ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সাংবাদিকতায় জেন্ডার সংবেদনশীলতা

কিছু প্রস্তাবনা

কিছু প্রস্তাবনা
×

২২ এপ্রিল প্রকাশিত হয় ‘সাংবাদিকতায় জেন্ডার সংবেদনশীলতা’ শীর্ষক ম্যানুয়াল

শাহেরীন আরাফাত

প্রকাশ: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:১২ | আপডেট: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ | ১২:০২

| প্রিন্ট সংস্করণ

শব্দ কেবল তথ্যের বাহন নয়; শব্দ একটি লেন্স, যার ভেতর দিয়ে সমাজ নিজেকে দেখে। একটি সংবাদ প্রতিবেদনে ব্যবহৃত একটি শব্দ বা বাক্যাংশ মুহূর্তের মধ্যে একজন নারীকে ক্ষমতায়িত করতে পারে, অথবা তাকে ঠেলে দিতে পারে যুগ যুগ ধরে চলে আসা পুরুষতন্ত্রের অন্ধকার ছাঁচে।

ক্লিকবেইট আর ভিউ-বাণিজ্যের এই যুগে সংবাদের ভাষা যখন প্রতিনিয়ত তার সংবেদনশীলতা হারাচ্ছে, ঠিক তখনই একটি সময়োপযোগী ও জরুরি পদক্ষেপ নিয়েছে প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)। ২২ এপ্রিল প্রকাশিত হয়েছে ‘সাংবাদিকতায় জেন্ডার সংবেদনশীলতা’ শীর্ষক একটি ব্যবহারিক ম্যানুয়াল। প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের সার্বিক সহযোগিতায়, পিআইবির অধ্যয়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মনিরা শরমিনের রচনা ও মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফের সম্পাদনায় নির্দেশিকাটি গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ দলিলে পরিণত হয়েছে।

ম্যানুয়ালটি মফস্বলের চিত্রটিও তুলে এনেছে নিপুণভাবে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের দুই শতাধিক গণমাধ্যমকর্মীর বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে রচিত ম্যানুয়ালটি শুধু সমস্যা চিহ্নিত করেনি, বরং উত্তরণের একটি সুনির্দিষ্ট ভাষাগত ও কাঠামোগত রূপরেখাও দিয়েছে।

দেশের গণমাধ্যমগুলোতে জেন্ডার বৈষম্যের রূপ কতটা প্রকট, তা ম্যানুয়ালটিতে উল্লিখিত এমআরডিআইর একটি পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্ট– ‘১৪টি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে নারীকর্মী মাত্র ১০ শতাংশ এবং নারী প্রতিবেদকের হার মাত্র ৬ শতাংশ।’ এই বৈষম্য মফস্বলে আরও ভয়াবহ। নারী সাংবাদিকদের প্রায়ই ফ্যাশন, রান্না বা বিনোদনের মতো ‘সফট বিট’ দেওয়া হয়। অপরাধ বা রাজনীতির মতো অনুসন্ধানী বিটে তাদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। কর্মস্থলে বুলিং, যাতায়াতের নিরাপত্তাহীনতা এবং ফিল্ডে কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক অপ্রস্তুতি নারীদের এই পেশা থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। ম্যানুয়ালটি এই রূঢ় সত্যগুলোকে সরাসরি স্বীকার করে নিয়ে সমাধানের পথ খুঁজেছে।

আজকের বাস্তবতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইর প্রসঙ্গটি ম্যানুয়ালটিতে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিকভাবেই এসেছে। ডিপফেক ভিডিও, ট্রলিং এবং এআই জেনারেটেড কনটেন্টের মাধ্যমে নারী সাংবাদিকদের কীভাবে হেনস্তা করা হয় এবং এর ফলে কীভাবে নারীরা ‘সেলফ সেন্সরশিপ’-এর শিকার হয়ে চুপ হয়ে যান, তার নিখুঁত বিশ্লেষণ রয়েছে এতে।

ম্যানুয়ালটি নিঃসন্দেহে একটি দারুণ ভিত্তিপ্রস্তর। তবে একটি আদর্শ ও সমতাপূর্ণ গণমাধ্যম কাঠামো গড়তে আগামী সংস্করণে আরও কয়েকটি বিষয় যুক্ত করা যেতে পারে। এ নিয়ে প্রকাশনা অনুষ্ঠানেও বিভিন্নজন মত প্রকাশ করেছেন। 

১. পিতৃত্বকালীন ছুটি: সন্তান লালনপালন কেবল নারীর একার দায়িত্ব নয়। একজন পুরুষ সাংবাদিক যখন পিতৃত্বকালীন ছুটি নিয়ে সন্তানের দেখভাল করবেন, তখন নারীর ওপর থেকে ‘ডাবল শিফট’-এর চাপ কমবে।

২. ইতিবাচক পদক্ষেপ বা প্রণোদনা: নারী ও অন্যান্য লিঙ্গীয় পরিচয়ের ব্যক্তিদের সাংবাদিকতায় টেনে আনতে কাঠামোগত উদারতা জরুরি। এর জন্য প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক প্রণোদনা ও নিয়োগে ইতিবাচক পদক্ষেপ। ম্যানুয়ালে তা যুক্ত হতে পারে। যেমন–নাইট শিফট বা দেরিতে কাজ শেষ হওয়া নারী ও অন্যান্য লিঙ্গীয় পরিচয়ের সাংবাদিকদের জন্য নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা; নিয়োগের ক্ষেত্রে জেন্ডার দৃষ্টিভঙ্গিকে গুরুত্ব দেওয়া;  নিয়মিত জেন্ডারবিষয়ক ওয়ার্কশপ আয়োজন এবং নিয়োগ ও হার্ড বিটে নারীদের গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে।

৩. মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা: নারী সাংবাদিকরা ফিল্ডে এবং অনলাইনে যে পরিমাণ ট্রমা ও বুলিংয়ের শিকার হন, তা মোকাবিলায় সংবাদমাধ্যমগুলোতে ইন-হাউস সাইকোলজিক্যাল কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করার বিষয়টি ম্যানুয়ালে সুপারিশ হিসেবে যুক্ত হতে পারে।

তবে পিআইবির ‘সাংবাদিকতায় জেন্ডার সংবেদনশীলতা’ ম্যানুয়ালটি বিশাল শূন্যতায় এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। এটি কেবল একটি নির্দেশিকা নয়; গণমাধ্যমের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোরও দলিল। আইন ও নীতিমালার পাশাপাশি বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে সাংবাদিক ও সম্পাদকদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটানোর কথাও ম্যানুয়ালটিতে বলা হয়েছে।

আরও পড়ুন

×