ছোট্ট মনের ভয় কাটাতে
ইসরাত জাহান
প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩১ | আপডেট: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১১:৫৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
শিশুর মন বড়দের মতো নয়। বড়দের কাছে যা সামান্য, তা-ই তার কাছে পাহাড়সম। অন্ধকার ঘর, বজ্রপাতের শব্দ, নতুন স্কুল কিংবা চিকিৎসকের কাছে যাওয়া–এসব নিয়ে ভয় পাওয়া শিশুদের জন্য একেবারে স্বাভাবিক ব্যাপার। তবে এ ভয় যখন দৈনন্দিন জীবনকে আটকে দেয় তখনই মা-বাবার ভূমিকা হয়ে ওঠে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
যেভাবে শিশুর ভয়কে জয় করবেন
আত্মনিয়ন্ত্রণের দক্ষতা
এখানে মূল বিষয়টি হলো ‘সেলফ-রেগুলেশন’ বা নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা। নিজের অনুভূতিকে বুঝে সেটিকে সুস্থভাবে সামলে নেওয়ার দক্ষতা তৈরি হলে শিশু অমূলক ভয় পাবে না। বড়রা অনেক সময় কোনো কিছুতে ভয় পেলে নিজেকে আশ্বস্ত করেন যে ভয়ের কিছু নেই। শিশুদের জন্য এ দক্ষতা গড়ে উঠতে সময়, অনুশীলন আর সুযোগ প্রয়োজন। তাই মা-বাবাকে সহনশীল হতে হবে।
ভয়কে অবহেলা নয়, স্বীকৃতি দিন
অনেক শিশু অন্ধকারে ভয় পায়। তখন অভিভাবক না বুঝে বলে ফেলেন, ‘এটি তো কিছুই না, এতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই!’ এতে শিশুর কোমল মনে খারাপ ভাবনা আসে, সে বুঝতে পারে, তার অনুভূতির কোনো মূল্য নেই। তা না করে বরং পাশে বসে বলুন, ‘আমি বুঝতে পারছি তোমার ভয় লাগছে, আমি আছি তোমার পাশে, তোমার বয়সে আমিও অন্ধকারকে ভয় পেতাম।’ এতে শিশু নিরাপদ বোধ করে।
অতিরিক্ত সান্ত্বনায় সাবধান
ভয় পাওয়া শিশুকে বারবার সেই পরিস্থিতি থেকে সরিয়ে নেওয়া হলে সে শিখে যায়, জিনিসটা সত্যিই বিপজ্জনক আর এড়িয়ে চলা একমাত্র সমাধান। বিশেষজ্ঞরা বলেন, ভয়ের বিষয় এড়িয়ে চলা নয়, বরং ধীরে ধীরে তার মুখোমুখি হতে শেখানো আসল কাজ। সাময়িক কষ্ট হলেও দীর্ঘমেয়াদে শিশুর সাহস বাড়ে। তবে এমন কোনো বিপজ্জনক জিনিসে যদি শিশু বারবার ধরতে চায় যেমন সুইচ বোর্ড, কাঁচি, ছুরি–সে ক্ষেত্রে তাকে সরিয়ে নিতে পারবেন।
ধাপে ধাপে ভয় দূর করুন
শিশু অন্ধকারে ঘুমাতে ভয় পেলে প্রথমে হালকা নাইটল্যাম্প জ্বালিয়ে রাখুন। তারপর ধীরে ধীরে আলো কমিয়ে আনুন। কুকুরকে ভয় পেলে প্রথমে দূর থেকে দেখান; পরে কাছে গিয়ে দেখতে দিন। জোর করে হঠাৎ ভয় পায় এমন কোনো কিছুর মুখোমুখি করালে ভয় বরং বেড়ে যেতে পারে। তাই একটু সময় নিয়ে ধাপে ধাপে চেষ্টা করুন।
খোলামেলা প্রশ্ন করুন
আপনার রুমে একটি আলমারি আছে, অন্ধকারে সেটি আপনার সন্তানের কাছে দৈত্যের মতো মনে হয়, তারপর যদি সে ভয় পায়, তাহলে তাকে প্রশ্ন করুন, ‘আলো জ্বালালে কি আলমারির দৈত্যটা চলে যায়?’ কিংবা আপনার সন্তান যদি চিকিৎসকের কাছে যেতে ভয় পায়, তাহলে তাকে প্রশ্ন করুন, ‘চিকিৎসকের কাছে ঠিক কোন জিনিসটা দেখলে তোমার ভয় লাগে?’ অথবা আপনার সন্তান কুকুর, বিড়াল বা অন্য প্রাণীকে দেখে যদি ভয় পায়, তাহলে তাকে প্রশ্ন করুন, ‘এটা কি তোমাকে দেখে কখনও তেড়ে এসেছিল?’ এমন নির্দিষ্ট প্রশ্ন শিশুর মনের জট খুলতে সাহায্য করে। অনেক সময় দেখা যায়, ভয়ের পেছনে খুবই নির্দিষ্ট একটা কারণ লুকিয়ে থাকে; যা সমাধান করাও সহজ হয়ে যায়।
নিজে শান্ত থাকুন
শিশু যদি দেখে মা-বাবা নিজেই কোনো পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন, তাহলে সেও একই বার্তা পায়–ভয় পাওয়াটা স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। তাই সন্তানের সামনে শান্ত ও আত্মবিশ্বাসী থাকুন।
শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম শেখানোর চেষ্টা করুন
ভয় পেলে হৃৎস্পন্দন বেড়ে যায়, শ্বাস দ্রুত হয়। তাই শিশু ভয় পেলে তাকে সময় দিন। তার প্রিয় জায়গা বা প্রিয় খেলনা নিয়ে গল্প করুন। যখন সে একটু স্বাভাবিক হবে তখন তাকে বলবেন, ‘আস আমরা একটা নতুন খেলা শিখব। এটিকে বলে ব্যায়াম। আমি যেভাবে ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস নিচ্ছি এবং ছেড়ে দিচ্ছি তুমিও এটিই করবে। দেখবে তোমার ভালো লাগবে।’
কখন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেবেন
ভয়ের কারণে শিশু অসুস্থ হয়ে যাওয়া, চুপচাপ হয়ে যাওয়া, বুকে ধড়ফড় বা শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দিলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উত্তম। এটি সাধারণ শৈশবকালীন ভয়ের চেয়ে বেশি কিছু হতে পারে।
সন্তানের ভয় দূর করা মানে তাকে ভয়হীন করে তোলা নয়, বরং ভয়ের সঙ্গে কীভাবে মানিয়ে চলতে হয়, সেই শিক্ষা দেওয়া। ধৈর্য, সহানুভূতি আর ধারাবাহিক চেষ্টার মধ্য দিয়ে একটি শিশু নিজের ভেতরের সাহস খুঁজে পায়।
তথ্যসূত্র: চাইল্ড মাইন্ড ইনস্টিটিউট
মডেল: আবদুল্লা; ছবি: আফরোজা খানম
- বিষয় :
- শিশু