ঢাকা মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

খাগড়াছড়ির অচেনা ট্রেইলে

খাগড়াছড়ির অচেনা ট্রেইলে
×
×

পাহাড়ি পথে একটু অসাবধান হলে গর্তে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে

মুহাম্মদ জাভেদ হাকিম

প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৪৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

দীর্ঘ ছুটি মানেই ঘোরাঘুরি। সেই ঘোরাঘুরির অংশ হতেই দে-ছুট ভ্রমণ সংঘের দুর্বার দুরন্ত দামাল ভ্রমণবন্ধুরা; ছুটে যাই ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য লাগোয়া খাগড়াছড়ি জেলার তবলছড়ি। সারারাত বাস ভ্রমণ শেষে সকালে ডাকবাংলোয় নামতেই স্থানীয় ভ্রমণবান্ধব যুবক শাহজাহান আমাদের স্বাগত জানান। এরপর ২০ মিনিটের মতো হেঁটে পরিপাটি এক মাটির ঘরের সামনে হাজির হই। সঙ্গে থাকা ট্রাভেল ব্যাগগুলো ঘরের ভেতর গুছিয়ে রেখে বড় খুমের পথে বেরিয়ে পড়ি। তীব্র রোদে ইটের সলিংয়ের ওপর ঘণ্টাখানেক হেঁটে টিপরাপল্লির বড়পাড়া পৌঁছাই। স্থানীয় পাহাড়িদের জুম চাষের তরমুজ খেয়ে তৃষ্ণা মিটিয়ে সেগুন বনে ঢুকে পড়ি। বিশাল অরণ্য। শুরু এবার মূল হাইকিং-ট্র্যাকিং। কমবেশি প্রত্যেকের হাতে, কাঁধে ও মাথায় হাঁড়ি-পাতিল সমেত বাজার সদাই। 
হাঁটার সময় ঝরা পাতার মরমর শব্দ। পাতার স্তূপ জমে কোথাও কোথাও দুই-তিন ফুট উঁচু হয়ে আছে। সে এক ভিন্নরকম অনুভূতি। সেগুন পাতা মাড়িয়ে যেতে যেতে পা পড়ল ঝিরির জলে। তারই মাঝ বরাবর ছোট-বড় পাথুরে সারি। নয়নাভিরাম ঝিরি পথ। দুপাশে উঁচু উঁচু পাহাড়। সেই পাহাড়ে পাতাবিহীন দিগন্ত ছোঁয়া শত বছরের সেগুন বৃক্ষ। চোখেমুখে ঝিরির শীতল পানির ঝাপটা দিতেই ক্লান্তি উবে যায়। সামনেই খাড়া পাহাড়। সঙ্গে নেই প্রশিক্ষিত কোনো গাইড। তবে সঙ্গী ছিল সংগঠনের সবচেয়ে কষ্টসহিষ্ণু ভ্রমণবন্ধুরা। সামান্য সময়ের বিরতিতে কয়েকটি খেজুর, বিস্কুট পেটে পুরেই আবার ট্র্যাকিং শুরু। হাঁটুতে জোর না থাকলেও মনের সাহসে এগিয়ে যাই বীরের বেশে। প্রায় ঘণ্টা দুই হাইকিং-ট্র্যাকিং শেষে দেখা মিলে বড় খুম ঝরনার। এ যেন মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। প্রচণ্ড খরার মধ্যেও বড় খুম ঝরনার পানি প্রবহমান। রিমঝিম শব্দ তুলে অবিরাম ধারায়, ঝরনার পানি ছুটে চলে তার আপন গতিতে। পানি পড়তে পড়তে ঝরনার সামনে বিশালাকার গর্তের মতো সৃষ্টি হয়েছে। সে কারণেই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ত্রিপুরা অধিবাসীরা এটাকে বড় খুম বলে। খুম শব্দের অর্থ গর্ত। ঝরনার চারপাশের প্রকৃতি দারুণ। কিছুটা সময় সেখানে ফটোশুট চলল। সকাল গড়িয়ে ভরদুপুর। এবার গন্তব্য গলাচিপা খুম। 
