ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

নিরাপদ অভিবাসন

দক্ষতাই উত্তরণের চাবিকাঠি

দক্ষতাই উত্তরণের চাবিকাঠি
×

অনেক স্বপ্ন নিয়ে নারী বিদেশে পাড়ি জমান ঠিকই। গন্তব্য দেশে অনেকেই শিকার হন অমানবিক নির্যাতনের ছবি :: কে এম আসাদ/হেলভেটাস বাংলাদেশ

শাহেরীন আরাফাত

প্রকাশ: ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:০৪ | আপডেট: ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ | ২১:০০

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রাণশক্তি হলো প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। অর্থনীতির চাকা সচল রাখা এ বিশাল আয়ের পরিসংখ্যানের আড়ালে প্রায়ই চাপা পড়ে যায় লাখো মানুষের স্বপ্নভঙ্গ, সংগ্রাম এবং দীর্ঘ হাহাকার। বৈশ্বিক শ্রমবাজারে নারী অভিবাসন একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ থেকে নারীকর্মী পাঠানো শুরু হলেও, গত কয়েক দশকে এই হার নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। বর্তমানে মোট অভিবাসীর প্রায় ১২ শতাংশই নারী, যাদের সিংহভাগই মধ্যপ্রাচ্যে–বিশেষ করে সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে যান।

অনেক স্বপ্ন নিয়ে নারীরা বিদেশে পাড়ি জমান ঠিকই, কিন্তু গন্তব্য দেশে অনেকেই শিকার হন অমানবিক নির্যাতনের। ভাষাগত অজ্ঞতা, কারিগরি অদক্ষতা এবং আইনি সুরক্ষার অভাব– এই তিনের অশুভ যোগসাজশে তাদের জীবন বিপন্ন হয়ে ওঠে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট মোকাবিলার একমাত্র পথ দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা। এ বাস্তবতা সামনে রেখেই ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস ও জাতীয় প্রবাসী দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে–‘দক্ষতা নিয়ে যাব বিদেশ, রেমিট্যান্স দিয়ে গড়ব দেশ’।

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৪০ শতাংশ অভিবাসী দালাল এবং ২৪ শতাংশ অভিবাসী নিয়োগকর্তার মাধ্যমে প্রতারণার শিকার হন। এই চক্রের ফাঁদে পড়ে অনেকেই সর্বস্বান্ত হন। কেউ কাঙ্ক্ষিত কাজ বা প্রতিশ্রুত বেতন পান না, আবার কেউবা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে শূন্য হাতে দেশে ফিরতে বাধ্য হন। এই ‘ব্যর্থ অভিবাসন’ কেবল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জন্যই বিপর্যয় ডেকে আনে না, বরং তার পরিবার ও সমাজের জন্যও এটি এক বিশাল বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।

প্রতারণার ফাঁদ ও ব্যর্থ অভিবাসন
বিদেশ গমনে ইচ্ছুক কর্মীরা প্রায়ই সঠিক তথ্যের অভাবে ভোগেন। তাদের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা প্রশিক্ষণ ও আইনি সহায়তাও অপ্রতুল। যারা নির্যাতনের শিকার হন, তাদের জন্য বিচার পাওয়ার পথটিও মসৃণ নয়। এই প্রেক্ষাপটে হেলভেটাস বাংলাদেশ ও তাদের সহযোগী সংস্থাগুলো স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এবং বেসরকারি খাতের সমন্বয়ে অভিবাসন ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে।

সিমস প্রকল্প: পরিবর্তনের রূপরেখা
গত পাঁচ বছরে গড়ে প্রতি বছর প্রায় সাড়ে সাত লাখ বাংলাদেশি উন্নত জীবনের সন্ধানে দেশ ছেড়েছেন। ২০২৩ সালে রেমিট্যান্স এসেছে ২২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে অর্থনীতির এই বিশাল জোগান সত্ত্বেও শ্রম অভিবাসন প্রক্রিয়া– যার মধ্যে দক্ষতা, তথ্যপ্রাপ্তি, সঠিক নিয়োগ, ন্যায়বিচার এবং রেমিট্যান্স ব্যবস্থাপনা অন্তর্ভুক্ত– এখনও নানা সীমাবদ্ধতায় আচ্ছন্ন।

