জানালার ওপাশে শূন্যতার কোলাহল
ফাতেমা তুজ তোয়া
প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩০
| প্রিন্ট সংস্করণ
জানালার গ্রিল গলিয়ে এক ফালি কাঁচা সোনা রোদ এসে পড়েছে আমার পড়ার টেবিলে। সকালের এই রোদের একটা অদ্ভুত ক্ষমতা আছে। মন খারাপের মেঘগুলোকে এক নিমেষে তাড়িয়ে দিতে পারে। আমি আরাফাত। প্রতিদিনের মতো আজও এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা হাতে জানালার ঠিক ধারটিতে এসে বসেছি। বাইরে নিমের ডালে দুটো চড়ুইয়ের খুনশুটি চলছে। চারপাশটা কেমন স্নিগ্ধ, শান্ত। কিন্তু এই শান্ত সকালের পেছনে লুকিয়ে থাকে আমাদের প্রত্যেকের ভেতরে চলা এক একটা অশান্ত ঝড়। মাঝেমধ্যে জানালার বাইরে তাকিয়ে আমার মনে হয়, আমাদের সবার জীবনটা আসলে কতটা এক রকম, তাই না? নাম আলাদা, চেনা মুখগুলো আলাদা, কিন্তু ভেতরের গল্পগুলো অবিকল এক। আমরা প্রত্যেকেই জীবনের কোনো না কোনো মোড়ে এসে খুবই একাকিত্বে ভুগি। হাজারটা মানুষের ভিড়ে থেকেও মনে হয়–‘আমাকে বোঝার মতো কেউ নেই।’ এই শূন্যতা আমার, আপনার, এই শহরের ফুটপাতে হেঁটে যাওয়া ওই চশমা পরা তরুণটির–সবার। টেবিলের ওপর রাখা চায়ের কাপে চুমুক দিতে গিয়ে মনে হলো, আমরা সবাই একটা মরীচিকার পেছনে ছুটছি। একটা ভালো চাকরি, একটু বেশি টাকা, একটু সামাজিক স্বীকৃতি। অথচ এই ছোটাছুটির মধ্যে কখন যে আমরা নিজেদের অজান্তেই হারিয়ে ফেলি ছোট ছোট আনন্দ। শৈশবের সেই কাগজের নৌকা বানানো কিংবা বৃষ্টিতে ভেজার সরল আনন্দ–এসব তো আমরা সবাই কোনো এক বয়সে এসে বিসর্জন দিয়েছি। এখানেও আমরা সবাই বড্ড একা। সবচেয়ে অদ্ভুত মিলটা কোথায় জানেন? আমাদের প্রত্যেকের বুকেই একটা গোপন ক্ষত আছে। একটা অপূর্ণ প্রেম, একটা হারিয়ে যাওয়া বন্ধু কিংবা কোনো এক বিরাট ভুলের অনুশোচনা।
আমরা দিনের আলোয় হাসিমুখে ঘুরে বেড়াই, যেন খুব সুখে আছি। কিন্তু রাতের অন্ধকার নামলেই সেই ক্ষতগুলো নতুন করে রক্তক্ষরণ শুরু করে। বালিশের কোণে জমা জলবিন্দুটার গল্প সবার জীবনেই কোনো না কোনো পাতায় লেখা আছে। সবাই আসলে এক একটা চলন্ত উপন্যাস। কারও ভূমিকার পাতা চলছে, কারও মাঝখানের টানাপোড়েন আর কেউ হয়তো শেষের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। চায়ের কাপটা ততক্ষণে জুড়িয়ে এসেছে। জানালার রোদ ঘরের আরও ভেতরে চলে এসেছে এখন। আমার মনে হলো, জীবনের এ মিলগুলোই বোধহয় আমাদের একে অপরের সঙ্গে বেঁধে রাখে। আমরা কেউ একা নই। আমার যে কষ্ট, যে একাকিত্ব, তা এই পৃথিবীর অন্য প্রান্তের আরেকজন মানুষেরও। দিনের আলো পুরোপুরি ফুটে উঠেছে। যান্ত্রিক শহরের চাকা ঘুরতে শুরু করেছে। আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানালা থেকে উঠলাম। আজকেও লড়তে হবে, বাঁচতে হবে। কারণ আমরা যতই ভেঙে পড়ি না কেন, দিনশেষে এক বুক আশা নিয়ে পরদিনের ভোরের রোদের জন্য অপেক্ষা করাটাও আমাদের প্রত্যেকের জীবনের সবচেয়ে বড় মিল। এই নিস্প্রাণ শহরে হাজারো মানুষের ভিড়ে আমরা কী একা না এক সুতোয় বাঁধা এক অলিখিত বেদনার সহযাত্রী।
সুহৃদ, রাজবাড়ী
- বিষয় :
- সুহৃদ সমাবেশ