ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

প্রতিবন্ধিতা এড়িয়ে জীবনজয়ের গল্প

প্রতিবন্ধিতা এড়িয়ে জীবনজয়ের গল্প
×

ফারহানা আক্তার

প্রকাশ: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:২৯ | আপডেট: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৭:৪০

| প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতিবন্ধকতা কোনো অভিশাপ নয়, বরং এটি মানবজীবনের এক ভিন্ন বাস্তবতা। অথচ আমাদের সমাজব্যবস্থায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হয় নিজের অধিকার ও মর্যাদা আদায়ের জন্য। এই কঠিন সামাজিক বাস্তবতা ভেদ করে অনেকেই গড়ে তুলছেন সাফল্যের গল্প। এমনই দুজন অদম্য যোদ্ধা ইফতেখার মাহমুদ ও রুমা আক্তার।

অন্ধকারের বিপরীতে এক অদম্য যাত্রী
স্বপ্নবাজ মানুষ ইফতেখার মাহমুদ। তিনি একটি সামাজিক সংগঠনের পরিচালক হিসেবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় কাজ করছেন। কিন্তু তাঁর এই উঠে আসার পথ ছিল কণ্টকাকীর্ণ। বাবার সরকারি চাকরির সুবাদে শৈশব ও কৈশোর কেটেছে নারায়ণগঞ্জে। নটর ডেম কলেজ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। কিন্তু দ্বিতীয় শ্রেণি থেকেই তাঁর দৃষ্টিশক্তির অবনতি ঘটতে থাকে। কলেজজীবনে চিকিৎসক যখন জানালেন যে তিনি ধীরে ধীরে দৃষ্টিশক্তি হারাবেন, তখন হতাশার গভীর সাগরে নিমজ্জিত হন তিনি। ছোটবেলা থেকেই ‘বাইপোলার ডিসঅর্ডার’-এ ভোগা ইফতেখার জীবনের নানা পর্যায়ে ১৫ বার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। তবে দৃষ্টিশক্তি হারানো নয়; বরং পারিবারিক ও মানসিক যন্ত্রণাই ছিল তাঁর এই বিপর্যয়ের মূল কারণ। তিনি বলেন, ‘দৃষ্টিশক্তি হারানোর কারণে কখনও মরতে চাইনি, মানসিক যন্ত্রণাই আমাকে ভেঙে দিত।’

সৃষ্টিকর্তার কাছে তিনি দৃষ্টিশক্তি ফেরত চাননি, চেয়েছিলেন ধৈর্য। সঠিক কাউন্সেলিং, বন্ধুদের সহায়তা এবং সামাজিক কাজে নিজেকে যুক্ত করার মাধ্যমে তিনি ফিরে এসেছেন। বাসে যাতায়াতের সময় মানুষের করুণ দৃষ্টি তাঁকে পীড়া দিত। তিনি বিশ্বাস করেন, প্রতিবন্ধিতা কোনো অসুস্থতা নয়, এটি মানুষের বৈচিত্র্য। বর্তমানে তিনি চারটি সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত এবং নিজের দুটি ব্যবসায়িক উদ্যোগ পরিচালনা করছেন। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানেও তিনি রাজপথে হ্যান্ড মাইক হাতে মানুষকে সাহস জুগিয়েছেন।

অবহেলা মাড়িয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার গল্প
‘বি-স্ক্যান’ (বাংলাদেশ সোসাইটি ফর দ্য চেঞ্জ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি নেক্সাস)-এর প্রোগ্রাম অফিসার রুমা আক্তার। জন্ম থেকেই ‘সেরিব্রাল পালসি’র কারণে শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার তিনি। শৈশব থেকেই সমাজ ও প্রতিবেশীদের বিদ্রুপ সইতে হয়েছে। অনেকেই বলতেন, ‘এই মেয়েকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না, একে মাদ্রাসায় দিয়ে দাও।’ কিন্তু তাঁর নানু ও মায়ের অটুট মনোবলের কারণে সাধারণ স্কুলে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পেরেছেন।

হিসাববিজ্ঞানে স্নাতক সম্পন্ন করা রুমা পরীক্ষার হলে কখনও তাঁর প্রাপ্য অতিরিক্ত ২০ মিনিট সময় পাননি। এই সুযোগ পেলে হয়তো তাঁর ফলাফল আরও ভালো হতে পারত। স্নাতক শেষে তিনি বি-স্ক্যানে ইন্টার্নশিপ শুরু করেন এবং বর্তমানে সেখানেই কর্মরত। 

নারায়ণগঞ্জ থেকে প্রতিদিন বাসে করে ঢাকার বনশ্রীতে অফিস করেন তিনি। গণপরিবহনে প্রতিনিয়ত যুদ্ধের মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে। বাসে উঠতে না দেওয়া কিংবা ‘হোয়াইট ক্যান’ দেখেও বাস না থামানো–এসব নিত্যদিনের ঘটনা। তবুও তিনি দমে যাননি। রুমা মনে করেন, নারী প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কোটা সুবিধা বৃদ্ধি এবং কর্মক্ষেত্রে তাদের জন্য বাধ্যতামূলক নিয়োগ নীতিমালা থাকা জরুরি। তাঁর স্বপ্ন, একদিন তিনি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের দক্ষতা প্রমাণ করবেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা প্রতিবন্ধী নারীর সমস্যাকে তিনটি স্তরে ভাগ করেছেন– ১. নারী হিসেবে বৈষম্য, ২. শারীরিক অক্ষমতার জন্য বৈষম্য, ৩. প্রান্তিক পরিচয়ের কারণে অবহেলা। তিনি বলেন, ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা কেবল প্রতিবন্ধী নন, তারা প্রান্তিকও। বিশেষ করে প্রতিবন্ধী নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। আইনের বাস্তবিক প্রয়োগ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন ছাড়া তাদের মূলধারায় আনা সম্ভব নয়।’ 

লেখক: উন্নয়নকর্মী 

আরও পড়ুন

×