ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

কর্মক্ষেত্রে মনের যত্ন

কর্মক্ষেত্রে মনের যত্ন
×

ছবি :: ব্র্যাকের সৌজন্যে

অধ্যাপক কামাল চৌধুরী

প্রকাশ: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:১৩ | আপডেট: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ | ১২:২৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

যে পরিবেশে নারী নিরাপদ বোধ করেন না, আত্মসম্মান নিয়ে কাজ করতে পারেন না, সেখানে তিনি প্রতিনিয়ত তীব্র মানসিক ট্রমার ভেতর দিয়ে যান। কর্মক্ষেত্রে মনোসামাজিক স্বাস্থ্য নিয়ে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তেমন কোনো আলোচনা হয় না। অথচ কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং এটি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি সফলতার অন্যতম শর্ত। লিখেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক কামাল চৌধুরী
----------------------------------------------------------------------

সকাল ৭টা। শহরের যান্ত্রিক কোলাহল শুরু হওয়ার আগেই শুরু হয়ে যায় সাজিয়ার (ছদ্মনাম) দৌড়। পরিবারের সবার নাশতা তৈরি, সন্তানদের স্কুলের জন্য প্রস্তুত করা, এরপর ঢাকার তীব্র যানজট ঠেলে অফিসে পৌঁছানো–সব মিলিয়ে দিনের শুরুতেই একপ্রস্থ যুদ্ধ শেষ হয়। আসল যুদ্ধটা শুরু হয় অফিসে পা রাখার পর।

আমরা যখন ‘নিরাপদ কর্মপরিবেশ’ নিয়ে কথা বলি, তখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, মজবুত ভবন কিংবা পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ছবি। বিশ্ব কর্মপরিবেশে নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য দিবসেও হয়তো এসব নিয়েই বেশি আলোচনা হয়। কিন্তু কংক্রিটের দেয়ালের ভেতরে মানুষের মনের ভেতর যে রক্তক্ষরণ হয়, তার খবর কে রাখে? কর্মক্ষেত্রে ‘মনোসামাজিক স্বাস্থ্য’ বা সাইকো-সোশ্যাল ওয়েলবিয়িং আজ সবচেয়ে উপেক্ষিত এক অধ্যায়।

সাজিয়া কাজ করেন একটি বেসরকারি ব্যাংকে। খাতা-কলমে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টার চাকরি হলেও, এই নিয়মের কোনো বালাই নেই। সারাদিন নিঃশ্বাস ফেলার ফুরসত পান না। তার ওপর রয়েছে সিনিয়রদের মানসিক চাপ। নিজেদের অনেক কাজ তারা অযাচিতভাবে সাজিয়ার ওপর চাপিয়ে দেন। কোনো কাজে সামান্য ভুল হলেই সবার সামনে অপদস্থ করা হয়। সাজিয়া অনেকবার ভেবেছেন চাকরিটা ছেড়ে দেবেন। স্বামীর একার আয়ে সংসার চলে না বলে মুখ বুজে সব সহ্য করতে হয় তাঁকে। প্রতিদিন তিনি ভাবেন, এই বিষাক্ত পরিবেশে আর কতদিন টিকতে পারবেন তিনি?

অন্যদিকে আরিফের (ছদ্মনাম) গল্পটা একটু ভিন্ন হলেও যন্ত্রণার রং একই। একটি স্বনামধন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানে ১৫ বছর ধরে কাজ করছেন। এই দীর্ঘ সময়ে তাঁর কোনো প্রমোশন হয়নি। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কখনোই তাঁর কাজের মূল্যায়ন করেননি। একই পদে, একই বেতনে বছরের পর বছর পার করে দেওয়ায় সংসারে আর্থিক অনটন লেগেই আছে। সন্তানদের চাহিদা মেটাতে না পারার হতাশা আরিফকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।

সাজিয়া বা আরিফ–তারা আমাদের সমাজেরই প্রতিচ্ছবি। অফিসে কাজের চাপ থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। যখন সেই চাপ ‘বুলিং’, সহকর্মীদের অসহযোগিতা এবং ঊর্ধ্বতনদের অপেশাদার আচরণের পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন তা আর কেবল ‘কাজের চাপ’ থাকে না; তা পরিণত হয় মানসিক নির্যাতনে।

