ঢাকা রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

ধোঁয়ার বিনিময়ে কলম

ধোঁয়ার বিনিময়ে কলম
×

চিত্রকর্ম:: শেখ শাহাদ

ফয়েজ হাবীব

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩১

| প্রিন্ট সংস্করণ

আগের দিনের দুপুরে রান্না করা ভাত খেয়ে বাড়ি থেকে বের হবে হাফিজ। সে বাড়ি থেকে খুব সকালে বের হয়। কপালে আজও পানিপান্তা-নুন।  
প্রতিদিন বাজারে যাওয়ার আগে স্ত্রী মনোয়ারাকে জিগ্যেস করে কী কী বাজার লাগবে?
আজ হাফিজের মনটা ভালো নয়। মন ভালো না থাকার কারণটা হলো তার বুকপকেট। শরীর থেকে নোনাবিন্দু ঝরিয়ে টাকাগুলো বুক পকেটে রাখে। বুকভরা দুঃখ আছে–বুকপকেটে পাঁচটি টাকাও নেই! বাজারে যাওয়ার জন্য জামা গায়ে জড়ায় সে। বাবার শুকনো মুখটার দিকে তাকিয়ে তার মেয়ে বলল–‘আব্বা আমার জন্য একটা কলম আনবা।’
মেয়েটা ক্লাস থ্রিতে পড়ে। সাদিকা নামের তার মেয়েটাকে হাফিজ খুব ভালোবাসে। মেয়ের বইখাতাগুলোর দিকে তাকিয়ে নাভিশ্বাস ছেড়ে বের হয় হাফিজ। আজকাল সুইস চাপার যুগ।
কিছু দূরের লোকজন অটোভ্যানে চড়ে বাজারে আসে। হাফিজের বাড়ি দূরে হলেও বাজারে হেঁটে আসে। চায়ের আড্ডায় সহজে বসে না সে। কিছুদিন আগে চা-স্টলে বসে লজ্জা পেয়েছে হাফিজ। গেদুর দোকানে এখনও ১১ টাকা বাকি আছে। দোকানের সামনে এসে গেদু মিয়া দোকানে নেই ভেবে দ্রুত দোকান অতিক্রম করে যায় সে। 
দুঃখী পয়সাহীন মানুষগুলো কোথাও বসতে সাহস করে না।
হাফিজ হাঁটতে হাঁটতে চলে আসে এনামুলের দোকানের সামনে। দুঃখের ভারে আনমনে বেঞ্চিতে বসে পড়ে সে।  হাফিজের মুখ দেখেই মনের অবস্থা বলে দেওয়ার মতো। কিছু না নিতে পারুক পিচ্ছিটার জন্য একটা কলম নিতে হবে! অন্তত ওর মুখের হাসিটা দেখে একটু হাসির ভান করা যাবে। 
ভাবনাগুলো কামড়িয়ে খাচ্ছে। হাফিজ জানে কলম সম্মানী সম্পদ। পাঁচ টাকার একটা কলম বাকি চাইতে সাহস বাড়ছে তার। দোকানের সামনে বসে আছে হাফিজ। তার চোখ কলম-খাতা-পেন্সিলের তাকে। হঠাৎ পেছন থেকে কে যেন ডাক দেয়। হাফিজ! আরে হাফিজ না!
মলিনমুখে ফিরে দেখে তার বন্ধু বোরহানকে।
–‘কিরে এইবা বইয়া রইছস কে? অসুখ নাহি তর!’ 
‘এইতা কিছু না’ জবাব দেয় হাফিজ। কুশল বিনিময় হয় বন্ধুর সঙ্গে বন্ধুর।  
বোরহান তার কাজের বন্ধু। একসঙ্গে রাজমিস্ত্রির কাজ করেছে। বোরহান এক প্যাকেট সিগারেট কিনে এনামুলের দোকান থেকে। একেকটা সিগারেট পাঁচ টাকা দাম। হাফিজের মনের কষ্ট আরও বেড়ে যায়। কোথায় পোড়া ধোঁয়া আর কোথায় কলমের পবিত্র কালি। সে টাকা দিয়ে ছাই কিনল কিন্তু হাফিজ পারল না একটা কলম কিনতে!
বোরহান সিগারেট একটা মুখে নিয়ে আরেকটা হাফিজকে দেয়। সিগারেট পেয়ে কেন যেন হাফিজ দারুণ খুশি। বোরহান চলে যায়। দোকানে এখনও লোকজনের ভিড়। একজন একজন করে চলে যায় সবাই। এবার হাফিজ সামনে আসে দোকানির। বন্ধুর দেওয়া সেই তাজা সিগারেট হাতেই। কষ্ট লুকিয়ে দোকানদারেকে বলে–‘ভাই, এই সিগারেটটা নিয়া এর বদলি আমারে একটা কলম দেইন।’ 
দোকানি ডান হাতে কলম দিয়ে বাম হাতে সিগারেট নিয়ে ফ্যালফ্যাল করে হাফিজের মুখে তাকিয়েই থাকে…। 
সুহৃদ, ময়মনসিংহ 

আরও পড়ুন

×