ঢাকা রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

ভুল সমীকরণ

ভুল সমীকরণ
×

এসএম সাথী

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

ছিপছিপে বৃষ্টিতে ভিজে পিচঢালা পথটা তখন চকচক করছে। ওভারব্রিজে উঠেই নিলয় তার বাইকের গতি বাড়িয়ে দিল। কিছুটা দূরে আলো-আঁধারির মধ্যে চোখে পড়ল–দুটি পুরুষের সঙ্গে একটি মেয়ে উচ্চস্বরে তর্ক করছে। পেশাগত সহজাত বুদ্ধি থেকেই নিলয় বুঝতে পারল, ডাল মে কুছ কালা হ্যায়! বাইক নিয়ে কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার পরও মেয়েটির কণ্ঠস্বর মাথায় বাড়ি খেতে লাগল। খুব চেনা চেনা ঠেকছে। চটজলদি বাইক ঘুরিয়ে যখন সে মেয়েটির কাছে পৌঁছাল, ততক্ষণে ছিনতাইকারীরা মেয়েটির বাইক নিয়ে চম্পট দিয়েছে। নিলয় ধাওয়া করতে চাইল, কিন্তু মেয়েটি তার হাত চেপে ধরে আটকে দিল।
মেয়েটির নাম রিমা। একটি বেসরকারি সংস্থায় (এনজিও) চাকরি করে। বাইকটি অফিসের। সেই রাতে রিমাকে হোস্টেলে পৌঁছে দিয়ে নিলয় যখন ফিরল, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। তাড়াহুড়ায় রিমার ফোন নম্বর নেওয়া হয়নি।
এরপর থেকেই নিলয়ের জীবনে এক অদ্ভুত ওলটপালট শুরু হলো। পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর নিলয় ইদানীং প্রচণ্ড ভুলোমন হয়ে উঠেছে। কোনো নারী সোর্স নিয়ে অভিযানে গেলেই সে ভুল করে সহকর্মীকে ‘রিমা’ বলে ডেকে বসে। এ নিয়ে পুলিশ ফাঁড়িতে সহকর্মীদের মধ্যে বেশ হাসাহাসিও হয়।
অবচেতন মন যে কতটা ভয়ানক, তা নিলয় টের পাচ্ছিল পদে পদে।
কদিন পরেই মৌরীর সঙ্গে পারিবারিকভাবে নিলয়ের বিয়ে হওয়ার কথা। মৌরী একটি বেসরকারি কলেজের রসায়নের শিক্ষক। ছুটির বিকেলগুলোয় তারা একসঙ্গে সময় কাটায়। কিন্তু সেখানেও বিপত্তি! মৌরীকেও সে মনের অজান্তে দু-একবার ‘রিমা’ বলে ডেকে ফেলেছে। মৌরী বারবার জানতে চেয়েছে, ‘কে এই রিমা? তোমার সঙ্গে তার কী সম্পর্ক?’ নিলয় হেসেই উড়িয়ে দিত। বলত–‘আরে, ও তো আমার এক মামলার আসামি!’ কিন্তু রসায়নের শিক্ষক মৌরী এই সমীকরণ মেলাতে পারল না। গত এক সপ্তাহ ধরে প্রতি রাতেই ফোনে তাদের তীব্র ঝগড়া হচ্ছে। নিলয় কোনোভাবেই বোঝাতে পারছে না, রিমা নামে বাস্তবে তার কেউ নেই। কিন্তু অবচেতন মন তো আর যুক্তি মানে না।
আজ সকালে নিলয়ের মেজাজটা চড়া। মৌরীদের বাসা থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে–এই বিয়ে আর হচ্ছে না। বাগদানের আংটিও ফেরত দিয়ে গেছেন মৌরীর সাংবাদিক মামা।
হতাশ মন নিয়ে থানায় ঢুকতেই এএসআই ফাইল এগিয়ে দিয়ে জানাল, ‘স্যার, এনজিওর সেই বাইক ছিনতাই মামলার আসামি ধরা পড়েছে। লকআপে আছে, আজই কোর্টে চালান দিতে হবে।’
নিলয় ফাইলটা হাতে নিতেই থমকে গেল। চোখের পাতা উল্টে সে চিৎকার করে উঠল, ‘চলুন, আসামিকে দেখব!’
লকআপের লোহার শিকের ওপাশে অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে যে মেয়েটি কাঁদছে, তার দুচোখে তখন সমুদ্রের নোনাজল। নিলয় চমকে গেল। শিকের সামনে গিয়ে চিৎকার করে বলে উঠল–‘রিমা! আমি সাক্ষ্য দেব, তোমারই বাইক ছিনতাই হয়েছে।’
নিলয়ের বুকের ভেতর তখন তোলপাড়। এতদিনে সে বুঝতে পারল, অবচেতনের যে ছায়াকে সে তাড়া করছিল, সে আসলে অন্য কেউ নয়–তার নিজেরই হৃত অনুভূতি, যা রিমার কান্নার আড়ালে লুকিয়ে ছিল। 
সুহৃদ, রংপুর

আরও পড়ুন

×