তারুণ্য ধরে রাখবে খাবার
ত্বকের তারুণ্য ধরে রাখতে পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে
ইসরাত জাহান ইফাত
প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
৩০-এর পর অনেকের চোখের পাশে সূক্ষ্ম রেখা, ত্বকের শুষ্কতা, ঔজ্জ্বল্য কমে যাওয়া বা কালচে দাগের মতো পরিবর্তন চোখে পড়তে শুরু করে। তবে বয়স বাড়া মানে ত্বকের তারুণ্য দ্রুত হারিয়ে যাওয়া নয়। ত্বকের বার্ধক্য একটি স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া। বয়সের পাশাপাশি সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি, ধূমপান, অনিয়মিত ঘুম, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও কম শারীরিক পরিশ্রম ত্বকের বার্ধক্যকে দ্রুত দৃশ্যমান করতে পারে। বিশেষ করে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি অকাল ত্বক বার্ধক্যের অন্যতম প্রধান কারণ।
ত্বকের বার্ধক্য মূলত দুই ধরনের– অভ্যন্তরীণ বার্ধক্য, যা বয়স ও জেনেটিক্সের স্বাভাবিক প্রভাব এবং বাহ্যিক বার্ধক্য, যা পরিবেশ ও জীবনযাপনের কারণে ত্বরান্বিত হয়। এর অনেক কারণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তাই ৩০-এর পর ত্বকের যত্ন শুধু প্রসাধনীতে সীমাবদ্ধ না রেখে শুরু করুন ভেতর থেকে–খাবারের প্লেট থেকে।
বার্ধক্য রোধে তারুণ্য ধরে ত্বকের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান
পর্যাপ্ত প্রোটিন
ত্বকের কোলাজেন, ইলাস্টিনসহ বিভিন্ন গঠনগত প্রোটিন তৈরিতে অ্যামাইনো এসিড প্রয়োজন। তাই প্রতিদিনের খাবারে পর্যাপ্ত প্রোটিন থাকা জরুরি।
উৎস: ডিম, মাছ, মুরগি, বিভিন্ন ডাল, ছোলা, টক দই, দুধ, ছানা, পনির, মাংস।
ভিটামিন-সি
ভিটামিন-সি কোলাজেন তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কোষকে অক্সিডেটিভ ক্ষতি থেকে সুরক্ষায় সহায়তা করে।
উৎস: আমলকী, পেয়ারা, লেবু, কমলা, মাল্টা, জাম্বুরা, আমড়া, কাঁচামরিচ, টমেটো ও বিভিন্ন রঙের সবজি।
ভিটামিন-এ ও ক্যারোটিনয়েড
ত্বকের স্বাভাবিক কোষীয় কার্যক্রম ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ। তবে ভিটামিন-এর উচ্চ ডোজ সাপ্লিমেন্ট নিজের ইচ্ছায় গ্রহণ করা উচিত নয়। খাবার থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি।
উৎস: গাজর, মিষ্টিকুমড়া, পালংশাক, লালশাক, পাকা পেঁপে, মিষ্টি আলু ও কলিজা।
ভিটামিন-ই
শরীরের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
উৎস: বাদাম, চিনাবাদাম, তিল, সূর্যমুখীর বীজ ও উদ্ভিজ্জ তেল। তবে বাদাম ও বীজ পরিমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত–এক দিনে ২৫ গ্রামের বেশি নয়।
ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড
ত্বকের স্বাভাবিক সুরক্ষা স্তর বা ব্যারিয়ার বজায় রাখতে সহায়ক। পাশাপাশি সামগ্রিক হৃৎস্বাস্থ্য ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী।
উৎস: ইলিশসহ তৈলাক্ত মাছ, সামুদ্রিক মাছ, পুঁটি ও পাবদা মাছ, আখরোট ও কিছু চিয়া সিড তিসি বীজ।
জিঙ্ক, সেলেনিয়ামসহ অন্যান্য খনিজ
ত্বকের স্বাভাবিক মেরামত ও বিভিন্ন এনজাইমেটিক প্রসেসের জৈবিক কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয়।
উৎস: মাছ, ডিম, টক দই, দুধ, ছানা, পনির, মাংস, ডাল, বিভিন্ন বাদাম ও বীজ।
তাই কোনো একটি ‘সুপারফুড’-এর ওপর নির্ভর না করে বৈচিত্র্যময় ও সুষম খাবার খাওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কোন খাবারগুলো কমানো উচিত
একটি নির্দিষ্ট খাবার খেলে ত্বক দ্রুত বুড়িয়ে যায় না। তবে দীর্ঘদিন ধরে শরীরে ইনফ্লামেশন বাড়ায় অতিরিক্ত চিনি, মিষ্টি, কেক-পেস্ট্রি, মিষ্টি পানীয়, রিফাইন্ড শর্করা, কমার্শিয়ালি প্রোসেসড খাবার, অতিরিক্ত ভাজাপোড়া ও ট্রান্স ফ্যাটযুক্ত খাবার খাওয়া স্বাস্থ্যকর নয়, এতে ত্বক দ্রুত বুড়িয়ে যায়। অতিরিক্ত চিনি ও পরিশোধিত শর্করা শরীরে এমন কিছু জৈবিক প্রক্রিয়াকে গ্লাইকেশন বাড়িয়ে দেয়; যা কোলাজেন ও অন্যান্য প্রোটিনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে ও এতে ত্বক দ্রুত বুড়িয়ে যায়।
ত্বকের সবচেয়ে বড় শত্রু সূর্যের
অতিবেগুনি রশ্মি
অকাল ত্বক বার্ধক্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ অতিরিক্ত অতিবেগুনি রশ্মির সংস্পর্শ। এটি কোলাজেন ও ইলাস্টিনের ক্ষতি করে বলিরেখা, কালচে দাগ ও অসম ত্বকের রং বাড়াতে পারে। তাই নিয়মিত এসপিএফ ৩০ বা তার বেশি সানস্ক্রিন, ছাতা, টুপি ও প্রয়োজন অনুযায়ী শরীর ঢেকে রাখার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
ঘুম, ব্যায়াম ও মানসিক চাপও গুরুত্বপূর্ণ
শুধু ভালো খাবার খেলে হবে না। রাত ১১টা থেকে গভীর ও পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং ধূমপান-মদপান থেকে দূরে থাকা সুস্থ ত্বক ও সামগ্রিক সুস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
৩০-এর পর সহজ ‘ত্বকবান্ধব প্লেট’
অর্ধেক: বিভিন্ন রঙের শাকসবজি ও সালাদ।
এক-চতুর্থাংশ: মাছ, ডিম, মুরগি বা ডালজাতীয় প্রোটিন।
এক-চতুর্থাংশ: পরিমিত ভাত, লাল চাল বা আটার রুটি বা মিষ্টি ফল।
সঙ্গে: একটি মৌসুমি টক ফল এবং পরিমিত বাদাম বা বীজ।
ত্বকের তারুণ্য ধরে রাখার নির্দিষ্ট কোনো জাদুকরী খাবার নেই। সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো–সুষম ও পুষ্টিকর খাবার, পর্যাপ্ত প্রোটিন, ফল-সবজি, স্বাস্থ্যকর চর্বি, পর্যাপ্ত পানি, নিয়মিত ব্যায়াম, ভালো ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ, ধূমপান এড়িয়ে চলা এবং নিয়মিত সূর্য সুরক্ষা।
সিনিয়র ক্লিনিক্যাল ডায়েটিশিয়ান, ডা. লিনাস স্কিন অ্যান্ড এস্থেটিক, ধানমন্ডি, ঢাকা
- বিষয় :
- খাবার