ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

জুতা সেলাইয়ে গাথা জীবন

জুতা সেলাইয়ে গাথা জীবন
×

শিল্পী রানী রবিদাস

সাজিদা ইসলাম পারুল

প্রকাশ: ০১ মার্চ ২০২৬ | ০৭:১৯ | আপডেট: ২৯ মার্চ ২০২৬ | ২০:৫৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

কাগজে-কলমে বয়স মাত্র পঁয়ত্রিশ। অথচ মুখের রেখায়, চোখের গভীর ক্লান্তিতে মনে হয় জীবনের অনেকটা পথ যেন একাই হেঁটে এসেছেন শিল্পী রানী রবিদাস। কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার বাকই দক্ষিণ ইউনিয়নের কোয়ার গ্রামের এক জীর্ণ ভাড়াবাড়িতে তাঁর এই নিঃসঙ্গ বসবাস। স্বামী হারিয়েছেন এক যুগ আগে, সন্তানরা থেকেও নেই–তবুও জীবনানন্দের খোঁজে বা বলা ভালো, কেবল বেঁচে থাকার তাগিদে তিনি লড়ে যাচ্ছেন এক অসম যুদ্ধ।

শিল্পী রানীর জীবনের অধ্যায়গুলো যেন কষ্টের কালিতে লেখা। মাত্র ১৪-১৫ বছর বয়সে কিশোরী বয়সেই তাঁর বিয়ে হয়েছিল পেশায় স্যালুনকর্মী হরি রবিদাসের সঙ্গে। আজ থেকে ঠিক ১২ বছর আগে, যখন তার দুই সন্তানের বয়স মাত্র পাঁচ ও সাত, তখন স্বামীর মৃত্যুতে তাঁর মাথার ওপর থেকে সরে যায় একমাত্র ছাদ। চাঁদপুর শহর ছেড়ে বাবার বাড়ি লাকসামের বিজরায় ফিরে এলেও সেখানেও তিনি পাননি স্থায়ী কোনো আশ্রয়। বাবা মারা যাওয়ার পর মা ও ভাইবোনেরা শহরে পাড়ি জমালে শিল্পী রানীকে বেছে নিতে হয় একাকিত্বের জীবন।

স্বামীর মৃত্যুর পর অসহনীয় দারিদ্র্য যখন দরজায় কড়া নাড়ছিল, তখন প্রথাগত কাজ বা ভিক্ষাবৃত্তির দিকে না গিয়ে শিল্পী বেছে নিয়েছিলেন এক ব্যতিক্রমী পেশা। সংসারে অভাবের তাড়নায় নিজের ছেঁড়া জুতো নিজেই সেলাই করতেন। সেই অভিজ্ঞতাকেই তিনি পুঁজি করলেন।

নারীরা সচরাচর যে পেশায় আসেন না, সেই জুতো সেলাই বা মুচির কাজকেই তিনি আঁকড়ে ধরলেন। তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘ভাবলাম, বাইরে গিয়ে করলে দুইটা টাকা পাওয়া যাবে।’ সেই থেকে ১০-১২ বছর ধরে গ্রামের পর গ্রাম ঘুরে, মানুষের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে জুতো সেলাই করেছেন। দিনে ৪০০-৫০০ টাকা আয় করে সন্তানদের মুখে অন্ন জুগিয়েছেন, পড়াশোনা করিয়েছেন, এমনকি মেয়ের বিয়েও দিয়েছেন। তবে যৌতুকের দাবি মেটাতে না পারায় মেয়ের সংসার টেকেনি। সেই অভিমানে বা পরিস্থিতির চাপে মেয়ের সঙ্গে মায়ের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। প্রায় ১৮ বছর বয়সী ছেলে, যে হওয়ার কথা ছিল মায়ের হাতের লাঠি, সে আজ নিখোঁজ। বছর তিনেক আগে মায়ের জমানো শেষ সম্বলটুকু চুরি করে ছেলে পালিয়ে যায় শহরে। ‘শুনি শহরে থাকে, কিন্তু ফোন ধরে না, আসে না,’– এ আক্ষেপ যখন তিনি করেন, তখন তাঁর কণ্ঠের ভার আকাশকেও স্পর্শ করে।

টানা এক যুগের এই একক লড়াইয়ে যখন তিনি প্রায় ক্লান্ত, তখনই তার জীবনে আশার আলো হয়ে আসে ‘স্বপ্ন’ প্রকল্প। স্থানীয় সরকার বিভাগের নেতৃত্বে, ইউএনডিপি ও সুইডিশ সরকারের সহায়তায় এবং মেরিকোর অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পটি অতিদরিদ্র নারীদের স্বাবলম্বী করার কাজ করে।

প্রায় দেড় বছর আগে এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়ে শিল্পী প্রথমে রাস্তার কাজ ও বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নেন। বর্তমানে তিনি নিজেকে আরও দক্ষ করে তুলছেন। শিখছেন জুতা তৈরির কারিগরি কাজ।
স্বপ্ন প্রকল্পের মাধ্যমে পাওয়া অর্থ দিয়ে শিল্পী তাঁর পুরোনো দেনা শোধ করেছেন, ভাড়ার টাকা মিটিয়েছেন। যদিও নিজের জমানো টাকার বড় অংশই ছেলের হাতে খোয়া গেছে, তবুও তিনি ভেঙে পড়েননি। লাকসামের সেই ছোট্ট ভাড়াবাড়িতে মাসে এক হাজার টাকা ভাড়ায় তিনি এখনও স্বপ্ন দেখেন। সরকারি কোনো ঘর বা সহায়তা না পেলেও তাঁর আত্মবিশ্বাস অটুট।

শিল্পী রানী রবিদাসের এখন একটাই লক্ষ্য–নিজের একটি ছোট জুতোর দোকান দেওয়া। তিনি বলেন, ‘একটা দোকানপাট পেলে আমি পারব। নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই।’

আরও পড়ুন

×