ঢাকা সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬

জেন্ডার ন্যায্যতা ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন

এখনও নারীর পথ সংকুচিত

এখনও নারীর পথ সংকুচিত
×

ফারাহ্ কবির

ফারাহ্ কবির

প্রকাশ: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:২৪ | আপডেট: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৫:২৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ অনুষ্ঠিতব্য বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আমাদের সামনে সম্ভাবনার এক বিশেষ উপলক্ষ তৈরি করেছে। কিন্তু নির্বাচনের আগে নারীপ্রার্থীর যে পরিসংখ্যান সামনে এসেছে, তা রীতিমতো হতাশাজনক। ৩০০ সংসদীয় আসনে এক হাজার ৮৪২ জন বৈধ প্রার্থীর মধ্যে নারী মাত্র ৬৫ জন অর্থাৎ মাত্র ৩ দশমিক ৫৩ শতাংশ। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩০টি দলে কোনো নারীপ্রার্থী নেই। রাজনৈতিক দলগুলো বলছে–তারা ‘ধীরে ধীরে’ নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়াবে, কিন্তু তার কোনো সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ নেই। অথচ ‘জুলাই সনদ ২০২৫’-এ রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য ন্যূনতম ৫ শতাংশ নারীপ্রার্থী মনোনয়নের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছিল। 

এবার নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রার্থী মনোনয়নের চিত্রটি বেশ অস্বস্তিকর। সংখ্যায় দেশের ছোট দলগুলোর মধ্যে নতুন নিবন্ধিত দল বাসদ (মার্কসবাদী) তাদের মোট প্রার্থীর এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ১০ জন নারীকে মনোনয়ন দিয়ে একটি আশাব্যঞ্জক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এ ছাড়া গণসংহতি আন্দোলন চারজন নারীকে মনোনয়ন দিয়েছে। অন্যতম বড় দল বিএনপি ১০ জন নারীপ্রার্থী দিয়ে এগিয়ে থাকলেও শতাংশের হিসাবে তারা এখনও অনেক পিছিয়ে। এনসিপি মনোনয়ন দিয়েছে দুই নারীপ্রার্থীকে। এ ছাড়া জামায়াতে ইসলামীর মতো অনেক দলের তালিকায় একজনও নারীপ্রার্থী নেই। কিছু দলের গঠনতন্ত্রে নারী নেতৃত্বের অংশগ্রহণ অন্তর্ভুক্তিমূলক নয়। এ রাজনৈতিক নেতৃত্বই শ্রম আইন, সরকারি বিনিয়োগ ও সামাজিক সুরক্ষার রূপরেখা নির্ধারণ করে। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে যখন নারীর অর্থপূর্ণ প্রতিনিধিত্ব থাকে না, তখন শিশু যত্ন কেন্দ্র, মাতৃত্বকালীন ছুটি কিংবা নিরাপদ পরিবহনের মতো নারীবান্ধব নীতিগুলো অর্থায়ন ও গুরুত্বের অভাবে কেবল দাপ্তরিক নথিতেই বন্দি থেকে যায়।

কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক পরিমণ্ডলে জেন্ডার সমতাকে প্রায়ই একটি কারিগরি সমস্যা হিসেবে দেখা হয়। এর সমাধান হিসেবে নমনীয় কর্মঘণ্টা, নিয়োগ প্রক্রিয়ার আধুনিকায়ন কিংবা বেতনবৈষম্য কমানোর মতো বিষয়গুলো সামনে আনা হয়। এসব উদ্যোগের গুরুত্ব থাকলেও আমাদের দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কেবল এসব কারিগরি ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। কর্মক্ষেত্রে জেন্ডার সমতা নিছক মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়; বরং এটি ক্ষমতা, নীতিনির্ধারণী প্রণোদনা এবং প্রতিষ্ঠানগুলো আদতে কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত কিনা–সেই মৌলিক প্রশ্নের সঙ্গে সম্পর্কিত।

