সেই ‘পরে’ আর আসেনি
শাহরিয়ার হাসান জয়
প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩২
| প্রিন্ট সংস্করণ
ডাক্তার সেদিন বলেছিলেন, সময় হয়তো আর বেশি নেই। কতটা নেই, সেটা স্পষ্ট করে তিনি বলেননি। ডাক্তারও হয়তো বা জানেন, মৃত্যুর সময় কখনোই ঘড়িতে মাপা যায় না। কখনও একটি বছর চোখের পলক ফেলার মতোই দ্রুত ফুরিয়ে আসে। কখনও আবার একটি রাতই হয়ে ওঠে গোটা একটি জীবন...। আজ হয়তো সেই রাত।
জানালার ধারে বসে আছি। বাইরে বৃষ্টি। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো জানালার কাচের গায়ে আছড়ে পড়ছে। ধীরে ধীরে গড়িয়ে নামছে। একটা সময় পর হারিয়ে যাচ্ছে। ঠিক যেন মানুষের মতোই– জন্মায়, কিছু পথ গড়ায়, তারপর অদৃশ্য।
টেবিলের ওপর রাখা ফোনটার দিকে তাকাই। এখনও সৌরভের নম্বর রয়েছে। সৌরভ আমার ছেলে। তিন বছর হলো তার সঙ্গে কথা হয় না।
তখন তার বয়স সাত। স্কুলের অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি করবে বলে কতদিন ধরে প্রস্তুতি নিয়েছিল। আমাকে বলেছিল–‘বাবা, তুমি কিন্তু আসবে।’ আমি কথা দিয়েছিলাম। সেদিনও অফিসে জরুরি কাজ ছিল। ভেবেছিলাম পরে যাব, কিন্তু যেতে পারিনি। অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গিয়েছিল। বাড়ি ফিরে দেখি সে ইউনিফর্ম পরে ঘুম। পাশে ছোট্ট একটা মেডেল।
ঘুম থেকে উঠে জিজ্ঞেস করেছিল–তুমি এসেছিলে?
আমি মিথ্যে বলেছিলাম, হ্যাঁ।
তারপর কত জন্মদিন, কত বিকেল, কত অপেক্ষা আমি ‘পরে’ বলে সরিয়ে রেখেছি। সেই ‘পরে’ একসময় এত বড় হয়ে গেল, আমাদের মধ্যে গোটা একটা জীবন দাঁড়িয়ে গেল।
তিন বছর আগে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে সৌরভ বলেছিল, ‘তুমি কোনোদিন আমাকে সময় দাওনি।’
আমি বলেছিলাম, ‘বাবা হওয়ার পর বুঝবি।’
তারপর লাইনটা কেটে গিয়েছিল। আমিও আর ফোন করিনি। ভেবেছিলাম, ছেলেমানুষ। রাগ কমলে নিজেই ফোন করবে। সেও হয়তো ভেবেছিল, বাবা নিজেই ডাকবে। তিন বছর কেটে গেছে এভাবেই...। অর্ণব তখন ছোট। একা ঘুমাতে ভয় পেত। আমার বুকে মাথা রেখে বলত, ‘বাবা, তুমি মরে যাবে না তো?’
আমি বলতাম, ‘বাবারা মরে না।’
সে বিশ্বাস করত। শিশুরা বাবার মিথ্যে কথাও বিশ্বাস করে।
বুকের ভেতর ব্যথা আগের চেয়ে তীব্র হলো। মনে হলো কেউ ভেতর থেকে ধীরে ধীরে শ্বাস কেড়ে নিচ্ছে।
কাঁপা হাতে ফোনটা তুলে নিলাম। নম্বরটা খুঁজতে হলো না। মুখস্থ।
কল করলাম। রিং হচ্ছে। একবার। দুবার। কেউ ধরল না। কেটে আবার দিলাম। প্রতিবার রিংটোন একটু করে দীর্ঘতর মনে হচ্ছে। সময় যেন নিজেই আমাকে শাস্তি দিচ্ছে।
হঠাৎ ফোনের স্ক্রিনে একটি বার্তা ভেসে উঠল– মিটিংয়ে আছি। পরে কল দিচ্ছি। ‘পরে’ শব্দটা দেখে বুকের ভেতর কেমন যেন অনুভব হলো। সারাজীবন তাকে আমি এই শব্দটাই দিয়েছি। পরে বলব, পরে যাব...। আজ সেই ‘পরে’ আমার কাছে ফিরে এসেছে।
এক অদ্ভুত নিয়তির বৃত্ত সম্পূর্ণ হলো। আমার দেওয়া সেই অবহেলাই আজ দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া এক বাবার শেষ সম্বলটুকু কেড়ে নিতে চাইছে। ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চলেছে। ফোনটা বুকে চেপে ধরলাম। শরীরটা ক্রমেই হিম হয়ে আসছে, কিন্তু ভেতরের অনুশোচনার আগুনটা বড্ড তপ্ত। চোখ বুজলেই ভেসে উঠছে সাত বছরের সেই ছোট্ট সৌরভের মুখটা। ভাঙা গলায় বিড়বিড় করলাম, “অভিমানী ছেলে আমার, এবারের ‘পরে’ শব্দটা যে অনন্তকালের রে...।”
হয়তো সৌরভ আবার কল করবে। আমি ধরতে পারব। হয়তো বলব–সৌরভ, আমি তোকে ভালোবাসি। ক্ষমা করে দিস তোর এই অপরাধী বাবাকে। হয়তো বা বলতে পারব না। ফোনের ওপার থেকে ভেসে আসা নীরবতাই কি তবে আমার শেষ শাস্তি?
জানালার ওপাশে আকাশটা ঝাপসা হয়ে আসছে। আকাশের দূরে কোথাও, অনেক দূরে একটি নক্ষত্র ধীরে ধীরে আলো হারাচ্ছে। ঘরের কোণে নিভে যাচ্ছে এক অলিখিত অপেক্ষার প্রদীপ।
হঠাৎ করেই হাতের মুঠোয় থাকা ফোনটা তীব্র শব্দে কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল সেই কাঙ্ক্ষিত নাম সৌরভ। কাঁপতে কাঁপতে রিসিভারটা কানের কাছে নিতেই ওপাশ থেকে কোনো কথা এলো না, শুধু এক ভারী, নিস্তব্ধ দীর্ঘশ্বাস ভেসে এলো। সেই নৈঃশব্দ্য যেন আমার বুকের সবটুকু অপরাধবোধকে এক নিমেষে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিল। চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া এক ফোঁটা জল স্ক্রিনের ‘পরে’ শব্দটাকে চিরতরে ধুয়ে দিল।
সুহৃদ, সিরাজগঞ্জ
- বিষয় :
- সুহৃদ সমাবেশ