থেকে যায় বন্ধুত্ব
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যোগাযোগ কমে গেলেও সত্যিকারের বন্ধুত্ব কখনও হারিয়ে যায় না
রোজী আরেফিন
প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৪২
| প্রিন্ট সংস্করণ
দিনের শেষে সবাই এমন একজন মানুষ খোঁজে, যার কাছে নিজেকে প্রকাশ করতে পারে। কোনো অভিনয়, ভণিতা নয়, শুধু নিজের কথা, নিজের হাসি, নিজের কষ্টগুলো ভাগ করে নেওয়ার একজন মানুষ। সেই মানুষটিই বন্ধু। এই বন্ধু শুধু জীবনের অংশ নয়, মানুষের ভালো থাকারও বড় একটি কারণ।
জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে এই বন্ধু নামক মানুষগুলো এমনভাবে আমাদের জীবনে জায়গা করে নেয়, যাদের সঙ্গে রক্তের কোনো সম্পর্ক না থাকলেও হৃদয়ের বন্ধন হয়ে ওঠে সবচেয়ে দৃঢ়। আমাদের জীবনে এ মানুষগুলোর প্রভাব বেশ গভীর। পরিবার আমাদের জন্মসূত্রে পাওয়া, কিন্তু বন্ধু আমাদের নিজের পছন্দে বেছে নেওয়া। তাই বন্ধুত্বের সম্পর্কটিও বিশেষ। এই সম্পর্কের আনন্দ, বিশ্বাস, অভিমান, হাসি আর স্মৃতিগুলোকে সম্মান জানাতেই প্রতি বছর উদ্যাপিত হয় বন্ধু দিবস।
বন্ধুত্ব মানে শুধু একসঙ্গে ঘুরতে যাওয়া বা ছবি তোলা নয়। সত্যিকারের বন্ধু সেই মানুষ, যে আনন্দের মুহূর্তে যেমন পাশে থাকে, তেমনি কঠিন সময়েও নীরবে শক্তি হয়ে দাঁড়ায়। অনেক সময় পরিবারের কাছেও যা বলা যায় না, সেটাই নির্দ্বিধায় বলা যায় একজন বন্ধুকে। কারণ বন্ধুত্বের ভিত্তি গড়ে ওঠে বিশ্বাস, গ্রহণযোগ্যতা আর পারস্পরিক শ্রদ্ধার ওপর।
জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে বন্ধুত্বের রূপ বদলায়। স্কুলের বেঞ্চ ভাগ করে নেওয়া বন্ধু, কলেজের আড্ডার সঙ্গী, বিশ্ববিদ্যালয়ের রাতজাগা পড়ার সাথি কিংবা কর্মজীবনের সহকর্মী–প্রতিটি সম্পর্কই জীবনে আলাদা রং যোগ করে। সময়ের সঙ্গে দূরত্ব বাড়তে পারে, যোগাযোগ কমে যেতে পারে কিন্তু সত্যিকারের বন্ধুত্ব কখনও পুরোনো হয় না। বহু বছর পর একটি ফোনকল কিংবা একটি ছোট্ট বার্তাও সেই সম্পর্ককে আবার নতুন করে জাগিয়ে তুলতে পারে।
বাংলাদেশের প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মেহতাব খানম বিভিন্ন সময়ে মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক আলোচনায় বলেছেন, একজন মানুষের মানসিক সুস্থতার জন্য ঘনিষ্ঠ ও আন্তরিক সম্পর্কের গুরুত্ব অপরিসীম। তাঁর মতে, এমন একজন মানুষ থাকা, যার কাছে নির্ভয়ে নিজের কথা বলা যায়, মানসিক চাপ কমাতে এবং কঠিন সময়ে ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি জোগাতে সে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে হাজার হাজার অনলাইন পরিচিতি থাকলেও প্রকৃত বন্ধু খুব বেশি হয় না। সামাজিক মাধ্যমে লাইক বা কমেন্টের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান হলো সেই বন্ধু, যে প্রয়োজনের সময় একবার ফোন করে জানতে চায়, তুই ঠিক আছিস তো? বন্ধুত্বের আসল সৌন্দর্য এখানেই, এটি কোনো আনুষ্ঠানিকতার বা সামাজিকতার সম্পর্ক নয়, বরং এটি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর নির্ভরতার নাম।
বন্ধুত্বের সম্পর্ককে মর্যাদা দিতে প্রতি বছর আগস্টের প্রথম রোববার উদযাপিত হয় বন্ধু দিবস। এ বছর দিনটি পড়েছে ২ আগস্ট।
বন্ধু দিবস শুধু শুভেচ্ছা বিনিময়ের দিন নয়, বরং সম্পর্কগুলোর দিকে নতুন করে নজর দেওয়ার একটি সুযোগ। ব্যস্ততার কারণে হয়তো অনেক বন্ধুর সঙ্গেই আগের মতো যোগাযোগ থাকে না। কাজ, পড়াশোনা কিংবা ব্যক্তিগত ব্যস্ততায় অনেক সম্পর্ক ধীরে ধীরে দূরে সরে যায়। এই দিনটি হতে পারে সেই দূরত্ব কমিয়ে আনার একটি উপলক্ষ। আপনি চাইলে অনেক দিন কথা হয়নি এমন কোনো বন্ধুকে একটি ফোন করতে পারেন, একটি ছোট্ট বার্তা পাঠাতে পারেন কিংবা অনেক দিনের বাকি থাকা আড্ডার পরিকল্পনা করতে পারেন। বন্ধু দিবসকে শুধু একটি দিনের উদ্যাপন হিসেবে না দেখে, সারাবছর সম্পর্কগুলোকে যত্নে রাখার একটি উপলক্ষ হিসেবেও ভাবতে পারেন।
তবে নিয়মিত বন্ধুর খোঁজ নেওয়া, প্রয়োজনে পাশে থাকা, বন্ধুর সাফল্যে তাকে অভিনন্দন জানানো বা কঠিন সময়ে শুধু তার কথা মন দিয়ে শোনা–এসব ছোট ছোট অভ্যাসই একটি বন্ধুত্বকে দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে। গবেষণাতেও দেখা গেছে, ঘনিষ্ঠ সামাজিক সম্পর্ক ও বন্ধুত্ব মানুষের মানসিক সুস্থতা এবং ভালো থাকার অনুভূতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। তাই বন্ধু দিবস হোক সম্পর্কগুলোকে আরও আন্তরিকভাবে লালন করার একটি দারুণ উপলক্ষ।
ছবি: কাব্য
- বিষয় :
- বন্ধুত্ব