যখন নারীরা নেতৃত্ব দেন শান্তি তাদের অনুসরণ করে
সিমা সামি বাহৌস
সিমা সামি বাহৌস
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:৫১ | আপডেট: ১৯ অক্টোবর ২০২৫ | ২০:৫৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
আমরা আজ মিলিত হয়েছি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ১৩২৫ নম্বর প্রস্তাবের ২৫তম বার্ষিকী উপলক্ষে। গত ২৫ বছরের রেকর্ডটি মিশ্র–সাহসী, প্রশংসনীয় প্রতিশ্রুতির পর প্রায়ই দেখা গেছে দুর্বল বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রকল্পে স্বল্প বিনিয়োগ। আজ ৬৭ কোটি ৬০ লাখ নারী ও কন্যা প্রাণঘাতী সংঘাতের মধ্যে রয়েছে। সংখ্যাটি নব্বইয়ের দশকের পর থেকে সর্বোচ্চ। তাই এটি অত্যন্ত দুঃখজনক–আজ আমরা সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং লিঙ্গ সমতা ও বহুত্বের বিরুদ্ধে নতুন করে প্রতিহত করার চেষ্টা দেখছি। এগুলো বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তার মূল ভিত্তিকেই বিপন্ন করছে।
১৩২৫ প্রস্তাবের মূল নীতি নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার জন্য, এমনকি সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলসহ প্রান্তিক পর্যায়ে ক্রিয়াশীল। সদস্য রাষ্ট্রগুলো নারী অধিকার, শান্তি ও নিরাপত্তা এজেন্ডা, সমতার জন্য দৃঢ় প্রত্যয়, নারী-পুরুষ সমঅধিকারকে সমর্থন করে। এমনকি তালেবানশাসিত আফগানিস্তানেও ইউএন উইমেনের চলমান পর্যবেক্ষণ দেখায়, ৯২ শতাংশ আফগান নারী-পুরুষ উভয়েই মনে করেন, মেয়েদের অন্তত মাধ্যমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ থাকতে হবে। বেশির ভাগ আফগান নারী বলছেন, তালেবান নিপীড়নের শিকার হওয়া সত্ত্বেও তারা আশাবাদী, একদিন তারা তাদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারবেন। এটি কেবল একটি মানিয়ে নেওয়ার কৌশল নয়। এটি একটি রাজনৈতিক বক্তব্য। একটি দৃঢ় বিশ্বাস। একটি অনুপ্রেরণা।
আমরা যখন নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা এজেন্ডা নিয়ে আলোচনা করতে মিলিত হয়েছি, তখন মধ্যপ্রাচ্যের বেদনাদায়ক পরিস্থিতি, বিশেষ করে নারী ও কন্যাদের জন্য আমাদের অন্তর ভারী হয়ে আছে। গাজায় দুই বছরের ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ-হত্যাযজ্ঞ, যন্ত্রণা ও বহুমুখী ক্ষতির মধ্যেও আশার একটি ক্ষীণ আলো দেখা দিয়েছে। গাজার যুদ্ধ শেষ করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া মিলেছে সব পক্ষ থেকে। আমি জাতিসংঘ মহাসচিবের সঙ্গে তাঁকে স্বাগতম জানাই। আমরা আশা করি, এটি ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল উভয়ের জন্য একটি ন্যায়সসংগত ও স্থায়ী শান্তির পথে পরিচালিত হবে, যেখানে সব নারী ও কন্যা মর্যাদা, নিরাপত্তা ও সুযোগ নিয়ে বাঁচতে পারবে। বিশ্বব্যাপী আপাতদৃষ্টিতে অপ্রতিরোধ্য সংঘাত এবং ক্রমবর্ধমান অস্থিতিশীলতার মুখে দুর্ভোগ ও বাস্তুচ্যুতি বাড়তে পারে। এটি একটি বেদনাদায়ক সত্য, নারী ও কন্যাদের জন্য পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে–এর জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।
তহবিলের অভাবে এ পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে, যা ইতোমধ্যে আফগান মেয়েদের জন্য শিক্ষার সুযোগ ক্ষুণ্ন করছে। সুদান, হাইতি এবং অন্যান্য স্থানে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার শিকার হাজার হাজার মানুষের জন্য জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা সেবা সীমিত করছে। সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলজুড়ে স্বাস্থ্য ক্লিনিকগুলো বন্ধ করে দিতে হচ্ছে। গাজা, মালি, সোমালিয়া এবং অন্যান্য স্থানে অপুষ্টিতে ভোগা ও অনাহারে থাকা মা ও সন্তানদের খাদ্যপ্রাপ্তি সীমিত করছে এবং মৌলিকভাবে তা শান্তির সম্ভাবনা কমিয়ে দেবে।
যুদ্ধ ও সংঘাতের ভয়াবহতা সত্ত্বেও নারীরা ক্রমাগত শান্তি প্রতিষ্ঠা করে চলেছেন। আপনাদের কাছে আমি পাঁচটি কাজের আহ্বান জানাতে জানাচ্ছি–
১. ইতিবাচক পদক্ষেপ নিশ্চিত করা; যাতে নারীরা শান্তি স্থাপনের টেবিলে তাদের ন্যায্য স্থান নিতে পারেন এবং শান্তিরক্ষী, শান্তিনির্মাতা ও মানবাধিকার রক্ষাকারী হিসেবে তাদের প্রতি ধারাবাহিক সমর্থন দেওয়া।
২. এই এজেন্ডার প্রভাব পরিমাপ করা হবে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রক্রিয়ায় সরাসরি অংশগ্রহণকারী নারীর সংখ্যা দ্বারা।
৩. নারী ও কন্যার প্রতি সহিংসতা বন্ধ করা, প্রযুক্তিগত লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার বিভিন্ন ধরন মোকাবিলা করা এবং অনলাইন ও অফলাইন উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষতিকর আখ্যানকে চ্যালেঞ্জ করা।
৪. নারী ও কন্যার বিরুদ্ধে নৃশংসতা ও অপরাধের জন্য দায়মুক্তি বন্ধ করা, আন্তর্জাতিক আইনকে শ্রদ্ধা করা ও বহাল রাখা, অস্ত্রের আওয়াজ বন্ধ করা এবং শান্তি যেন অগ্রাধিকার পায় তা নিশ্চিত করা।
৫. নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা এজেন্ডাকে সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে তরুণ-যুবাদের অন্তরে আরও গভীরভাবে স্থাপন করা। তারাই আমাদের আকাঙ্ক্ষার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
আগামী কয়েক বছরে সর্বব্যাপী নিরাপত্তা পরিষদের ১৩২৫ নম্বর প্রস্তাবের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হওয়া উচিত। যখন নারীরা নেতৃত্ব দেন শান্তি তাদের অনুসরণ করে।
লেখক: নির্বাহী পরিচালক, ইউএন উইমেন/ আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল, জাতিসংঘ
[গত ৬ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে ইউএন সদরদপ্তরে ‘নারী ও শান্তি ও নিরাপত্তা’ বিষয়ক জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে প্রদত্ত বক্তব্য]
সংক্ষেপিত ভাষান্তর: শাহেরীন আরাফাত
- বিষয় :
- নারী
- ইউএন উইমেন