নির্বাচন এলে দলগুলো নানা প্রতিশ্রুতির কথা বলে। যেমন–পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা দিতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বা সরাসরি অর্থ দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, এই কার্ড বা টাকা কি কেবল পরিবারের হাতেই আসবে, নাকি সেই অর্থের ওপর নারীর প্রকৃত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও থাকবে? সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ছাড়া কেবল অর্থ প্রদান কখনোই ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করে না। এ ছাড়াও পানি সরবরাহ, গ্যাস বণ্টন ও ব্যবহারের সিদ্ধান্তও নারীর হাতে থাকে না। ঠিক একইভাবে কর্মক্ষেত্রে ডে-কেয়ার সেন্টারের অভাব বা অনিরাপদ যাতায়াতের সমস্যা কাটছে না। কারণ এই নীতিগুলো যারা নির্ধারণ করছেন, সেই নেতৃত্বের আসনে নারীর প্রতিনিধিত্ব অপ্রতুল। নারীকে বাদ দিয়ে নীতি কীভাবে নারীবান্ধব হবে? নেতৃত্বের আসনে নারীর অনুপস্থিতিই প্রমাণ করে যে রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রে এখনও নারীর পথ কতটা সংকুচিত।

নারীর ওপর বিনা পারিশ্রমিকের গৃহস্থালি কাজের বোঝা রাজনৈতিক বঞ্চনার এক প্রকট উদাহরণ। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নারীরা পুরুষের তুলনায় বহু গুণ বেশি যত্ন ও গৃহস্থালি কাজ করেন। সাজেদা ফাউন্ডেশন ও বিআইডিএস যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাসাবাড়িতে নারীরা পুরুষের তুলনায় চার গুণ বেশি কাজ করেন। রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে এই বিশাল শ্রম অদৃশ্যই থেকে যায় এবং বাজেটে এর কোনো স্বীকৃতি থাকে না। রাষ্ট্র যদি তার অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে এভাবে গৃহস্থালি কাজের শৃঙ্খলে বা অসময়ে সাংসারিক জীবনে বন্দি করে রাখে, তবে জাতীয় উন্নয়নের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অসম্ভব। নারীবান্ধব নীতিনির্ধারণী রোডম্যাপ ছাড়া এই ৫০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর মেধা ও শ্রমের অবদান থেকে রাষ্ট্র বঞ্চিত হতেই থাকবে।
একটি সত্য স্পষ্ট–যখন নারীরা সিদ্ধান্তে প্রভাব রাখেন, তখনই প্রতিষ্ঠান পরিবর্তিত হয়। কেবল সংখ্যাতাত্ত্বিক উপস্থিতি বা ‘টোকেনিজম’ রূপান্তর ঘটাতে পারে না; সম্পদ বরাদ্দ এবং পুরোনো রীতিনীতিকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য নারীর প্রকৃত ‘ক্ষমতা’ প্রয়োজন।

জেন্ডার সমতা এখন আর ঐচ্ছিক নয়, বরং অনিবার্য। উন্নয়ন সংস্থাগুলো যদি নিজেদের মূল্যবোধের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ চর্চার মিল না রাখে, তবে তারা বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে। একইভাবে নারীর শ্রমকে অবমূল্যায়ন করলে জাতীয় অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়বে। প্রশ্নটি এখন আর সমতা ‘কাম্য কিনা’–তা নিয়ে নয়; বরং ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস মোকাবিলায় আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা প্রস্তুত, সেটিই আসল প্রশ্ন। রাজনীতি ও সমাজজুড়ে যখন নারীরা সিদ্ধান্ত নিতে ও নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হবেন, তখনই অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মক্ষেত্র টেকসই হয়ে উঠবে। সমতা কেবল নিচ থেকে আসা কোনো প্রক্রিয়া নয়–এটি তখনই সার্থক হয়, যেখানে ক্ষমতা ভাগাভাগি করার মানসিকতা তৈরি হয় এবং প্রতিষ্ঠানগুলো স্থবিরতার পরিবর্তে রূপান্তরকে বেছে নেয়। 

লেখক: কান্ট্রি ডিরেক্টর, একশনএইড বাংলাদেশ

আরও পড়ুন

×