ঢাকা মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

জয়া চাকমার গল্প

জয়া চাকমার গল্প
×

জয়া চাকমা

 দ্রোহী তারা

প্রকাশ: ১৬ নভেম্বর ২০২৪ | ২৩:২৩ | আপডেট: ১৭ নভেম্বর ২০২৪ | ১২:১২

‘আমি এমন একটি টেকনিক্যাল কাজের সঙ্গে যুক্ত, যেখানে আমি ছেলেদের ম্যাচেও বাঁশি বাজাতে পারি, মেয়েদের ম্যাচেও বাঁশি বাজাতে পারি। আমার কাছে কোনো ভেদাভেদ থাকে না ম্যাচের সময়। নিজেকে খুবই আত্মবিশ্বাসী লাগে তখন। তখনই সমতার জায়গাটা অনুভব করি আমি খুব বেশি করে।’ কথাগুলো জয়া চাকমার। লিঙ্গের ভেদে যিনি নারী। ফুটবল মাঠে রেফারির মতো এক জটিল ও চ্যালেঞ্জিং ভূমিকা সফলভাবে পালন করে ক্রীড়াজগতে নিজের আলাদা পরিচিতি গড়েছেন পাহাড়ি অঞ্চল থেকে উঠে আসা এ সংগ্রামী নারী। 

জয়া চাকমার এ জয়যাত্রা একেবারেই সহজ ছিল না। তাঁর জন্ম রাঙামাটির দক্ষিণ কালিন্দীপুরে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মধ্যে বেড়ে ওঠা জয়ার শৈশব ছিল কষ্ট ও সংগ্রামের। পাহাড়ি অঞ্চলে অবকাঠামোর অভাব, শিক্ষা ও খেলাধুলার সুযোগ সীমিত ছিল। পরিবার তাঁকে পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের পায়ে দাঁড়ানোর মতো শিক্ষাদীক্ষা দিতে চেয়েছিল। কিন্তু ছোটকাল থেকেই ফুটবলের প্রতি জয়ার গভীর আগ্রহ তাঁকে ভিন্ন পথে নিয়ে যেতে শুরু করে। গ্রামের মাঠে ছেলেদের সঙ্গে ফুটবল খেলতে গিয়ে শোনা সমালোচনা তাঁকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। জয়া মনে করতেন, একজন নারী কেন শুধু সমাজের চিরাচরিত ধারণার মধ্যে আটকে থাকবে? তাই এই ‘কেন’ প্রশ্নের উত্তর খোঁজাই আজ তাঁকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে খ্যাতি এনে দিয়েছে। 

জয়া প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করেন রাঙামাটিতে। পরে উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় আসেন এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে ভর্তি হন। ইট-পাথরের এ ব্যস্ত নগরজীবনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি তিনি ফুটবলের দক্ষতা আরও উন্নত করার চেষ্টা চালিয়ে যান। তবে পেশাদার ফুটবলার হওয়ার স্বপ্নের পথে সমাজ এবং ক্রীড়াঙ্গনের পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব তাঁকে নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে। এ সময় তাঁর নতুন লক্ষ্য হয়ে ওঠে– ফুটবলার নয়; বরং রেফারি হয়ে ফুটবলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবেন। 

বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) অধীনে রেফারিং কোর্সে অংশ নেন তিনি। রেফারি হিসেবে নিজের দক্ষতা প্রমাণ করতে এবং শারীরিক ফিটনেস ধরে রাখতে তাঁকে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। জয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী হিসেবে ফিফা রেফারি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হন। এ অর্জন তাঁকে দেশজুড়ে পরিচিতি এনে দেয়। তিনি প্রমাণ করেন, নারীরা শুধু খেলোয়াড় নয়, মাঠের নিয়ম-শৃঙ্খলা বজায় রাখার দায়িত্বেও সমানভাবে পারদর্শী। 

