ঢাকা বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২৬

নিজের জন্য একটু সময়

নিজের জন্য একটু সময়
×

নিজের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক তৈরি হলে অন্য সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীলতা কমে

তাসলিমা তামান্না

প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৪৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

আমরা পরিবারকে সময় দিচ্ছি, কর্মক্ষেত্রকে গুরুত্ব দিচ্ছি, বন্ধুদের খোঁজ নিচ্ছি, কিন্তু নিজের শরীর কিংবা মনের খবর নেওয়ার সময়-ই যেন হয়ে ওঠে না। অথচ নিজের যত্ন নেওয়া সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অন্যতম শর্ত। নিজের প্রতি যত্নশীল হওয়া মানে শুধু সুন্দর দেখানো নয়; বরং সুস্থ শরীর, শান্ত মন এবং ভারসাম্যপূর্ণ জীবন গড়ে তোলা। লিখেছেন তাসলিমা তামান্না

শেষ কবে এক কাপ চা হাতে বারান্দায় বসে একমনে বৃষ্টি দেখেছিলেন মনে পড়ে কিংবা শান্ত নদীর ধারে বসে সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে প্রকৃতির মগ্নতায় হারিয়ে গিয়েছিলেন–এমন কোনো মুহূর্ত কি ভেসে ওঠে স্মৃতির পাতায়? ব্যস্ত জীবনে আজকাল এমন মুহূর্ত উপভোগের সুযোগ খুবই কম। অথচ নিজেকে ভালো রাখতে এমন সময় বের করা খুবই জরুরি। বলছিলাম, নিজের যত্নের কথা; যা থেকে বেশিরভাগ মানুষ আজ অনেক দূরে।  

সকালের অ্যালার্ম বাজার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় ব্যস্ততা। নাশতা তৈরি, সন্তানের স্কুল, দিনের রান্নার ব্যবস্থা, অফিসের কাজ, সময়মতো কাজ শেষ করে বাড়ি ফেরা। ফেরার পথে সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনা। বাড়িতে ফিরে আবারও ব্যস্ত সাংসারিক কাজে। এর ফাঁকে ফাঁকে চলে সন্তানদের লেখাপড়ার খোঁজখবর। দূরে থাকলে মা-বাবার সঙ্গে ফোনে কথা বলা–এভাবে দিনের প্রতিটি মুহূর্ত যেন থাকে অন্যদের জন্য বরাদ্দ। 

আত্মযত্ন অর্থ কী?
আত্মযত্ন বা নিজের যত্ন বলতে এমন সব কাজ করাকে বোঝায়; যা আপনার শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। অনেকেই ‘সেলফ কেয়ার’ বা আত্মযত্ন বলতে শুধু ত্বকের পরিচর্যা বা পার্লারে গিয়ে স্পা করানোই বোঝেন। কিন্তু এর পরিধি ব্যাপক। পর্যাপ্ত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা, মানসিক চাপ সামলানো, নিজের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া, প্রয়োজন হলে বিশ্রাম নেওয়া–এ সবকিছুই আত্মযত্নের অংশ।

আত্মযত্নের গুরুত্ব 
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিজের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক তৈরি হলে অন্য সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীলতাও কমে। তখন মানুষ একা থাকাকে ভয় পায় না। বরং নিজের সঙ্গ উপভোগ করতে শেখে। যুক্তরাষ্ট্রের মনোবিজ্ঞানী ড. টেরি বাকোর মতে, জীবন খুবই সংক্ষিপ্ত। সবকিছুতে কষ্ট পাওয়া ঠিক নয় বরং নিজেদের যত্ন নেওয়া উচিত। তাঁর ভাষায়, জীবনে ক্লান্তি প্রতিরোধ এবং তা মোকাবিলায় আত্মযত্ন খুবই জরুরি। বাকো বলেন, নিজের যত্ন নিলে আপনি অন্যদেরও যথাযথভাবে যত্ন নিতে পারবেন।

শরীরের যত্নে 
শারীরিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া এক প্রকার আত্মযত্ন; যা জীবনের মান উন্নত করতে এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগ প্রতিরোধ বা নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। এ ব্যাপারে ঢাকার সিএমএইচের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান এবং অ্যাডভাইজার মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. নাসির উদ্দিন আহমদ বলেন, শারীরিক সুস্থতার জন্য প্রয়োজন আয়েশী জীবনযাপনের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে কর্মময় ফুরফুরে জীবন। এর জন্য প্রয়োজন নিয়মিত শরীরচর্চায় অভ্যস্ত হওয়া। চল্লিশোর্ধ্ব বয়সীদের জন্য উত্তম হলো নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস রপ্ত করা। এর বিকল্প হতে পারে সাইক্লিং কিংবা সাঁতার। শরীরের কোষগুলোয় ফুরফুরে অক্সিজেন এবং রক্তপ্রবাহ বজায় রাখার জন্য প্রয়োজন নিয়মিত শারীরিক কসরত।

তিনি আরও বলেন, শারীরিক সুস্থতার জন্য খাবারের দিকে অবশ্যই নজর রাখতে হবে। অতিরিক্ত তেল-চর্বি-চিনির বদলে খাদ্যতালিকায় থাকতে হবে রঙিন শাকসবজি, টাটকা ফল, গোটা শস্যদানা, ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার। পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে। শরীর যাতে পানি শূন্য না হয় সেদিকে নজর দিতে হবে। 
যারা সারাদিন বসে কাজ করেন তারা প্রতি ঘণ্টায় অন্তত ৫ মিনিট উঠে হাঁটাহাঁটি করুন। ডেস্কে বসেই হালকা ব্যায়াম করুন। এতে হৃৎপিণ্ড ভালো থাকার পাশাপাশি মনও ভালো থাকে। 

