‘প্রাত্যহিক অপরিহার্যতা’ ও নারীর বৈশ্বিক বাস্তবতা
গাজার নারীদের জন্য প্রতিটি দিন মানবাধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার এক নতুন ইতিহাস ছবি :: এএফপি
হিল্লোল চৌধুরী
প্রকাশ: ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:০৩ | আপডেট: ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ | ২০:৫০
| প্রিন্ট সংস্করণ
বিশ্বজুড়ে নানামুখী সংকট আর অস্থিরতার এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে পালিত হয়েছে ‘বিশ্ব মানবাধিকার দিবস ২০২৫’। ২০২৫ সালের মানবাধিকার দিবসের মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা ছিল–‘আমাদের প্রাত্যহিক অপরিহার্যতা’, মানবাধিকারের অপরিহার্যতা বোঝাতেই এই প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অথচ ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ সনদ কার্যকর হওয়ার ৮০ বছর পূর্তিতে দাঁড়িয়ে আজ মানবাধিকারের শাশ্বত ভিত্তিগুলোই যেন এক কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন।
বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতির এক রূঢ় চিত্র ফুটে উঠেছে ভলকার তুর্কের বক্তব্যে। তিনি বলেন, ‘অসমতা বাড়ছে, সংঘাতের দাবানল ছড়িয়ে পড়ছে, জলবায়ু জরুরি অবস্থা তীব্রতর হচ্ছে এবং বিভেদ তৈরির গভীর ষড়যন্ত্র চলছে সমাজ ও রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে। তবুও আমাদের হাল ছাড়া যাবে না।’
এ চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় প্রয়োজন ইস্পাতকঠিন সংহতি। মানবাধিকারের চর্চা এবং মৌলিক অধিকারের পক্ষে নিরন্তর লড়াই চালিয়ে যাওয়া এখন অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি।
প্রাত্যহিকতায় মানবাধিকার
এবারের প্রচারণার মূল লক্ষ্য হলো সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার প্রাসঙ্গিকতাকে পুনরায় নিশ্চিত করা। সাম্য, ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা এবং মর্যাদার মতো শব্দগুলো কেবল কোনো তাত্ত্বিক বুলি বা বইয়ের পাতার অলংকার নয়; বরং এগুলো প্রাত্যহিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ‘আমাদের প্রাত্যহিক অপরিহার্যতা’ ক্যাম্পেইন মানবাধিকারের বিমূর্ত ধারণাকে মূর্ত করে তোলে। আমরা যখন পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাই, খবরের কাগজ পড়ি, নির্ভয়ে পথ চলি, বিশুদ্ধ পানি পান করি কিংবা নিশ্চিন্তে এক বেলা খাবার খাই, তখন মূলত আমরা মানবাধিকারেরই চর্চা করি। এই ছোট কাজগুলোর মাধ্যমেই মানবাধিকারের ‘বিশালত্ব’ আমাদের ‘প্রাত্যহিকতায়’ ধরা দেয়। সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণায় এ বিষয়গুলোই স্পষ্টভাবে স্বীকৃত। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হলো পৃথিবীর সর্বত্র, সবার জন্য এই সাধারণ কাজগুলো আজও সহজসাধ্য নয়।
বৈশ্বিক ক্যানভাসে নারী
‘প্রাত্যহিক অপরিহার্যতা’র কথা যখন বলা হয়, তখন বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে নারীর অবস্থা পর্যালোচনা করলে এক ভিন্ন ও বেদনাদায়ক চিত্র ফুটে ওঠে। যে বিষয়গুলোকে আমরা ‘সাধারণ’ বা ‘মৌলিক’ ভাবছি, বিশ্বের কোটি কোটি নারীর কাছে তা আজও এক দূরতম স্বপ্ন কিংবা বিলাসিতা।
খাদ্যের অধিকার মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃত হলেও বিশ্বজুড়ে খাদ্য সংকটের প্রথম ও প্রধান শিকার নারী। যুদ্ধবিধ্বস্ত জনপদ থেকে জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার উপকূলীয় এলাকা–সবখানেই পরিবারের অন্যদের খাওয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকে, সেটুকুই জোটে নারীর কপালে। ২০২৫ সালে এসেও পুষ্টিহীনতায় ভোগা জনগোষ্ঠীর সিংহভাগই নারী ও কন্যাশিশু।
মানবাধিকার সনদে ‘স্বাধীনভাবে চলাফেরা’র কথা বলা হয়েছে। কিন্তু লাতিন আমেরিকা থেকে দক্ষিণ এশিয়া–নারীর জন্য রাজপথ কি নিরাপদ? সন্ধ্যার পর একা বাড়ি ফেরা কিংবা গণপরিবহনে যাতায়াত অনেক নারীর জন্যই আতঙ্কের নামান্তর। যেখানে একজন পুরুষ নির্দ্বিধায় হাঁটতে পারেন, সেখানে একজন নারীকে প্রতি মুহূর্তে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত থাকতে হয়। নারীর জন্য ‘প্রাত্যহিক অপরিহার্যতা’ এখানে পরিণত হয় ‘প্রাত্যহিক যুদ্ধে’।
ডিজিটাল যুগে অনলাইন জগৎ নারীর জন্য হয়ে উঠেছে এক নতুন ভয়ের ক্ষেত্র। সাইবার বুলিং, অনলাইন হয়রানি এবং সামাজিক অনুশাসনের বেড়াজালে নারীর কণ্ঠস্বরকে প্রতিনিয়ত রুদ্ধ করা হচ্ছে। অন্যদিকে, আফগানিস্তানের মতো দেশগুলোয় নারীর শিক্ষা ও কর্মের অধিকার কেড়ে নিয়ে তাদের কার্যত অদৃশ্য করে ফেলা হয়েছে।
জলবায়ু বিপর্যয়ের প্রভাবেরও রয়েছে এক লিঙ্গভিত্তিক চেহারা। খরা বা নদীভাঙনের সময় সুপেয় পানি সংগ্রহের সম্পূর্ণ দায়ভার চাপে নারীর কাঁধে। মাইলের পর মাইল হেঁটে পানি আনা কোনো রোমান্টিক দৃশ্যকল্প নয়; বরং এটি মানবাধিকারের ভয়াবহ লঙ্ঘন এবং নারীর ওপর এক অমানবিক শ্রমের বোঝা।
বিশ্বজুড়ে চলমান সংঘাতগুলোয় নারীর শরীর আজও যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ধর্ষণ, পাচার এবং নির্যাতন–যুদ্ধের এই ভয়াবহ দিকগুলো আন্তর্জাতিক আইনে নিষিদ্ধ হলেও বাস্তবে তা বন্ধ হয়নি। গাজায় প্রতিদিন নারীর মর্যাদা ও নিরাপত্তা লুণ্ঠিত হচ্ছে। সেখানে দখলদার ইসরায়েলি বাহিনী যেমন নারীকে ধর্ষণ করছে; তেমনি সুনির্দিষ্টভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে হত্যা করছে।