জীবন-সংগ্রামের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জয়া চাকমা বলেন, ‘২০১০ সালের রেফারিং কোর্সে অংশগ্রহণ করি। রেফারি হই ফুটবল ফেডারেশনের। তখন পর্যন্ত আমি ন্যাশনাল টিমের প্লেয়ার ছিলাম। স্বাভাবিকভাবেই যেহেতু খেলোয়াড়, সেহেতু রেফারিং করব না আমি। যখন ২০১২ সালে জাতীয় দল থেকে বাদ পড়ে গেলাম, তখন মনে হলো আর খেলবই না ফুটবল। ওই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখাও চলছিল।  কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েকদিন পরই আমার কাছে ছটফট লাগছিল। আমি যে খেলোয়াড়! ফুটবল মাঠে ফেরার তাড়না থেকে ফেডারেশনের বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্টগুলোয় রেফারিং করা শুরু করি। কয়েকটা টুর্নামেন্টে রেফারিং করার পর ২০১৩ সালে আমাকে ও সালমাকে শ্রীলঙ্কায় পাঠানো হয় একটা আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে রেফারি হিসেবে অংশগ্রহণের জন্য। এটাই ছিল প্রথম কোনো বাংলাদেশি নারীর রেফারি হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে প্রবেশ। সেখানে গিয়ে বুঝতে পারলাম, এটি একটি প্ল্যাটফর্ম এবং খেলোয়াড়দের যেরকম ক্যারিয়ার থাকে, রেফারিদেরও তেমনি ক্যারিয়ার থাকে। শ্রীলঙ্কায় সাউথ ও সেন্ট্রাল এশিয়ার টুর্নামেন্ট হওয়ার সুবাদে এখানে অনেক রেফারি আসেন বিভিন্ন দেশ থেকে। তাদের মধ্যে কয়েকজন ফিফা রেফারি ছিল। তখনই প্রথম ফিফা রেফারি সম্পর্কে জানতে পারলাম। ফিফার রেফারি মানে হলো– ফিফার ব্যাজ নিয়ে তারা খেলা চালান। ওই ব্যাজটা গর্ব ও সম্মানের। এটি আমাকে অনেক বেশি অনুপ্রাণিত করে। তখন মনে মনে দৃঢ়সংকল্প করি, যদি রেফারিং করি তাহলে বাংলাদেশের হয়ে ফিফার রেফারি হবো।’

নারী রেফারি হিসেবে জয়ার প্রতিটি দিনই ছিল চ্যালেঞ্জিং। মাঠে দায়িত্ব পালন করার সময় অনেকে সেই সিদ্ধান্তকে প্রশ্নবিদ্ধ করতেন। অনেকে তাঁর নারী পরিচয়কে অহেতুক আলোচনায় টেনে আনতেন। তবে তিনি সব প্রতিকূলতাকে অগ্রাহ্য করে নিজেকে আরও দক্ষ করে গড়ে তোলেন। ২০১৬ সালে তিনি বিকেএসপিতে কোচ হিসেবে জয়েন করেন। তবে রেফারি হওয়ার স্বপ্ন সামনে রেখেই এগিয়েছেন। মানসিক স্থিতিশীলতা ও ফিটনেস ধরে রাখার ক্ষেত্রে জয়ার অদম্য মনোবল তাঁকে এগিয়ে নিয়ে গেছে।  

নিজের যাপিত জীবনের সংগ্রাম নিয়ে জয়া বলেন, ‘সেই চতুর্থ শ্রেণি থেকে আমি প্রতিযোগিতামূলক খেলার সঙ্গে যুক্ত। শরীর আহত হয় আমাদের প্রতিনিয়ত মাঠে। কিন্তু শরীরের সঙ্গে যখন মন আহত হয়, তখন প্রচণ্ড পরিমাণে অসুস্থবোধ করি। বেঁচে থাকার ইচ্ছা হারিয়ে যায় তখন। তবে যেটির জন্য আমরা শক্ত হতে পারি সেটি হলো– আমি তো সারাজীবন খেলোয়াড়ই ছিলাম, হয় হেরেছি নয়তো জিতেছি। কিন্তু কোনোদিন মাঠ ছেড়ে পালিয়ে যেতে পারিনি। ম্যাচের সময়সীমা তো আমার শেষ করতেই হবে। আমার জীবন দর্শন এ রকমই– আমি পালিয়ে যাব না। আমি শেষ করব। আমি যুদ্ধটা করবই। হারি বা জিতি।’

জয়া চাকমার জীবন কেবল একটি নামের গল্প নয়, বরং এটি নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সমাজে নারীর ভূমিকার উদাহরণ। তাঁর সংগ্রাম এবং সাফল্য প্রমাণ করে, নারীরা চাইলেই যে কোনো প্রতিকূলতাকে জয় করতে পারেন। পাহাড়ি গ্রাম থেকে আন্তর্জাতিক ফুটবল মঞ্চ পর্যন্ত তাঁর যাত্রা বাংলাদেশের প্রত্যেক নারীর জন্য এক দৃষ্টান্ত। জয়া চাকমা আজ বাংলাদেশের নারীদের জন্য এক অনুপ্রেরণার নাম।

আরও পড়ুন

×