প্রয়োজন পর্যাপ্ত ঘুম
শরীর ও মন সুস্থ রাখতে পর্যাপ্ত ঘুমের বিকল্প নেই। ডা. নাসির উদ্দিন আহমদ জানান, সুস্থ থাকতে দৈনিক ঘুমাতে হবে ৭-৮ ঘণ্টা। পর্যাপ্ত ঘুম শরীর-মনের উত্তম দাওয়াই। 
আজকাল অনেকেই রাত জেগে কাজ করেন কিংবা সামাজিক মাধ্যমে সময় কাটান। ঘুমানোর আগে স্ক্রিন দেখা ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়। রাতে পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মনোযোগ কমে যায়, বিরক্তি বাড়ে, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যায়। ঘুমাতে যাওয়ার অন্তত এক ঘণ্টা আগে মোবাইল বা ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে দূরে থাকুন। এতে ঘুমের মান ভালো হয়।

মনেরও চাই যত্ন 
শুধু শরীর নয়, মানসিক সুস্থতার দিকেও সমান নজর দেওয়া জরুরি। এ ব্যাপারে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের সাইকিয়াট্রিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক  ডা. সাঈদুস সাকালান বলেন, ‘আমরা যেমন শরীর, দাঁত, ত্বকের যত্ন নিই  সেভাবে মনেরও যত্ন নেওয়া জরুরি। মন আমাদের আবেগ, অনুভূতি, আচরণ, পারস্পরিক বোঝাপড়া নিয়ন্ত্রণ করে। মনের যত্নের জন্য নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, রিলাক্সেশন চর্চা করা উচিত। সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার নিয়ন্ত্রিত করা জরুরি। এ ছাড়া বই পড়া, গান শোনা, ঘুরতে যাওয়া, সাইক্লিং, আত্মীয়-বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো মন ভালো রাখে।
এ বিষয়ে একমত ডা. নাসির উদ্দিন আহমদও। তাঁর ভাষায়, যাপিত জীবনের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, কর্মজীবনের চাপ থেকে মুক্তি পেতে মাঝেমধ্যেই একঘেয়ে জীবন থেকে উড়াল দিতে হবে। বাইরে ঘুরতে হবে। আড্ডা দিতে হবে বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-পরিজনের সঙ্গে।

তবে এটা ঠিক, সবসময় ভালো থাকা সম্ভব নয়। কাজের চাপ, পারিবারিক দায়িত্ব কিংবা ব্যক্তিগত নানা কারণে মন খারাপ হতেই পারে।
এমন সময় নিজের অনুভূতিকে অস্বীকার না করে তা গ্রহণ করুন। প্রিয় মানুষের সঙ্গে কথা বলুন, ডায়েরি লিখুন, গান শুনুন বা কিছুক্ষণ একা নিরিবিলি সময় কাটান। দীর্ঘদিন ধরে যদি উদ্বেগ, বিষণ্নতা বা অস্থিরতা অনুভব করেন, তাহলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে দ্বিধা করবেন না।

ডিজিটাল বিরতি
বর্তমান জীবনযাত্রায় মোবাইল ফোন আমাদের জীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু সারাক্ষণ স্ক্রিনে চোখ রাখলে মানসিক ক্লান্তি বাড়ে, মনোযোগ কমে যায়।
সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করার জন্য দিনের একটা সময় নির্দিষ্ট করুন। খাওয়ার সময় কিংবা পরিবারের সঙ্গে আড্ডার সময় মোবাইল দূরে রাখার চেষ্টা করুন। সপ্তাহে অন্তত একটা দিনে কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও মোবাইল ফোনের স্ক্রিন থেকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করুন এবং অফলাইন কার্যকলাপে অংশগ্রহণ করুন। বাগানে গাছের যত্ন নিন কিংবা যে কোনো সৃষ্টিশীল কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখুন। স্টাইলিশ জামাকাপড় পরুন, মন চাইলে সাজুন, শপিং করুন এবং অবসর সময়ে নিজের ত্বক ও চুলের যত্ন নিন। যদি কোনো কাজ না থাকে, তাহলে একটু বেশি সময় নিয়ে ঘুমান। 

নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল হোন
সব সময় নিখুঁত হওয়া সম্ভব নয়। ভুল হলে নিজেকে ক্ষমা করুন। নিজের সীমাবদ্ধতাকে মেনে নিন। প্রয়োজন হলে ‘না’ বলতে শিখুন। মনে রাখবেন, নিজের যত্ন নেওয়া স্বার্থপরতা নয়; এটি সুস্থ থাকার চাবিকাঠি।
জীবনের ব্যস্ততা কখনোই শেষ হবে না। দায়িত্বও কমবে না। এ ব্যস্ততার মধ্যেই যদি প্রতিদিন নিজের জন্য কিছুটা সময় বের করা যায়, তাহলে শরীর থাকবে সুস্থ, মনও থাকবে প্রশান্ত। v

মডেল: মাইশা জাহান
ছবি: নাজমুল হোসাইন হিমেল

আরও পড়ুন

×