অন্য আকাশের মেঘ
তটিনী তনু
প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
৪ ডিসেম্বর। সেদিনও এই একই রেজিস্ট্রি অফিসে বসেছিল মৃদু আর মেঘ। সাধারণত মানুষ কাগজের বিয়ে করে স্থায়ীভাবে সম্পর্কের সামাজিক স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য। কিন্তু অদ্ভুত হলেও সত্যি, মৃদু আর মেঘের ক্ষেত্রে সেই একই কাগজ একদিন হয়ে উঠবে মুক্তির দরজা–তখন কেউই ভাবেনি।
মৃদু ছিল অন্যরকম। রাত জেগে কবিতা লিখতে ভালোবাসত, হঠাৎ কোনো বিকেলে বৃষ্টিতে ভিজে রংতুলি হাতে ছবি আঁকত, পুরোনো গানের শব্দে হারিয়ে যেত। তার কাছে জীবন ছিল অনুভূতির রং আর শব্দের এক অদ্ভুত মিশ্রণ।
অন্যদিকে মেঘের কাছে জীবন ছিল অনেক সরল-নিয়মমাফিক, বাস্তব, হিসেবি। কবিতায় বিরক্তি আর মৃদুর আঁকিবুঁকি তার কাছে ছিল সময় নষ্ট করা। শুরুতে মৃদু ভেবেছিল ভালোবাসা থাকলে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু ধীরে সে বুঝল সব মানুষ একই আকাশে দাঁড়িয়ে থেকেও একই তারাগুলো দেখে না।
মৃদুর লেখা কবিতা মেঘ কখনও পড়েনি। রঙে ভরা ক্যানভাসের দিকে তাকিয়ে সে বলত– এসব দিয়ে কি সংসার চলে?
এই ছোট ছোট বাক্যই ধীরে ধীরে তাদের ভেতরের দূরত্বকে বড় করে তুলেছিল। তবুও সম্পর্কের অভ্যাসে, একে অপরকে ধরে রাখার অদ্ভুত তাড়নায় মাঝেমধ্যে শরীরে থেকে যেত কিছু আদুরে আঘাতের দাগ।
যেদিন মৃদু তাদের ডিভোর্স লেটারে সই করল, সেদিনও তার শরীরে মেঘের দেওয়া সেই দাগগুলো ছিল। কাঁধে হালকা লাল চিহ্ন, ঠোঁটের কোণে দাঁতের চাপ। সে বুঝেছে, এগুলো শুধু এক সম্পর্ককে জোর করে বাঁচিয়ে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা। সইয়ের পর মৃদু কাগজটা টেবিলে রেখে কিছুক্ষণ চুপ করে বসেছিল।
তার মনে হঠাৎই ফিরে এলো সেই ৪ ডিসেম্বরের দুপুর। সেদিনও ঠিক এমনই একটা কাগজে তারা সই করেছিল–মানুষ যেমন করে, সম্পর্ককে সমাজের কাছে বৈধ করার জন্য। কিন্তু আজ মৃদুর মনে হলো, হয়তো তাদের সেই বিয়েটা আসলে একটা ভুল বোঝাবুঝি ছিল। একজন শিল্পী ভেবেছিল বাস্তববাদী মানুষটাকে রঙের ভাষা শেখাবে আর বাস্তববাদী মানুষটা ভেবেছিল শিল্পী মেয়েটা তার হিসেবি পৃথিবীতে মানিয়ে নেবে। কিন্তু কেউই কারও পৃথিবীতে পুরোপুরি পৌঁছাতে পারেনি।
অফিস থেকে বের হয়ে মৃদু শেষবারের মতো দাগগুলো দেখল। বুঝল–সব ভালোবাসা ভাঙে না বিশ্বাসঘাতকতায়, কিছু ভাঙে শুধু এই কারণে–দুজন দুই রকম আকাশে জন্মায়। তখন শত চাওয়া থাকলেও আলাদা হয়ে যাওয়াটাই হয়তো সবচেয়ে সৎ সিদ্ধান্ত হয়ে ওঠে।
সুহৃদ, চট্টগ্রাম
- বিষয় :
- সুহৃদ সমাবেশ