ঢাকা রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

আষাঢ়ের জলছাপ

আষাঢ়ের জলছাপ
×

চিত্রকর্ম:: শেখ শাহাদ

শাহরিয়ার শাহাদাত 

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩০

| প্রিন্ট সংস্করণ

আষাঢ়ের দুপুর মানেই চারদিক নিঝুম, থমথমে। সেদিন সকাল থেকেই মেঘের গুরুগুরু ডাক আর একটানা ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টিতে চারপাশ কেমন যেন ঝাপসা হয়ে উঠেছিল। গ্রামের একদম শেষ মাথায় আমাদের এই পুরোনো চুনকাম খসে পড়া পৈতৃক বাড়ি। চারদিকে বাঁশঝাড় আর আমবাগানের ঘন অন্ধকার। শহরের যান্ত্রিকতা ছেড়ে সেবারই প্রথম একা এসেছিলাম এই বাড়িতে, তাও আবার ভর বর্ষায়। দুপুরের দিকে বৃষ্টির বেগ বাড়ল। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ একটা অদ্ভুত একঘেয়েমি তৈরি করছিল। আমি বারান্দার কাঠের ইজি চেয়ারটায় বসে একটা পুরোনো বই পড়ছিলাম। হঠাৎ চারপাশটা অস্বাভাবিক রকমের ঠান্ডা হয়ে গেল। বর্ষার স্যাঁতসেঁতে ঠান্ডার চেয়ে এই ঠান্ডাটা ছিল আলাদা, যেন একটা বরফশীতল স্রোত আচমকা আমার মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে গেল।
ঠিক তখনই শব্দটা শুনলাম। খসখস... খসখস...।
মনে হলো ঠিক আমার চেয়ারের পেছনে, ঘরের বন্ধ দরজার ওপাশে কেউ একজন ভিজে কাপড়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে। আমি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম। কেউ নেই। ভাবলাম মনের ভুল। আবার বইয়ে মন দেওয়ার চেষ্টা করলাম। এবার শুধু শব্দ নয়, একটা তীব্র গন্ধ নাকে এসে ধাক্কা দিল। পচা পুকুরের জল, শ্যাওলা আর অনেকদিন বন্ধ থাকা স্যাঁতসেঁতে ঘরের একটা মিশ্র গন্ধ। হঠাৎ বারান্দার কোণে রাখা পুরোনো আয়নাটার দিকে আমার নজর গেল। আয়নার কাচটা ঝাপসা হয়ে এসেছে। ভালো করে তাকাতেই আমার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। আয়নার প্রতিফলনে স্পষ্ট দেখতে পেলাম, আমার ঠিক পেছনে একটা অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে। একটা কুচকুচে কালো, দীর্ঘ ছায়ামূর্তি। তার মাথাটা অস্বাভাবিক রকমের বাঁকানো আর গা থেকে টপটপ করে জল ঝরছে। অথচ আমি পেছনে তাকিয়ে কাউকেই দেখতে পাচ্ছি না। ভয়ে আমার জিভ শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। চিৎকার করতে গেলাম। গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বেরোল না। শরীরটা যেন পাথরের মতো ভারী হয়ে গেছে, এক ইঞ্চি নড়ার ক্ষমতাও নেই। আষাঢ়ের দুপুরের সেই আবছা আলোয় আমি স্পষ্ট শুনলাম, আমার কানের খুব কাছে কেউ একজন অত্যন্ত ধীরলয়ে শ্বাস ফেলছে। সেই ফিসফিসে ঠান্ডা হাওয়া আমার ঘাড়ে এসে লাগছিল।
ফিসফিসিয়ে একটা কণ্ঠস্বর বলে উঠল, ভিজে গেছি... বড্ড শীত করছে...।
আমি চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেললাম। আমার দাদামশাইয়ের বলা একটা কথা মনে পড়ে গেল–ভয় পেলে ভয় তোমাকে গ্রাস করবে, সাহস ধরো। আমি মনে মনে সৃষ্টিকর্তার নাম জপতে লাগলাম। 
সব শক্তি দিয়ে নিজের জড়তা ভাঙার চেষ্টা করলাম। হঠাৎ একটা তীব্র বজ্রপাতের শব্দে পুরো বাড়িটা কেঁপে উঠল। সেই শব্দের ধাক্কাতেই যেন আমার শরীরের জড়তা কেটে গেল। আমি এক ঝটকায় চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পেছনে তাকালাম। কেউ নেই। আয়নার দিকে তাকালাম, সেখানেও শুধু আমারই ফ্যাকাশে মুখটা দেখা যাচ্ছে। মেঝেটার দিকে তাকাতেই আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল। ইজি চেয়ারটার ঠিক পেছনে, যেখানে কেউ ছিল না, সেখানে একজোড়া মানুষের পায়ের পাতার ছাপ। জল দিয়ে আঁকা, একদম টাটকা। সেই জলের ছাপগুলো ঘরের বন্ধ জানালার দিকে এগিয়ে গিয়ে মিলিয়ে গেছে। বাইরে তখনও আষাঢ়ের বৃষ্টি নেমেছে মরণ কামড়ের মতো কিন্তু ঘরের ভেতরের সেই হিমশীতল নীরবতা আমাকে বুঝিয়ে দিল, কিছু কিছু অভিজ্ঞতা কল্পনা নয়, বরং আষাঢ়ের মেঘের মতোই 
সত্যি। 
সুহৃদ, লক্ষ্মীপুর

আরও পড়ুন

×