সহিংসতা রোধে তারুণ্যের প্রত্যয়
পঞ্চগড় শহরের অনির্বাণ বিদ্যানিকেতন হল রুমে অনুষ্ঠিত কর্মশালা ও আলোচনা শেষে অংশগ্রহণকারীদের একাংশ
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩১
| প্রিন্ট সংস্করণ
নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা রুখতে শুধু আইন নয়; প্রয়োজন পারিবারিক শিক্ষা, নৈতিক মূল্যবোধ ও সমন্বিত সামাজিক প্রতিরোধ। এই বার্তা নিয়ে তরুণ প্রজন্মকে সচেতন ও সক্রিয় করে করতে ৩ ও ৫ জুলাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং পঞ্চগড়ে বিশেষ কর্মশালা ও আলোচনা সভার আয়োজন করে সমকাল সুহৃদ সমাবেশ
পঞ্চগড়
সফিকুল আলম
নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা শুধু একটি পরিবার বা ব্যক্তির সমস্যা নয়, এটি সমাজের সার্বিক উন্নয়ন ও মানবিক মূল্যবোধের জন্য বড় হুমকি। এই সহিংসতা প্রতিরোধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা, পারিবারিক শিক্ষা এবং তরুণ প্রজন্মের সক্রিয় অংশগ্রহণ। তারুণ্যের এমন প্রত্যয় নিয়েই পঞ্চগড়ে ‘নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ’ শীর্ষক দিনব্যাপী কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
রোববার সকালে জেলা শহরের অনির্বাণ বিদ্যানিকেতন হলরুমে সমকাল সুহৃদ সমাবেশের আয়োজনে এই কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। এতে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও সুহৃদরা অংশ নেন। কর্মশালায় সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোকপাতের পাশাপাশি হাতেকলমে আপৎকালীন জরুরি সেবা পাওয়ার পদ্ধতি দেখানো হয়।
অংশগ্রহণকারীরা এমন একটি সামাজিক বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণে নারী ও শিশুর জন্য একটি নিরাপদ সামাজিক বলয় গড়ে তোলার তাগিদ দেন। কর্মশালা শেষে অংশগ্রহণকারীরা নারী ও শিশুর প্রতি সব ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
কর্মশালায় বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) পঞ্চগড়ের সাধারণ সম্পাদক ও নজরুল পাঠাগার ভাষা ও বিতর্ক ক্লাবের আহ্বায়ক আজহারুল ইসলাম জুয়েলসহ অতিথি হিসেবে পঞ্চগড় টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিএম কলেজের সহযোগী অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, অনির্বাণ বিদ্যানিকেতনের অধ্যক্ষ মামুনুর রশিদ মামুন, সাংবাদিক লুৎফর রহমান, আত্মার বন্ধন ব্লাড ফাউন্ডেশনের সভাপতি মতিন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনায় অংশ নেন।
প্রধান আলোচকের বক্তব্যে আজহারুল ইসলাম জুয়েল বলেন, ‘আমাদের মনমানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হবে। রাষ্ট্র সুরক্ষার জন্য আইন করেছে। যেখানে সহিংসতার ঘটনা ঘটে, সেখানে আইনের আশ্রয় নিতে হবে। আসলে আমাদের সামাজিক নিরাপত্তাবলয় প্রস্তুত করে সেই বলয়ের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।’
লুৎফর রহমান বলেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারী বা শিশু সহিংসতার শিকার হয় কাছের মানুষের দ্বারা। কিছুদিন আগে শিশু রামিশা নির্যাতনের ঘটনা আমরা দেখেছি। তাকে হত্যাকারী তার প্রতিবেশী। এ ছাড়া একাকীত্ব নিয়ে সামাজিক সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। যৌথ পরিবার ভেঙে যাচ্ছে। অনেক পরিবারে গৃহপরিচারিকা শিশুর দেখাশোনার দায়িত্বে থাকছে। তাই সহিংসতা রোধে প্রয়োজন পারিবারিক বন্ধন। v
সমন্বয়ক সুহৃদ সমাবেশ, পঞ্চগড়
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
মুহাম্মাদ খালিদ
সব ধরনের সহিংসতা, খুন ও ধর্ষণের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আলোচনা সভা করেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সুহৃদ সমাবেশ। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে আয়োজিত কর্মসূচিতে সমাজে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা, মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং তা প্রতিরোধে নাগরিক সচেতনতার গুরুত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক ছিলেন প্রফেসর ড. আমিরুল ইসলাম কনক। তিনি বলেন, একটি সভ্য ও মানবিক সমাজ নির্মাণের জন্য কেবল আইনগত শাস্তির ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়, বরং মানুষের নৈতিক বোধ, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের বিকাশ নিশ্চিত করাও অত্যন্ত জরুরি। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং গণমাধ্যমকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারলেই সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর পরিবর্তন আনা সম্ভব।
সামাজিক সহিংসতা কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং এগুলো সমাজের নৈতিক অবক্ষয়, মূল্যবোধের সংকট এবং মানবিক চেতনার দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। তাই কেবল শাস্তিমূলক ব্যবস্থার পরিবর্তে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পুনর্গঠনের মধ্য দিয়েই দীর্ঘমেয়াদে একটি নিরাপদ ও সহনশীল সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
পাঠচক্রে বক্তারা জানান, সব সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি, মানবিক শিক্ষা এবং পারস্পরিক সহমর্মিতার সংস্কৃতি বিকাশ অপরিহার্য। আলোচনায় সামাজিক সহিংসতা প্রতিরোধে রাষ্ট্র, সমাজ এবং ব্যক্তি পর্যায়ের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মত দেন বক্তারা। তারা আরও বলেন, আইনের যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং সামাজিক সংলাপকে জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে নারী, শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার মৌলিক পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
পাঠচক্রে অংশগ্রহণকারীরা সব ধরনের সহিংসতা, খুন ও ধর্ষণের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান এবং মানবিক মূল্যবোধ, ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় ভূমিকা পালনের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
সচেতন নাগরিক সমাজই পারে সহিংসতার অন্ধকারকে প্রতিহত করে মানবিকতা, সহমর্মিতা ও ন্যায়বোধের আলোয় আলোকিত একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে– এ জন্য সুহৃদসহ সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বানের মধ্য দিয়ে শেষ হয় আলোচনা।
সাধারণ সম্পাদক
সুহৃদ সমাবেশ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- সুহৃদ সমাবেশ