এ সংকট নিরসনে কাজ করছে ‘স্ট্রেংথ অ্যান্ড ইনফরমেটিভ মাইগ্রেশন সিস্টেমস’ (সিমস) প্রকল্প। ২০১৯-২০২৪ মেয়াদে প্রকল্পের প্রথম ধাপে অভিবাসী কর্মী ও তাদের পরিবারকে নিরাপদ অভিবাসন এবং অধিকার সম্পর্কে সচেতন করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে চলমান দ্বিতীয় ধাপে (২০২৪-২০২৮) সিমস সচেতনতার পাশাপাশি কাঠামোগত বা সিস্টেমিক পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। এর লক্ষ্য হলো সরকারি-বেসরকারি সেবা প্রদানকারীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জাতীয় পর্যায়ে নীতিনির্ধারণী মহলে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা।

তৃণমূল পর্যায়ে এ উদ্যোগের সফল বাস্তবায়নের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ কুমিল্লা জেলা। সুইজারল্যান্ড সরকারের সহায়তায় হেলভেটাস বাংলাদেশের সিমস প্রকল্পের আওতায় ‘রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটিং মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট’ (রামরু) কুমিল্লার পাঁচটি উপজেলায় (আদর্শ সদর, সদর দক্ষিণ, চান্দিনা, মুরাদনগর ও দাউদকান্দি) কার্যক্রম পরিচালনা করছে। প্রকল্পের আওতায় স্থানীয় অংশীজন ও ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে এবং বিদেশগামীদের জন্য পরিচিতিমূলক সেশনের আয়োজন করা হচ্ছে। পাশাপাশি গঠন করা হয়েছে অভিযোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি। এ উদ্যোগগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো, শ্রমিকরা যেন বিদেশে গিয়ে আত্মনির্ভরশীল হতে পারেন এবং যে কোনো সংকট মোকাবিলায় সক্ষম হন।

বাস্তবচিত্র: অদক্ষতার মাশুল ও সাফল্যের গল্প
কুমিল্লার মুরাদনগরের রহিমা খাতুন (ছদ্মনাম) দালালের প্রলোভনে পড়ে গৃহকর্মী হিসেবে সৌদি আরবে যান। দালাল আশ্বস্ত করেছিল, ঘরের কাজের জন্য প্রশিক্ষণের প্রয়োজন নেই। রিয়াদে পৌঁছানোর পর তিনি ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি হন। আরবি ভাষা না বোঝায় মালিকের স্ত্রীর নির্দেশ বুঝতে পারতেন না, ওভেন ব্যবহার করতে না জানায় খাবার পুড়ে যেত। এর শাস্তি হিসেবে জুটত মারধর ও অভুক্ত থাকা। শেষ পর্যন্ত অসুস্থ শরীর নিয়ে ছয় মাস পর তিনি শূন্য হাতে দেশে ফিরতে বাধ্য হন।

একইভাবে চান্দিনার সুরমা আক্তার (ছদ্মনাম) স্বপ্ন দেখেছিলেন জর্ডানে পোশাক শ্রমিক হিসেবে কাজ করার। আধুনিক মেশিন সম্পর্কে তাঁর কোনো ধারণা ছিল না। রিক্রুটিং এজেন্সি তাঁকে ভুয়া অভিজ্ঞতার সনদ দিয়ে পাঠায়। কারখানায় যোগ দেওয়ার প্রথম সপ্তাহেই তাঁর অদক্ষতা ধরা পড়ে। ফলে সুপারভাইজার তাঁকে প্রোডাকশন লাইন থেকে সরিয়ে পরিচ্ছন্নতা কর্মীর কাজে নামিয়ে দেন এবং বেতন অর্ধেক কমিয়ে দেন। সুরমা এখন জর্ডানে মানবেতর জীবনযাপন করছেন এবং দেশে ফেরার পথ খুঁজছেন।

