ঢাকা রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

কদমগুচ্ছ চিঠি ও এক পশলা বৃষ্টি

কদমগুচ্ছ  চিঠি ও এক পশলা বৃষ্টি
×

চিত্রকর্ম:: সাফায়েত সাগর

এম আব্দুল হালীম বাচ্চু

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

আষাঢ়ের প্রথম বিকেলটায় আকাশটা যেন কারও অভিমানে নীল থেকে ধূসর হয়ে উঠেছিল। দূরের তালগাছগুলো মাথা নত করে দাঁড়িয়ে ছিল, যেন তারা বৃষ্টির আগমনের গোপন খবর জানে। লক্ষ্মীপুর গ্রামের শেষ প্রান্তে কদমগাছের ছায়ায় বসে ছিল রোদেলা।
রোদেলার বয়স খুব বেশি নয়, কিন্তু তার মনটা ছিল আকাশের মতো বিস্তৃত। সে বিশ্বাস করত, আষাঢ়ের বৃষ্টি শুধু মাটিকেই ভেজায় না, মানুষের মনের ভেতরেও নতুন স্বপ্নের বীজ বুনে দেয়।
সেদিন দুপুরে তার দাদু তাকে একটি পুরোনো কাঠের বাক্স দিয়েছিলেন। বাক্সটির গায়ে সময়ের ক্ষতচিহ্ন। খুলে দেখা গেল–ভেতরে একটি হলদে খাম। খামের ওপরে লেখা–‘যে আষাঢ়কে ভালোবাসে, তার জন্য।’
রোদেলার কৌতূহলের শেষ রইল না। সে খামটা খুলে দেখল, ভেতরে একটি চিঠি। কিন্তু আশ্চর্য! চিঠির পাতাটি একেবারে সাদা।
সে দৌড়ে দাদুর কাছে গিয়ে বলল, ‘দাদু, এখানে তো কিছুই লেখা নেই!’
দাদু মৃদু হেসে বললেন, ‘সব লেখা চোখে দেখা যায় না, কিছু লেখা হৃদয় দিয়ে পড়তে হয়।’
রোদেলা কিছুই বুঝল না। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল। হঠাৎ আকাশজুড়ে মেঘের গর্জন। মুহূর্তের মধ্যে শুরু হলো ঝুমবৃষ্টি। বৃষ্টির কয়েক ফোঁটা এসে পড়ল সেই সাদা কাগজের ওপর আর তখনই ঘটল বিস্ময়।
ধীরে ধীরে কাগজের বুকজুড়ে ফুটে উঠতে লাগল নীল রঙের অক্ষর–‘আষাঢ় আসে শুধু জল নিয়ে নয়, আসে স্মৃতি, আশা আর পুনর্জন্ম নিয়ে। শুকনো হৃদয়েও সে সবুজের গান শোনায়।’
রোদেলা বিস্ময়ে চিঠির দিকে তাকিয়ে রইল।
পরদিন থেকে তার মধ্যে অদ্ভুত পরিবর্তন দেখা গেল। সে প্রতিদিন বৃষ্টির শব্দ শুনত, মেঘের চলাফেরা দেখত, কাদামাখা পথে হাঁটত। আগে যে পথটিকে সে নোংরা ভাবত, এখন সেখানে সে খুঁজে পেত জীবনের গল্প।
একদিন বৃষ্টিভেজা সকালে সে দেখল, একটি ছোট্ট আমগাছের চারা কাদার ভেতর মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। চারপাশে জল, বাতাস, অনিশ্চয়তা– তবু সে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে।
রোদেলা হঠাৎ বুঝতে পারল, সেই নীল চিঠির আসল অর্থ কী।
জীবনও তো অনেকটা আষাঢ়ের মতো। কখনও মেঘে ঢেকে যায়, কখনও ঝড় আসে, কখনও পথ কাদায় ভরে ওঠে। তবু সেই পথেই জন্ম নেয় নতুন সবুজ, নতুন সম্ভাবনা।
কয়েক দিন পর দাদু তাকে জিজ্ঞেস করলেন– ‘চিঠিটা পড়তে পেরেছ?’
রোদেলা জানালার বাইরে ঝরতে থাকা বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল–‘হ্যাঁ দাদু, চিঠিটা শুধু কাগজে লেখা ছিল না। আষাঢ় নিজেই আমাকে তার বাকিটা পড়ে শুনিয়েছে।’
দাদু কিছু বললেন না। শুধু চোখের কোণে জমে থাকা আলোটুকু আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
দাদুর সেই নীরব প্রশান্তি রোদেলার ভেতরে এক গভীর বোধের জন্ম দিল। সে বুঝতে পারল, জীবনের প্রতিটি কঠিন বন্ধ্যা সময়ের পরেই এক পশলা বৃষ্টির মতো আশীর্বাদ নেমে আসে। 
বাইরে তখন বৃষ্টি পড়ছে। কদমফুলের গায়ে জল ঝিলমিল করছে। মনে হচ্ছিল, আষাঢ় যেন আকাশ থেকে আরেকটি নীল চিঠি পাঠিয়েছে পৃথিবীর উদ্দেশে–একটি চিঠি, যেখানে লেখা আছে, ‘প্রতিটি ঝড়ের পরেই জন্ম নেয় নতুন সবুজের গল্প।’ 
সুহৃদ, পাবনা

আরও পড়ুন

×