জীবনের গল্প
শেষ চিঠি
চিত্রকর্ম:: সাফায়েত সাগর
শেখ মোহাম্মদ আলী
প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
গ্রামের একেবারে শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো ডাকঘরটি অনেক বছর আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। দেয়ালের পলেস্তারা খসেছে, জানালার কাচ ভেঙে লাল রঙের ডাকবাক্সটিও মরিচা ধরে বাদামি হয়ে গেছে। তবু প্রতিদিন বিকেল ৪টায় একজন মানুষ ঠিকই সেখানে এসে বসেন। তিনি অবসরপ্রাপ্ত ডাকপিয়ন আবদুল করিম।
গ্রামের মানুষ তাঁকে দেখে মুচকি হেসে বলে, ‘চাচা, এখন আর চিঠির যুগ আছে নাকি? সবাই তো ফোনে কথা বলে।’
করিম শুধু হাসেন। উত্তর দেন না।
পঁচিশ বছর আগে একমাত্র ছেলে রাগ করে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিল। যাওয়ার সময় বলেছিল, ‘এক দিন আমি চিঠি লিখব।’ সেই প্রতিশ্রুতিটুকু করিমের বেঁচে থাকার কারণ হয়ে আছে।
এক বর্ষার বিকেলে হঠাৎ এক কিশোর দৌড়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ‘চাচা, আপনার নামে একটা খাম এসেছে!’
করিমের কাঁপা হাত খামটি খুলল। ভেতরে একটি সাদা কাগজ। মাত্র একটি বাক্য লেখা– ‘বাবা, ফিরতে দেরি হয়ে গেল। ক্ষমা করে দিও।’
নিচে কোনো নাম নেই। ঠিকানা নেই। ডাকঘরের সিলও নেই। করিম অনেকক্ষণ চিঠিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। চোখের কোণে জমে থাকা জল হাতের পিঠ দিয়ে মুছে আকাশের দিকে চেয়ে মৃদু স্বরে বললেন, ‘এতদিনে এলি, বাবা!’
পরদিন গ্রামের মানুষ দেখল, ডাকঘরের বারান্দায় তিনি নেই। রাতে ঘুমের মধ্যেই তিনি পৃথিবীর সব অপেক্ষা শেষ করে চলে গেছেন। আশ্চর্যের বিষয়, সেই রহস্যময় চিঠিটি আর কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না। কেউ কেউ বলল, করিম সঙ্গে করে নিয়ে গেছেন।
শুধু ভাঙা ডাকঘরের মরিচা ধরা ডাকবাক্সটি আজও যেন নীরবে বলে–কিছু চিঠি মানুষের হাতে পৌঁছায় না; পৌঁছায় শুধু হৃদয়ে।
সুহৃদ, ময়মনসিংহ
- বিষয় :
- সুহৃদ সমাবেশ