স ম সা ম য়ি ক
গণঅভ্যুত্থান থেকে নির্বাচন
তানজিলা মোস্তাফিজ
প্রকাশ: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:২৬ | আপডেট: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৭:৪৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
একদিকে নারীরা আন্দোলনের সময় সাহসী মুখ, অন্যদিকে স্বাভাবিক রাজনৈতিক ও নাগরিক পরিসরে তারা আবার পিছিয়ে পড়ছেন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশের রাজপথে যে গণআন্দোলন দেখা গেছে, সেখানে নারীর উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী থেকে শুরু করে পেশাজীবী নারী, গৃহিণী সবাই ছিলেন রাজপথে। অথচ নির্বাচনে তারা অনুপস্থিত। ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের প্রার্থী তালিকার দিকে তাকালেই একটা অস্বস্তিকর বাস্তবতা চোখে পড়ে, নারী প্রার্থীর সংখ্যা কমেছে উল্লেখযোগ্য মাত্রায়। বাংলাদেশের ইতিহাসে দেখা যায়, সংকটময় মুহূর্তে নারীরা রাজপথে থাকেন কিন্তু সেই আন্দোলনের ফসল ভাগাভাগির সময় ক্ষমতার টেবিলে তাদের আসন থাকে না। এর কারণ হতে পারে রাজনীতির দলীয় কাঠামো এখনও পুরুষপ্রধান ও নেটওয়ার্কনির্ভর। নারীরা মাঠে থাকলেও মনোনয়ন বোর্ডে তাদের পক্ষে লড়াই করার লোক কম। ফলে নারীরা ‘প্রতীকী শক্তি’ হিসেবে ব্যবহৃত হন, কিন্তু ক্ষমতা কাঠামোয় ঢুকতে পারেন না। গ্রন্থনা তানজিলা মোস্তাফিজ
------------------------------------------------------------------------------
এতটা আশা করা বোকামি ছিল
শিরীন পারভিন হক
সদস্য, নারীপক্ষ
সাবেক নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান
পুরো বিষয়টিই আমার কাছে এখন দুঃখজনক। যখন জুলাই অভ্যুত্থান হলো তখন আমাদের, মানে সবার, সারাদেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষার জায়গা একেবারে আকাশ ছুঁয়েছিল। এই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে একটা নতুন বন্দোবস্ত শুধু না, একটা নতুন সংস্কৃতি, একটা দেশপ্রেমের জোয়ার ঘটবে, অনেক কিছু ভেবে বসেছিলাম। এখন বুঝতে পারি, হয়তো বেশি আশা করেছিলাম। এতটা আশা করা হয়তো বোকামি ছিল। কিছুটা অপরিণত চিন্তা বোধহয় হয়েছিল যে এই এত বড় একটা অভ্যুত্থান, যেটা নাকি এত বছরের স্বৈরশাসনকে উপড়ে ফেলে দিতে পারল এবং স্বৈরশাসককে পালাতে বাধ্য করল! এটা থেকে মনে হয়েছিল আরও অনেক কিছু হয়ে যাবে–মানে গোটা দেশ, সমাজ, মানুষগুলো সব রূপান্তরিত হয়ে যাবে।
তখন আমি মনে করেছিলাম, এবার নারীর স্বপ্ন, নারীর আকাঙ্ক্ষার জায়গা হয়তো গুরুত্ব পাবে–এবার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে নারীর স্বপ্নের জায়গায় পৌঁছানোর জন্য; যা দেখলাম সেটিও হলো না। এটা তো পরিষ্কার, আন্দোলন ও এত অংশগ্রহণের পরও মেয়েরা কোণঠাসা হয়ে গেল।
যদিও কিছু সংস্কার হয়েছে, তবে আমরা যা আশা করেছিলাম, সেটা হয়নি। সংস্কার কমিশনগুলোর পরিশ্রম সত্ত্বেও ফলাফল তেমন কিছু আসেনি। আমরা ৩৯টি সভা করেছি এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন স্থান থেকে পরামর্শ নিয়েছি। কমিশনে সদস্য বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আমাকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল।
আমার খারাপ লেগেছে, আমাদের সুপারিশগুলোর মধ্যে তিনটি সুপারিশকে ঘিরেই যত আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে, অথচ বাকি ৪২০টি সুপারিশ তেমন গুরুত্ব পায়নি।
------------------------------------------------------------------------
আন্দোলনেই আসবে মুক্তি
ড. তাসনিম সিদ্দিকী
ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক, রামরু
শ্রাবণ বিদ্রোহে নারীরা ছিলেন মুখ্য ভূমিকায়। সমাজ পরিবর্তনের যে স্বপ্ন শ্রাবণ বিদ্রোহের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে বলে আশা করা হয়েছিল, তার একটি মূল ক্ষেত্র ছিল প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠাগুলোয় নারীর উপস্থিতি এবং পথের অন্তরায়গুলো দূর করা। জাতিসংঘের পরামর্শমতো ৩৩ শতাংশ আসন না হলেও, বড় অংশের আসনে নারীকে নমিনেশন দেওয়ার কথা ছিল দলগুলোর। আমরা তা দেখলাম না। জামায়াতে ইসলামী কোনো নারীকে নমিনেশন দেয়নি, এমনকি পুরুষ এবং নারীর শারীরিক পার্থক্য টেনে আগের রাজনৈতিক দলগুলোয় যে নারী নেতৃত্ব ছিল, তাদের প্রতি অসম্মানজনক উক্তি করা হয়েছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর এনজিও কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অনেক নারী আয়বর্ধক কাজে পাবলিক স্ফিয়ারে আসেন। আশির দশকে গার্মেন্টস শিল্প নারীদের আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে অংশগ্রহণের সুযোগ বিশেষভাবে বাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু কভিড-উত্তর সময় থেকে আমরা নারীর জন্য নেতিবাচক ধারা দেখতে পাচ্ছি; যা তৈরি হয়েছিল ৯০ শতাংশ নারী কর্মী নিয়ে, আজ সেখানে তা কমতে কমতে ৫৫ শতাংশে নেমে এসেছে। নারী অধিকারের ও অংশগ্রহণের যে চিন্তাগুলো বিকশিত হয়েছিল, তা যেন হঠাৎ করেই প্রতিক্রিয়াশীল হতে শুরু করেছে। নারী কমিশন নিয়ে যে নেতিবাচক বিতর্ক আমরা দেখেছি, তাতেও শ্রাবণ বিদ্রোহের আশা-আকাঙ্ক্ষাগুলো যেন পেছনে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় সার্বিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য পড়ালেখার পাশাপাশি ক্রীড়া, গান, নাচের যে ভূমিকা ছিল, সে ব্যাপারে সমাজের রক্ষণশীল রাজনৈতিক শক্তিগুলো আন্দোলন করে শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ করে দিতে সক্ষম হয়েছে। এই সামগ্রিক অবস্থার প্রতিফলন আমরা নির্বাচনে দেখতে পাচ্ছি। এ অবস্থা থেকে বের হতে হলে নারী অধিকারের প্রতিষ্ঠা এবং পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য পথে নামতে হবে। মুক্তি আন্দোলন করেই আনতে হবে।
- বিষয় :
- ভোট
- তানজিলা মোস্তাফিজ
- শিরীন হক
- নারী
- গণঅভ্যুত্থান
- নির্বাচন
