মূল্যায়নের অভাবে যখন মন ভাঙে
রোজী আরেফিন
প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৫৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
আমরা অনেক সময় ভাবি, দায়িত্ব পালন তো করতেই হবে তাই আলাদা করে অন্যের প্রশংসা করার কী আছে? কিন্তু বাস্তবে একটি আন্তরিক ধন্যবাদ, সামান্য প্রশংসা অনেক সময় সারাদিনের ক্লান্তি দূর করে তাকে নতুন শক্তি এনে দেয়। অন্যদিকে দীর্ঘদিন পরিশ্রম করার পরও যদি কোনো মূল্যায়ন না পাওয়া যায়, ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস, আগ্রহ ও সম্পর্কের মায়াও কমে যায়।
সংসারের কাজে যাঁর অবদান, তাঁর স্বীকৃতি কোথায়?
একজন গৃহিণীর দিনের কাজের হিসাব করলে দেখা যায়, পরিবারের অন্যরা ঘুম থেকে ওঠার আগেই তাঁর দিন শুরু হয়ে যায়। পরিবারের সবার প্রয়োজন মেটাতে তাঁকে কত কাজ করতে হয়, তার কোনো শেষ নেই। কিন্তু দিনশেষে তাঁর কাজগুলো অনেক সময় শুধু দায়িত্ব হিসেবেই দেখা হয়। কেউ হয়তো বলে বসেন, ‘সারাদিন বাসায় থেকে করোটা কী?’ কথাটি সাধারণ মনে হলেও, যিনি সারাদিন কাজ করেছেন, তাঁর কাছে এটি খুব কষ্টের হতে পারে।
কর্মক্ষেত্রে পরিশ্রম করেও যখন অন্যের নামে কৃতিত্ব যায়
ধরুন, একজন কর্মী অফিসের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প শেষ করতে দিনের পর দিন পরিশ্রম করলেন। অথচ প্রকল্পটি সফল হওয়ার পর সভায় তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পুরো কৃতিত্ব দিলেন অন্য একজনকে। যিনি মূল কাজটি করেছেন, তাঁর নাম পর্যন্ত বলা হলো না।
এমন পরিস্থিতিতে কষ্ট পাওয়া স্বাভাবিক। কারণ এখানে শুধু প্রশংসা না পাওয়ার বিষয় নেই; নিজের অবদানকে অস্বীকার করার কষ্টটাও আছে। প্রতিষ্ঠানের জন্যও এটি ভালো নয়। একজন দক্ষ কর্মীকে শুধু বেতন দিয়ে ধরে রাখা যায় না। তাঁর কাজের প্রতি সম্মান, ন্যায্য আচরণ এবং অবদানের স্বীকৃতিও দরকার।
সন্তানের ছোট সাফল্যও স্বীকৃতি দরকার
অনেক অভিভাবক সন্তানের ভালো ফলকে স্বাভাবিক ধরে নেন। পরীক্ষায় ভালো করলে বলেন, ‘এবার ভালো করেছ, পরেরবার আরও ভালো করতে হবে।’ কিন্তু ফল খারাপ হলে শুরু হয় তুলনা, বকাঝকা কিংবা অন্যের সন্তানের উদাহরণ। শিশুকে উৎসাহিত করার মানে তার প্রতিটি কাজকে নিখুঁত বলা নয়। বরং তার চেষ্টা, উন্নতি ও শেখার আগ্রহকে স্বীকৃতি দেওয়া। ভুল হলে তা ঠিক করে দেওয়ার পাশাপাশি তার অগ্রগতির কথাও বলা দরকার। এতে শিশু বুঝতে শেখে, ব্যর্থতা মানেই সে অযোগ্য নয় এবং চেষ্টা করারও মূল্য আছে।
সম্পর্কে ভালোবাসা থাকলেও স্বীকৃতির অভাব কষ্ট দেয়
অনেক সম্পর্কেই ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ থাকে, কিন্তু কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অভ্যাস থাকে না। স্বামী হয়তো পরিবারের খরচ চালাতে নিয়মিত পরিশ্রম করছেন, কিন্তু স্ত্রী কখনও তাঁর সেই চেষ্টার কথা বলেন না। আবার স্ত্রী হয়তো সংসার ও সন্তান সামলাতে নিজের অনেক ইচ্ছা ছেড়ে দিচ্ছেন, কিন্তু স্বামী মনে করেন, এসব তো সংসারের স্বাভাবিক দায়িত্ব।
এ ধরনের সমস্যা সব সময় ভালোবাসার অভাব থেকে তৈরি হয় না। অনেক সময় একে অপরের অবদানকে স্বাভাবিক ধরে নেওয়ার কারণেও এমন হয়।
অন্যের সঙ্গে তুলনা নয়
আমাদের সমাজে তুলনা করার প্রবণতা খুব পরিচিত। একজনের সাফল্য দেখিয়ে অন্যজনের চেষ্টা ছোট করে দেখা হয়। প্রতিবেশীর সন্তান ভালো ফল করেছে। তাই নিজের সন্তানকে কথা শুনতে হয়। সহকর্মী দ্রুত পদোন্নতি পেয়েছেন। তাই অন্যজনের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা যেন মূল্যহীন হয়ে যায়। সবার সাফল্যকে একই মাপকাঠিতে বিচার করা ঠিক নয়।
মূল্যায়নের অভাব কাটিয়ে ওঠার উপায়
অন্যের কাছ থেকে স্বীকৃতি পাওয়ার ইচ্ছা স্বাভাবিক। তবে নিজের পুরো আত্মবিশ্বাস যদি অন্যের প্রশংসার ওপর নির্ভর করে, তাহলে হতাশা আরও বাড়তে পারে। তাই নিজের কাজের মূল্য নিজেকেও বুঝতে হবে। কী শিখলাম, কতটা এগোলাম, কোন বাধা পেরোলাম– এসব বিষয় নিজের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ হওয়া দরকার। অন্য কেউ প্রশংসা না করলেও নিজের অর্জনকে ছোট করা উচিত নয়।
একই সঙ্গে বারবার অবমূল্যায়িত হলে চুপচাপ কষ্ট জমিয়ে না রেখে উপযুক্ত সময়ে নিজের অনুভূতি জানানো দরকার। কর্মক্ষেত্রে নিজের কাজের প্রমাণ রেখে দেওয়া, দায়িত্ব ও কৃতিত্বের বিষয়ে পরিষ্কারভাবে কথা বলা কিংবা প্রয়োজন হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে। পারিবারিক সম্পর্কেও অভিযোগ না করে নিজের কষ্টের জায়গাটি বোঝানোর চেষ্টা করা ভালো। v
- বিষয় :
- মানসিক স্বাস্থ্য