ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

গণহত্যাকারীরা নারী ও শিশুকে হত্যা করছে

গণহত্যাকারীরা নারী ও শিশুকে হত্যা করছে
×

অরুন্ধতী রায়

অরুন্ধতী রায়

প্রকাশ: ১৫ মার্চ ২০২৬ | ০৭:২৬ | আপডেট: ২৯ মার্চ ২০২৬ | ২০:৩১

| প্রিন্ট সংস্করণ

৯ মার্চ ২০২৬। দিল্লির কামানি অডিটোরিয়ামে উপচে পড়া ভিড়। মঞ্চে বসে আছেন বুকারজয়ী লেখিকা ও অধিকারকর্মী অরুন্ধতী রায়। উপলক্ষ ছিল তাঁর সদ্য প্রকাশিত স্মৃতিকথামূলক বই ‘মাদার মেরি কামস টু মি’-এর আলোচনা। প্রখ্যাত লেখক ও কলামিস্ট নীলাঞ্জনা রায়ের সঙ্গে তাঁর কথোপকথন শেষে অরুন্ধতী রায় এক অগ্নিঝরা সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা দেন।
---------------------------------------------------------------------------------

আমি আমার মায়ের কন্যা, তাই আজ আমার কিছু বলার আছে। শিরদাঁড়া সোজা করে কথাগুলো আমাকে বলতেই হবে। যে যুদ্ধ আজ গোটা বিশ্বকে গ্রাস করতে উদ্যত, এ আমার তার বিরুদ্ধেই এক ছোট্ট বয়ান।

আমি জানি, আজ আমরা এখানে জড়ো হয়েছি ‘মাদার মেরি কামস টু মি’ নিয়ে কথা বলার জন্য। কিন্তু তেহরান, ইসফাহান আর বৈরুতের মতো অপরূপ শহরগুলো যখন আগুনে পুড়ছে, তখন সে কথা না বলে আজকের দিনটি আমরা শেষ করি কীভাবে? আমার মা মেরির যে অকপট ও স্পষ্টবাদী সত্তা, তাঁর প্রতি বিশ্বস্ত থেকেই এই মঞ্চকে কাজে লাগিয়ে আজ আমি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিনা উস্কানিতে চালানো বেআইনি হামলার বিষয়ে কিছু কথা বলতে চাই। এটা যে গাজায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি গণহত্যারই ধারাবাহিকতা, তা বলাই বাহুল্য। সেই একই গণহত্যাকারীরা তাদের পুরোনো চিত্রনাট্যই ফের মঞ্চস্থ করছে। নারী ও শিশুদের হত্যা করছে। হাসপাতালে বোমা ফেলছে। শহরগুলোয় কার্পেট বম্বিং করছে। তারপর নিজেরাই সাজছে ভুক্তভোগী।

তবে ইরান কিন্তু গাজা নয়। এই নতুন যুদ্ধের রণক্ষেত্র প্রসারিত হয়ে গোটা বিশ্বকেই গ্রাস করতে পারে। আমরা এখন পারমাণবিক বিপর্যয় ও অর্থনৈতিক ধসের একদম দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। যে দেশটি হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে বোমা ফেলেছিল, তারাই আজ বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন এক সভ্যতার ওপর বোমা ফেলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলার আরও অনেক সুযোগ আসবে, তবে আজ এখানে দাঁড়িয়ে শুধু এটুকুই বলি–আমি ইরানের পাশে আছি দ্ব্যর্থহীনভাবে। যদি কোনো দেশের শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন করতেই হয়–তা সে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল বা আমাদের দেশই হোক না কেন তবে তা করবে সে দেশের জনগণ। কোনো দাম্ভিক, মিথ্যাবাদী, প্রতারক, লোভী, সম্পদ-লুণ্ঠনকারী, বোমা নিক্ষেপকারী সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এবং তাদের মিত্ররা গোটা বিশ্বকে ভয় দেখিয়ে বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করবে, তা হতে পারে না।

