দর্য।
শুধু জল আর আকাশের মেলবন্ধনই নয়, এখানে দেখা মেলে জলের কিনারা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা মেঘালয়ের সবুজ পাহাড়, পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা শুভ্র জলধারা। প্রকৃতির নানা রূপ আর রঙের সমাহারে সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর অন্য এক রূপ নেয়। এ সৌন্দর্যকে কাছ থেকে অনুভব করার সবচেয়ে আরামদায়ক ও উপভোগ্য উপায় হচ্ছে হাউসবোট।
অনেক দিন ধরেই বর্ষায় টাঙ্গুয়ার হাওরে আবার যাওয়ার পরিকল্পনা করছিলাম। অবশেষে এক মেঘলা সকালে বন্ধুদের সঙ্গে রওনা দিলাম সুনামগঞ্জের পথে। ভোরের আলো ফোটার কিছু পরই পৌঁছে যাই হাওরের ঘাটে। সেখানে আমাদের জন্য অপেক্ষায় ছিল ‘বজরা-দ্য হাউসবোট’। আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন সেই ভাসমান ঘরেই কেটেছে দুটি চমৎকার দিন।
বোট ছেড়ে দেওয়ার কিছুক্ষণ পর থেকেই বদলে যেতে শুরু করল চারপাশের দৃশ্য। যতদূর চোখ যায়, শুধু বিস্তীর্ণ জলরাশি। বর্ষার জলে টইটম্বুর টাঙ্গুয়ার হাওরের সৌন্দর্য আসলে ছবিতে ধরা যায় না, ভাষায়ও ব্যাখ্যা করা যায় না। এই অনুভূতি উপলব্ধি করতে হয় উপস্থিত থেকেই।
হাউসবোটের ছাদে বসে সকালের নাশতা সারতে সারতে দূরে ছড়িয়ে থাকা গ্রামগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। বর্ষায় চারপাশের জলমগ্নতার কারণে দূর থেকে গ্রামগুলোকে মনে হয় যেন ছোট ছোট দ্বীপ। মাঝেমধ্যে ভেসে যায় জেলে নৌকা, কোথাও দেখা মেলে স্কুলগামী শিশুদের ছোট্ট নৌকার। হাওরের জীবন যেন জলের সঙ্গেই একাকার হয়ে গেছে। শহুরে জীবনে অভ্যস্ত চোখে প্রতিটি দৃশ্যই মনে হচ্ছিল ছবির মতো।
দিনের আলো নরম হয়ে এলে সময় কাটিয়েছি হাউসবোটের লাউঞ্জ আর ছাদে। কখনও মেঘলা আকাশ, কখনও ঝিরিঝিরি বৃষ্টি, আবার কখনও রোদের ঝলকানি–বর্ষার এই পরিবর্তনশীল রূপ হাওরের সৌন্দর্যকে আরও রহস্যময় করে তোলে।
দুপুরের দিকে বোট থামানো হলো হাওরের মাঝখানে। চারদিকে কোনো কোলাহল নেই। নেই যানবাহনের শব্দ। শুধু বাতাসের মৃদু শোঁ শোঁ শব্দ আর ঢেউয়ের ছন্দ। বোটের ডেকে বসে এক কাপ চা হাতে সেই নির্জনতা উপভোগ করার আনন্দ সত্যিই আলাদা। এরপর লাইফ জ্যাকেট পরে দীর্ঘ সময় হাওরের জলে ভেসে থাকা আর সাঁতারে মেতে ওঠা। সেই আনন্দঘন সময়ের পর হাওরের তাজা মাছ, মুরগি, নানা ধরনের ভর্তা, ডাল আর ভাতের মধ্যাহ্নভোজ যেন স্বাদে এনে দেয় বাড়তি তৃপ্তি।
বিকেলের দিকে আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই নেমে এলো বৃষ্টি। নিজের কেবিনে বসে বড় জানালার কাচে বৃষ্টির ফোঁটার খেলা দেখা ছিল পুরো ভ্রমণের অন্যতম সুন্দর মুহূর্ত। জলের ওপর বৃষ্টি পড়ার দৃশ্য, দূরে ধূসর হয়ে যাওয়া দিগন্ত আর মেঘের নিচে নত হয়ে থাকা পাহাড়–সব মিলিয়ে যেন এক অপার্থিব দৃশ্য।
সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে হাওরের রূপও বদলে যায়। চারপাশে গভীর নীরবতা, দূরের কোনো গ্রামের মিটমিটে আলো আর জলের ওপর ভেসে আসা শীতল বাতাস এক অন্যরকম আবহ তৈরি করে। রাতের খাবারের পর অনেকটা সময় কাটল হাউসবোটের ছাদে। গান, গল্প আর আড্ডায় জমে উঠল রাতের পর্ব।
পরদিন ভোরে ঘুম ভাঙল বৃষ্টিভেজা এক সকালে। হাওরের ওপর তখন হালকা কুয়াশা আর মেঘের ছায়া। হাতে ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম বোটের সামনের ডেকে। দূরে মেঘালয়ের পাহাড়, মাঝখানে বিস্তীর্ণ জলরাশি আর চারপাশে ভেজা বাতাসের গন্ধ–সব মিলিয়ে মন ভরে উঠেছিল এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে। 
এবারও ঘুরে দেখেছি ওয়াচ টাওয়ার, শিমুল বাগান, বারিক্কা টিলা, যাদুকাটা নদী, নীলাদ্রি লেকসহ টাঙ্গুয়ার হাওরের জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থানগুলো। হাউসবোটে ওঠার পর থেকে প্রতিটি বেলার খাবার, নাশতা এবং বিভিন্ন স্পট ঘোরার ব্যবস্থাও ছিল একই প্যাকেজের আওতায়। বাড়তি ঝামেলা ছাড়াই নিরিবিলি ও স্বস্তিদায়ক সময় কাটানোর সুযোগ মিলেছে। কর্মব্যস্ত জীবনের মানুষদের জন্য এমন আরামদায়ক আয়োজন নিঃসন্দেহে বাড়তি প্রাপ্তি।
সাধারণত হাউসবোটের প্যাকেজগুলো দুদিন এক রাতের হয়ে থাকে। তবে প্রয়োজন অনুযায়ী সেগুলো কাস্টমাইজ করা যায়। কেবিনের ধরন অনুযায়ী জনপ্রতি খরচ নির্ধারণ করা হয়। নন-অ্যাটাচড বাথ, অ্যাটাচড বাথ কিংবা বারান্দাসহ বিভিন্ন ধরনের কেবিন রয়েছে। প্রতিটি কেবিনে সাধারণত দুই থেকে চারজন থাকতে পারেন। জনপ্রতি খরচ শুরু হয় প্রায় চার হাজার টাকা থেকে, যা সুযোগ-সুবিধা ও কেবিনের ধরনভেদে বাড়তে পারে।
শহরের ব্যস্ততা থেকে দূরে গিয়ে যদি প্রকৃতির মধ্যে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে, তাহলে বর্ষার টাঙ্গুয়ার হাওরে একটি হাউসবোট ভ্রমণ হতে পারে জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। জল, মেঘ, বৃষ্টি আর বাতাসের এই অপূর্ব মেলবন্ধন বারবার টেনে নিয়ে যাবে হাওরের সেই অনন্ত নীলের কাছে। যেমনটা হয় আমার ক্ষেত্রে। প্রতি বর্ষায় এক অদ্ভুত টান অনুভব করি টাঙ্গুয়ার হাওরের অপার সৌন্দর্যের প্রতি। 
 

আরও পড়ুন

×