ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আমার সংগ্রামী বাবা

আমার সংগ্রামী বাবা
×

অলংকরণ:: ফাইয়াজ আহমেদ

হাফসা হিরা

প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৫১

| প্রিন্ট সংস্করণ

কিছু মানুষ আছেন, যাদের জীবন গল্প হয়ে ওঠে শব্দহীন চেষ্টায়। তারা ক্যামেরার সামনে আসেন না, মঞ্চে দাঁড়িয়ে কথা বলেন না; তবু তাদের ত্যাগেই গড়ে ওঠে অসংখ্য স্বপ্নের ভবিষ্যৎ। আনোয়ার হোসেন তেমনই একজন মানুষ। একজন বাবা, যার জীবনের প্রতিটি সকাল শুরু হয় সন্তানের কথা ভেবে আর প্রতিটি রাত শেষ হয় জীবন ও সংসারের নিঃশব্দ চিন্তার মধ্য দিয়ে।
তিনি ছোটবেলায় হারান তাঁর মাকে। মাতৃহীন শূন্যতায় কোনো আনন্দ ছিল না। ছিল না কোনো ভালোবাসা, আবদার কিংবা প্রাপ্তি। শৈশব ও কৈশোরের কোনো চাওয়াই পূর্ণ হয়নি তার। অথবা তিনি কোনো কিছুই চাওয়ার সাহস করেননি না পাওয়ার ভয়ে। অন্যদিকে মা-বাবার স্নেহের বদলে তাঁর জীবনে আসে দায়িত্ব আর বাস্তবতা। দাদা-দাদির কাছে বড় হওয়া সেই শিশুটি তখন থেকে বুঝে যায় পৃথিবীতে টিকে থাকতে হলে কষ্টকে বন্ধু করে নিতে হয়। তাই ছোট বয়স থেকে টুকটাক কাজ করে নিজের খরচ নিজেকে চালাতে হয় তাকে। ক্লান্ত শরীর আর অব্যক্ত কান্না নিয়ে কেটেছে তাঁর শৈশব ও কৈশোরের গুরুত্বপূর্ণ সময়।
সময়ের স্রোতে একদিন বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হন মিনার বেগমের সঙ্গে। শিক্ষায় খুব বেশি এগিয়ে না থাকলেও স্ত্রী মিনার জীবনকে বুঝতেন, জানতেন গভীরভাবে। দুজনের ভালোবাসায় পরিপূর্ণ ছোট সংসার। অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী, কিন্তু কখনও তাদের চোখে হতাশা স্থায়ী হয়ে বসতে পারেনি। কারণ তাদের সামনে ছিল একটাই স্বপ্ন–সন্তানরা যেন কষ্টের জীবনে না পড়ে। একে একে আসে তিনটি সন্তান। সন্তানের কান্নার সঙ্গে কাঁধে ভারী হয়ে ওঠে দায়িত্বের বোঝা। তিনি ঠিক করেন নিজের যত কষ্ট হোক সন্তানদের লেখাপড়া বন্ধ করবেন না। ইজিবাইক চালানোই হয়ে ওঠে তাঁর জীবিকার পথ। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, কখনও পেটের অসুখ নিয়েও তিনি রাস্তায় বের হয়েছেন–শুধু সন্তানের স্কুলের বেতন আর বইয়ের খরচ জোগাড় করার জন্য। দিনের পর দিন চলে তাদের জীবন-সংগ্রাম। সন্তানরা স্কুল পেরিয়েছে, কলেজ পেরিয়ে আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায়। প্রত্যেকেই সফলতার দ্বারপ্রান্তে।
একজন ইজিবাইক চালকের সংগ্রামী মানুষের সন্তানের এমন স্বপ্নের বাস্তবায়ন অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য। তবে এ অর্জনের পেছনে কোনো উচ্চপদ, জমি বা উত্তরাধিকার নেই। আছে শুধু একজন বাবার ঘামঝরা পরিশ্রম ও প্রতিজ্ঞা আর একজন মায়ের নীরব ত্যাগ। 
মিনার বেগম ঘরেই থাকেন। সংসার সামলান, সন্তানের চিন্তা করেন, স্বামীর ক্লান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে নীরবে শক্তি জোগান। স্বামীর কষ্ট কমাতে না পারলেও তাঁর পাশে থাকার প্রতিজ্ঞা কখনও ভাঙেনি।
শত প্রতিকূলতায়ও আনোয়ার হোসেন স্বপ্ন দেখা বন্ধ করেননি। একদিন তাঁর ছেলেমেয়েরা ভালো চাকরি করবে, সম্মানের সঙ্গে বাঁচবে। সেই দিনটা দেখার আশাতেই তাঁর এই নীরব যুদ্ধ। তিনি কোনো সংবাদ শিরোনাম নন কিন্তু দেশ দাঁড়িয়ে আছে এমন হাজারো বাবার ত্যাগ-পরিশ্রমে। এ গল্প শুধু একজন মানুষের নয়, একটি প্রজন্মের, সমাজের। এটি একটি নিঃশব্দ ভালোবাসার ইতিহাস। এটি আমার জীবনের গল্প, আমার মা-বাবার গল্প। তাদের মতো এমন মা-বাবার কারণেই আজও পৃথিবী টিকে আছে ভালোবাসার আর বিশ্বাসে। 
সুহৃদ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া 

আরও পড়ুন

×