ইরান যখন তাদের সামনে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়িয়েছে, ভারত তখন ভয়ে জবুথবু। আমাদের সরকার কতটা কাপুরুষ, কতটা মেরুদণ্ডহীন হতে পারে– তা ভেবে আমি লজ্জিত। অনেক দিন আগে আমরা গরিব দেশের গরিব মানুষ ছিলাম ঠিকই, কিন্তু আমাদের আত্মসম্মান ছিল, মর্যাদা ছিল। আজ আমরা এমন এক ধনী দেশে পরিণত হয়েছি– যার কর্মহীন, দরিদ্র মানুষদের আসল খাবারের বদলে ঘৃণা, বিষ আর মিথ্যার খোরাক জোগানো হচ্ছে। আমরা আমাদের আত্মগরিমা হারিয়েছি। মর্যাদা হারিয়েছি। হারিয়েছি সাহস। অবশ্য আমাদের সিনেমাগুলোর কথা আলাদা।

আমরা কেমন মানুষ, যাদের নির্বাচিত সরকার অন্য দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের অপহরণ ও হত্যা করার পরও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে তার নিন্দা করতে পারে না? আমাদের সঙ্গে এমনটা ঘটলে কি আমরা মেনে নিতাম? আমাদের প্রধানমন্ত্রী ইরানে হামলার মাত্র কয়েকদিন আগেই ইসরায়েল সফর করে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে আলিঙ্গন করে এলেন–এর অর্থ কী? যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের শুল্কনীতিকে অবৈধ ঘোষণার মাত্র কয়েকদিন আগে আমাদের সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এমন এক দাসসুলভ বাণিজ্য চুক্তি সই করল, যা আক্ষরিক অর্থেই আমাদের কৃষক ও বস্ত্রশিল্পকে পথে বসিয়ে দেবে–এর মানে কী? রাশিয়া থেকে তেল কেনার জন্য এখন আমাদের ‘অনুমতি’ নিতে হচ্ছে–এর মানে কী? আর কী কী করার জন্য আমাদের অনুমতি লাগবে? বাথরুমে যাওয়ার জন্য? এক দিনের ছুটি নেওয়ার জন্য? নাকি মায়েদের সঙ্গে দেখা করার জন্য?

ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিকরা প্রতিদিন প্রকাশ্যে আমাদের উপহাস ও অবমাননা করছেন। আমাদের প্রধানমন্ত্রী তাঁর সেই বিখ্যাত, অর্থহীন হাসি হেসেই চলেছেন আর জড়িয়ে ধরছেন। গাজায় যখন গণহত্যার ভয়াবহ পর্যায় চলছে, তখন ভারত সরকার হাজার হাজার দরিদ্র ভারতীয় শ্রমিককে ইসরায়েলে পাঠিয়েছে বিতাড়িত ফিলিস্তিনি শ্রমিকদের জায়গা পূরণ করতে। আজ যখন ইসরায়েলিরা বাঙ্কারে আশ্রয় নিচ্ছে, তখন খবর আসছে যে ওই ভারতীয় শ্রমিকদের সেই বাঙ্কারগুলোয় ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। এসবের মানে কী? বিশ্বের দরবারে কে আমাদের এমন চরম অবমাননাকর, নির্লজ্জ আর জঘন্য জায়গায় এনে দাঁড় করাল?

আপনাদের হয়তো মনে আছে, এক সময় চীনা কমিউনিস্টদের সেই আলংকারিক ও অতিরঞ্জিত শব্দবন্ধ ‘সাম্রাজ্যবাদের লেজুড় কুকুর’ নিয়ে আমরা কেমন মজাই না করতাম! কিন্তু এখন আমার মনে হয়, এ তকমাটি আমাদের সঙ্গেই সবচেয়ে বেশি মানানসই। অবশ্য আমাদের সেই বিকৃত, বিষাক্ত সিনেমাগুলোর কথা আলাদা; যেখানে সেলুলয়েডের নায়করা পেশি ফুলিয়ে, মগজহীনভাবে কাল্পনিক সব যুদ্ধে জয়লাভ করে আর তাদের অহেতুক সহিংসতা ও অসার মস্তিষ্ক দিয়ে আমাদের অন্তহীন রক্তপিপাসা মেটায়। 

আরও পড়ুন

×