গলাচিপার দিকে কিছুটা পথ আগাতেই সবার পেটে পড়ল টান। জুৎসই একটা জায়গা দেখে শুরু হলো রান্নার মহাযজ্ঞ। বনে গেল কেউ লাকড়ি কুড়াতে। কেউ গেল ঝিরিতে বিশুদ্ধ পানির খোঁজে। কেউবা আবার পাহাড় খুঁড়ে বানাল চুলা। আমার মতো অলস যারা তারা শুয়ে পড়লাম হ্যামোকে। আহ কী সুখ! ঈদের ভরপুর আনন্দ এ পাহাড়-জঙ্গল ভ্রমণেই। দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে চুলায়। অল্প সময়ের ব্যবধানেই ভাত-তরকারি রেডি। মুরগির রান্নার কী ঘ্রাণ। জঙ্গল থেকে কেটে আনা কলাপাতায় ভাত-তরকারি মেখে, খাওয়া চলল ধুমছে। পরম তৃপ্তির সঙ্গে খেয়েদেয়ে সবাই এক কাপ করে লাল চা পান করেই আবারও ছুটে চললাম গলাচিপা খুমের পথে। এবারের পথ যেন অব্যক্ত ছড়া কবিতা। কোথাও কেউ নেই। এতক্ষণ দু-একজন পাহাড়ির সঙ্গে দেখা হলেও এপাশটায় সেটাও হাওয়া। নৈঃশব্দ্য, নীরব, নিস্তব্ধ, নিরিবিলি প্রাকৃতিক পরিবেশেরও একটা নিজস্ব শব্দ রয়েছে; যা শুধু ওরকম জনমানবহীন গহিন পরিবেশে বুকের খুব গভীর হতে অনুভব করা যায়। এদিকটার ঝিরির পানিও বেশ স্বচ্ছ টলটলে। পথ চলতে চলতে সূর্যটা কিঞ্চিৎ হেলে পড়েছে। তাই আরেকটু গতি বাড়িয়ে পা চালাল সবাই। অবশেষে পৌঁছলাম গলাচিপা খুমের প্রান্তরে। এই জীবনে বহু খুম দেখেছি। কিন্তু গলাচিপার আকৃতিটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। অনেকটা ইংরেজি ‘এস’-এর মতো। দেখতে যেমনি নান্দনিক, তেমনি ভয়ানক আকৃতি ধারণ করে আছে। 
এবার পার হতে হবে বেশ কণ্টাকাকীর্ণ পথ। সামান্য ভুল হলেই সোজা খুমের গহ্বরে। আদতে পাহাড় ভ্রমণে এ রকম সংকুল পরিবেশ পরিস্থিতির মুখোমুখি না হলে মনের মধ্যে একটা উত্তেজনাপূর্ণ ভাব আসে না। এ রকম পরিস্থিতিই পাহাড়প্রেমীদের জন্য রোমাঞ্চকর অনুভূতির জন্ম দেয়। তাই আর দেরি না করে সাহস নিয়ে আগাই। পায়ের চাপে পাতা সরলেই দেখা যায় তলা ফাঁকা। সরু পথ। ধরার মতো তেমন শক্ত শিকড়-বাকড় নেই। তিন-চার ইঞ্চি পা এদিক-ওদিক হলেই গলাচিপার পেটে। প্রত্যেকে প্রত্যেকের তরে এই মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়ে এগিয়ে যাই। বিজয়ের একটা হাসি দিয়ে বুকভরা নিঃশ্বাস নিয়ে দেখি চারপাশের অবারিত প্রকৃতি। পুরোপুরি আদিমতা ভর করে আছে। প্রকৃতিই সাক্ষ্য দিচ্ছে এখনও সাধারণ পর্যটকদের, আগমন ঘটেনি গলাচিপা খুমের প্রান্তরে। ঝিরির শীতল পানিতে জলকেলিতে মেতে উঠি। পাহাড়ে সন্ধ্যা নামে আগে। তাই চটজলদি ফিরতি পথ ধরি। 
যেভাবে যাবেন
প্রথমে ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাঙা উপজেলার তবলছড়ির ডাকবাংলোয় যেতে হবে। সেখান থেকে গাইডের সহায়তায় যেতে হবে বড়পাড়া টিপরাপল্লি। 
খাবারদাবার
ট্র্যাকিংয়ের সময় শুকনা খাবার ও পানি রাখতে ভুলবেন না। 
ছবি: লেখক
 

আরও পড়ুন

×