একজন বিষণ্ন, হতাশ এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত কর্মী কখনোই তাঁর সেরাটা দিতে পারেন না। মানসিক ক্লান্তির কারণে কাজের প্রতি তাঁর অনীহা তৈরি হয়, মনোযোগ কমে যায়। এর ফলে শুধু যে কর্মীর ব্যক্তিগত ক্ষতি হয় তা নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা বা প্রোডাক্টিভিটি গুরুতরভাবে ব্যাহত হয়।

কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নারী-পুরুষ সবার জন্যই সমানভাবে প্রযোজ্য। আমাদের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে নারীর জন্য বিশেষ কিছু নিরাপত্তার কথা আলাদাভাবে ভাবতেই হয়। সাজিয়ার মতো অসংখ্য নারীকে ঘরে-বাইরে সমানতালে লড়তে হয়। এর ওপর কর্মক্ষেত্রে যদি যৌন হয়রানির মতো শঙ্কা থাকে, তবে তা নারীর জন্য এক ভয়ানক আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করে। যে পরিবেশে নারী নিরাপদ বোধ করেন না, আত্মসম্মান নিয়ে কাজ করতে পারেন না, সেখানে তিনি প্রতিনিয়ত তীব্র মানসিক ট্রমার ভেতর দিয়ে যান।

এর বাইরে আরও একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো–কর্মস্থলের শৌচাগার বা বাথরুম। অনেক অফিসেই নারীর জন্য আলাদা, পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ শৌচাগার থাকে না। বাথরুমের পরিবেশ যদি ব্যবহারোপযোগী না হয় এবং সেখানে প্রাইভেসি লঙ্ঘিত হওয়ার বিন্দুমাত্র শঙ্কা থাকে, তবে নারীরা সেটি ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকেন। দীর্ঘক্ষণ প্রস্রাব আটকে রাখার ফলে নারীরা ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (ইউটিআই), কিডনির জটিলতাসহ নানা শারীরিক ও প্রজনন স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিতে পড়েন। এই শারীরিক কষ্ট তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং এটি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি সফলতার অন্যতম শর্ত। একটি সুস্থ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠান ও মানবসম্পদ (এইচআর) বিভাগকে কিছু জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে–

১. ভীতিমুক্ত ও সম্মানজনক পরিবেশ: কর্মক্ষেত্র হতে হবে সব ধরনের বুলিং, মৌখিক নির্যাতন এবং যৌন হয়রানি মুক্ত। এ বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। কর্মীদের মনোসামাজিক ঝুঁকির বিষয়ে সচেতন করতে নিয়মিত ওরিয়েন্টেশন ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

২. সঠিক মূল্যায়ন ও আর্থিক নিরাপত্তা: আরিফের মতো কেউ যেন অবমূল্যায়নের শিকার না হন, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। কাজের ভিত্তিতে সঠিক প্রমোশন, ইনক্রিমেন্ট ও আর্থিক নিরাপত্তা একজন কর্মীর মনে প্রশান্তি আনে। এইচআর পলিসি হতে হবে স্বচ্ছ এবং কর্মীবান্ধব।

৩. নারীবান্ধব অবকাঠামো: নারীর জন্য সম্পূর্ণ আলাদা, নিরাপদ এবং পরিচ্ছন্ন শৌচাগার নিশ্চিত করা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাথমিক দায়িত্ব। এটি কোনোভাবেই অবহেলা করার সুযোগ নেই।

৪. ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালান্স: ভুলে গেলে চলবে না, কর্মীরা কোনো যন্ত্র নয়, তারা মানুষ। কাজের বাইরে তাদের একটি পরিবার আছে, ব্যক্তিগত জীবন আছে। কাজের পাশাপাশি তাদের বিনোদনের প্রয়োজন। ছুটির দিনগুলোতে পরিবারকে সময় দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। অফিসের ভেতরেই মাঝে মাঝে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা রিফ্রেশমেন্টের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন অনেকটাই নির্ভর করে তার কর্মজীবী মানুষের ওপর। কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া মানে আসলে প্রতিষ্ঠানেরই যত্ন নেওয়া। সাজিয়াদের যেন আর ক্লান্ত শরীরে চোখের জল ফেলতে না হয়, কিংবা আরিফদের যেন ক্যারিয়ারের মাঝপথে এসে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে না হয়; সেজন্য কর্মস্থলের প্রতিটি দেয়ালকে হতে হবে সহমর্মিতার, প্রতিটি ডেস্ককে হতে হবে সম্মানের। তবেই আমরা পাবো একটি সত্যিকারের নিরাপদ ও উৎপাদনশীল কর্মপরিবেশ।

আরও পড়ুন

×