বিপরীত চিত্র দেখা যায় মরিয়ম আখতারের জীবনে। কুমিল্লার লালমতি গ্রামের এই নারী একসময় প্রবাসী স্বামীর সামান্য আয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতেন। ২০২২ সালে ‘রামরু’র সিমস প্রকল্পের প্রশিক্ষণ তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান কাজে লাগিয়ে তিনি পোলট্রি খামার শুরু করেন। কঠোর পরিশ্রমে আজ তিনি ১২ হাজার মুরগির চারটি খামারের মালিক। স্বামীকে প্রবাস থেকে ফিরিয়ে এনে ব্যবসায় যুক্ত করেছেন। সব খরচ বাদে তাঁর মাসিক আয় এখন প্রায় আড়াই লাখ টাকা। 

বিশেষজ্ঞের চোখে
রামরুর ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক ড. তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, ‘২০০৩ সাল পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক বিদেশি শ্রমবাজারে শুধু পুরুষদেরই প্রবেশাধিকার ছিল। নারী অভিবাসনের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পর এর হার বহুগুণে বেড়ে যায়। তবে পুরুষদের তুলনায় নারী অভিবাসীরা সাধারণত বেশি সুবিধাবঞ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ সামাজিক-অর্থনৈতিক পটভূমি থেকে আসেন। নারী অভিবাসীরা মূলত গৃহকর্মী হিসেবে যান, কিন্তু তাদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়ন ও সুরক্ষার নীতি এখনও অপর্যাপ্ত। শ্রম অভিবাসনকে সুশৃঙ্খল করতে নীতি ও প্রশাসনিক উভয় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন।’ তিনি আরও জানান, সুইজারল্যান্ড সরকারের সহযোগিতায় হেলভেটাস বাংলাদেশের সিমস প্রকল্পের মাধ্যমে সম্প্রতি রামরু কুমিল্লার ২৫টি ইউনিয়নের ৮০ জন স্থানীয় অংশীজন ও জনপ্রতিনিধিকে জেন্ডারবিষয়ক প্রশিক্ষণ দিয়েছে।

অন্যদিকে ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে নারীরা মূলত গৃহকর্মী হিসেবেই সৌদি আরবে যান, বিশেষ করে ২০১৫ সালে এমওইউ স্বাক্ষরের পর থেকে। তবে তাদের বড় অংশই স্বেচ্ছায় বা ভালো কোনো সুযোগের সন্ধানে যান না; বরং ডিভোর্স, বহু সন্তান বা তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের কারণে বাধ্য হয়ে যান। দালালরা এই অসহায়ত্বের সুযোগ নেয়। বিদেশে গিয়ে তারা মূলত তিন ধরনের সংকটে পড়েন–বেতন না পাওয়া, শারীরিক নির্যাতন এবং যৌন নিপীড়ন। সামান্য বেতনে গৃহকর্মী হিসেবে না পাঠিয়ে নারীদের যদি জর্ডান বা লেবাননে গার্মেন্টস শ্রমিক, কেয়ারগিভার বা নার্স হিসেবে পাঠানো যায়, তবে তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত হয়।’

অভিবাসন কেবল বিদেশ ভ্রমণ নয়, এটি একটি জীবন পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত। নারী অভিবাসন অবশ্যই পুরুষের পাশাপাশি চলবে। তবে তা হতে হবে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ। দক্ষতা অর্জনই হতে পারে সেই কাঙ্ক্ষিত উত্তরণের পথ। 

আরও পড়ুন

×