ডায়েটে যেসব ভুল নয়
ইসরাত জাহান ডরিন
প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৪৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
ওজন কমানোর চেষ্টা করলেই চারপাশ থেকে নানা ধরনের পরামর্শ আসতে শুরু করে। কেউ বলেন, ভাত খাওয়া যাবে না। কেউ বলেন, রাতের খাবার বাদ দিন। আবার কেউ পরামর্শ দেন, সারাদিন এক বেলা খেলেই দ্রুত ওজন কমবে। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে থাকা এমন অনেক তথ্যকে মানুষ সত্য বলে ধরে নেন। অথচ বর্তমান পুষ্টিবিজ্ঞান বলছে, ওজন নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে অনেক প্রচলিত ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং এসব ভুল ধারণা অনুসরণ করতে গিয়ে অনেকেই প্রয়োজনীয় পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হন, মাংসপেশি হারান এবং পরবর্তী সময়ে আবার দ্রুত ওজন বাড়িয়ে ফেলেন।
ভাত খাওয়া ভুল নয়: ভাতকে অনেকেই ওজন বেড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ মনে করেন। বাস্তবে কোনো একটি নির্দিষ্ট খাবার একা ওজন বাড়ায় না। ওজন নির্ভর করে দীর্ঘ সময় ধরে মোট কত ক্যালোরি গ্রহণ করা হচ্ছে এবং কত ক্যালোরি ব্যয় হচ্ছে তার ওপর। তাই পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে পর্যাপ্ত শাকসবজি, ডাল ও মানসম্মত প্রোটিনের সঙ্গে ভাত খেলে তা সহজেই একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্য পরিকল্পনার অংশ হতে পারে।
কার্বোহাইড্রেট খাওয়াও ভুল নয়: অনেকেই দ্রুত ওজন কমানোর আশায় ভাত, রুটি, আলু বা অন্যান্য কার্বোহাইড্রেট সম্পূর্ণ বাদ দেন। এতে শুরুতে শরীরের পানি কমে ওজন কিছুটা কমতে পারে, কিন্তু এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। কার্বোহাইড্রেট শরীর ও মস্তিষ্কের প্রধান শক্তির উৎস। তাই সম্পূর্ণ বাদ না দিয়ে পরিশোধিত শর্করার পরিবর্তে লাল চাল, আটার রুটি, ওটস বা অন্যান্য সম্পূর্ণ শস্য বেছে নেওয়াই বেশি স্বাস্থ্যকর। সারাদিন এক বেলা বা দুই বেলা খুব কম খেয়ে থাকা কোনো আদর্শ ডায়েট নয়। অনেকেই মনে করেন যত কম খাবেন, তত দ্রুত ওজন কমবে। কিন্তু দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকলে অতিরিক্ত ক্ষুধা তৈরি হয়, যা পরবর্তী খাবারে অতিরিক্ত খাওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় শক্তি ও প্রোটিনের ঘাটতির কারণে শরীর চর্বির পাশাপাশি মাংসপেশিও হারাতে শুরু করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, ওজন কমানোর সময় মাংসপেশি সংরক্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি শরীরের বিপাকক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। তাই ব্যক্তির প্রয়োজন অনুযায়ী সুষম ও পরিকল্পিতভাবে খাবার গ্রহণ করাই সবচেয়ে কার্যকর কৌশল।
রাতের খাবার খাওয়াও ভুল নয়: অনেকেই মনে করেন রাতের খাবার খেলেই ওজন বাড়বে। কিন্তু দিনের নির্দিষ্ট সময়ের চেয়ে সারাদিনে মোট ক্যালোরি গ্রহণ, খাদ্যের গুণগত মান এবং শারীরিক কার্যক্রম অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই রাতের খাবার বাদ না দিয়ে পরিমিত ও সুষম খাবার খাওয়াই যুক্তিযুক্ত।
ফল খাওয়া ভুল নয়: ফলে প্রাকৃতিক চিনি থাকলেও সম্পূর্ণ ফলে রয়েছে খাদ্যআঁশ, ভিটামিন, খনিজ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয়। তাই ফলের জুসের পরিবর্তে সম্পূর্ণ ফল খাওয়াই উত্তম। কারণ এতে তৃপ্তি বেশি পাওয়া যায় এবং আঁশও অক্ষুণ্ন থাকে।
প্রোটিন খাওয়া ভুল নয়, বরং প্রয়োজন: ওজন কমানোর সময় পর্যাপ্ত প্রোটিন ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে, মাংসপেশি সংরক্ষণ করে এবং দীর্ঘ সময় পেট ভরা অনুভূতি দেয়। তাই প্রতিটি প্রধান খাবারে ডিম, মাছ, মুরগি, ডাল, দুধ বা অন্যান্য স্বাস্থ্যকর প্রোটিনের উৎস রাখা উচিত।
শুধু ডায়েট করলেই হবে–এ ধারণাও সঠিক নয়। নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম এবং পর্যাপ্ত ঘুম ওজন নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শুধু ক্যালোরি কমিয়ে নয়, স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার সমন্বয়ের মাধ্যমেই দীর্ঘমেয়াদে ভালো ফল পাওয়া সম্ভব।
সবশেষে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি–ডায়েট মানে না খেয়ে থাকা নয়, আবার কোনো একটি খাবারকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করাও নয়। একটি ভালো ডায়েট হলো এমন একটি খাদ্য পরিকল্পনা, যা শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করে, ব্যক্তির জীবনযাত্রার সঙ্গে মানানসই হয় এবং দীর্ঘদিন অনুসরণ করা সম্ভব। ওজন কমানোর প্রকৃত লক্ষ্য হওয়া উচিত শরীরের অতিরিক্ত চর্বি কমানো, মাংসপেশি সংরক্ষণ করা এবং দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ জীবন নিশ্চিত করা–শুধু দাঁড়িপাল্লার সংখ্যা কমানো নয়।
লেখক: ক্লিনিক্যাল ডায়েটিশিয়ানের চিফ ডায়েটিশিয়ান-বাংলাদেশ ডায়াবেটিক নেটওয়ার্ক
- বিষয় :
- ডায়েট